নুর মোহাম্মদই এনেছিল কোকেন

প্রকাশ:| সোমবার, ৩ এপ্রিল , ২০১৭ সময় ১০:৩৭ অপরাহ্ণ

নগরীর খাতুনগঞ্জের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান খানজাহান আলী লিমিটেডের চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদের জ্ঞাতসারেই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সূর্যমুখী তেলের সঙ্গে কোকেন এসেছিল।  মামলার আসামি লন্ডনে অবস্থানরত বকুল মিয়ার সঙ্গে নুর মোহাম্মদের টেলিফোনে কথা হয়েছিল।  কিন্তু কোকেন আটকের পর এই সংক্রান্ত সকল দালিলিক প্রমাণ তার ভাই মোস্তাক আহমেদ খাঁন প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার থেকে অপসারণ (ডিলিট) করেন।

মামলার সম্পূরক অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, খানজাহান আলী লিমিটেডের সহকারী কমার্শিয়াল অফিসার ফয়সল হোসেন ২০১৫ সালের মে মাসের দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় সপ্তাহে বিষয়টি নুর মোহাম্মদকে জানিয়েছিলেন এবং ঋণপত্রবিহীন (এলসি) একটি ডকুমেন্ট তাকে দেখিয়েছিলেন।  খানজাহান আলী লিমিটেডের সহকারী প্রতিষ্ঠান বিএল শ্রীম্প হ্যাচারি লিমিটেডের ব্যবস্থাপক গোলাম মোস্তফা সোহেলকে বিষয়টি জিজ্ঞেস করার জন্যও বলেছিলেন ফয়সল।  জবাবে নুর মোহাম্মদ জানিয়েছিলেন, তিনি বিষয়টি পূর্ব থেকেই অবগত।

মামলার আসামি সোহেলের ১৬৪ ধারার জবানবন্দি উদ্ধৃত করে সম্পূরক অভিযোগপত্রে উল্লেখ আছে, মে মাসের প্রথম সপ্তাহে ডিএইচএল কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে তার কাছে ছয় পাতার একটি ডক্যুমেন্ট আসে।  তা খুলে তাতে অপরিশোধিত সূর্যমুখী তেল আমদানি সংক্রান্ত ডক্যুমেন্ট দেখতে পান।  কয়েকদিন পর সব ডক্যুমেন্ট তিনি ফয়সলকে দেখান।  ফয়সল বিষয়টি কোম্পানির চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদকে জানানোর জন্য সোহেলকে পরামর্শ দেন।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ আছে, ফয়সলের কাছ থেকে বিষয়টি জানার পরও নুর মোহাম্মদ সোহেলকে ডেকে এই বিষয়ে কিছুই জিজ্ঞেস করেননি এবং তার বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক কোন ব্যবস্থা নেননি।

সম্পূরক অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, অধিকতর তদন্তের সময় রিমান্ডে নুর মোহাম্মদের মুখোমুখি করা হয় আসামি সোহেল, মেহেদী আলম, মোস্তফা কামাল, আতিকুর রহমান এবং একেএম আজাদকে।

‘আসামীদের নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, নুর মোহাম্মদের প্ররোচনা ও যোগসাজশে অপরাপর আসামিরা বিদেশে অবস্থানরত পলাতক আসামিদের (লন্ডনে অবস্থানরত ফজলুর রহমান ও বকুল মিয়া) সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনপূর্বক অপরিশোধিত সূর্যমুখী তেলের আড়ালে আমদানিনিষিদ্ধ কোকেন অবৈধভাবে আমদানি করেছে।  নুর মোহাম্মদ পূর্ব থেকেই অপরিশোধিত সূর্যমুখী তেলের আড়ালে আমদানি নিষিদ্ধ কোকেন (মাদক) আমদানির সাথে জড়িত ছিল মর্মে সাক্ষ্যপ্রমাণে দৃষ্ট হয়। ’

নুর মোহাম্মদ কোকেন আমদানির সঙ্গে জড়িত বলেই ২০১৫ সালের দ্বিতীয়-তৃতীয় সপ্তাহে বিষয়টি অবগত হওয়ার পর সেই কোকেন রপ্তানিকারকের কাছে পাঠানোর কোন উদ্যোগ তিনি গ্রহণ করেননি বলে সম্পূরক অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।

সাক্ষী ফয়সলের দেয়া তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগপত্রে আসামি হয়েছেন নুর মোহাম্মদের ছোট ভাই এবং খানজাহান আলী লিমিটেডের পরিচালক মোস্তাক আহমেদ খাঁন।

সম্পূরক অভিযোগপত্রে ফয়সলকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, মে মাসের শেষদিকে অর্থাৎ সোহেল ফয়সলকে ডকুমেন্ট দেখানোর ১০-১২ দিন পর খানজাহান আলী লিমিটেডের ই-মেইলে (kjatc@khanjahanali.com) ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট, অরিজিনাল বিএল এর সফট কপি আসে।  যেহেতু গোলাম মোস্তফা সোহেল ওই ডকুমেন্ট নিয়ে কাজ করছেন তাই তার ই-মেইলে সেগুলো ফরোয়ার্ড করা হয়।

কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরে কোকেন আটকের পর পুলিশ খানজাহান আলী লিমিটেডের অফিসে তল্লাশি ‍চালিয়ে কোন ডকুমেন্ট পাননি।  এমনকি ফয়সলই পুলিশকে জানান, যে খানজাহান আলী লিমিটেডের কম্পিউটারে আগের কোন মেইল নেই।

সম্পূরক অভিযোগপত্রে উল্লেখ আছে, এই বিষয়ে ফয়সল তথ্য দেন, গোলাম মোস্তফা সোহেল গ্রেফতার হবার পর ই-মেইলগুলো ডিলিট করা হয়েছে।  মোস্তাক আহমেদ নামে নুর মোহাম্মদের ছোট ভাই কোম্পানির ই-মেইল, অ্যাডমিনিস্ট্রেটর, পাসওয়ার্ড পরিবর্তন, ই-মেইল সংরক্সণ ও রক্ষণাবেক্ষণসহ যাবতীয় কার্যক্রম করে থাকেন।  সাক্ষী ফয়সলের জাবনবন্দি মতে আসামি মোস্তাক আহমেদ মেইলগুলো ডিলিট করেছেন বলে প্রতীয়মান হয়।

এতে আরও বলা হয়, সাক্ষী ফয়সল খানজাহান আলী লিমিটেডের আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত সব কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলেন।  তিনি ২০১৬ সালের ১৫ জানুয়ারি সব বিষয় উল্লেখ করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।  এছাড়া আসামি মোস্তাককে গ্রেফতারের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ আছে।

এতে বলা হয়, আসামি মোস্তফা কামাল জবানবন্দিতে জানিয়েছেন, নুর মোহাম্মদের সঙ্গে লন্ডনে অবস্থানরত বকুল মিয়ার টেলিফোনে কোকেন আমদানির বিষয়ে কথা হয়েছে।  এরপরও দায় এড়ানোর জন্য ২০১৫ সালের ৮ জুন তিনি শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরে চিঠি দিয়ে নুর মোহাম্মদ জানান চালানটি তার নয়।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, নুর মোহাম্মদের অগোচরে যদি চালানটি আসত তাহলে তিনি বিষয়টি জানার পর অসম্পূর্ণ ডকুমেন্টসের ভিত্থিতে কোন পণ্য আমদানির বিরুদ্ধে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে পারতেন।  বরং তিনি তা না করে অপরাপর সহযোগীদের মাধ্যমে বন্দর কর্তৃপক্ষের ‍অগোচরে জ্ঞাতসারে উক্ত মালামাল খালাসের চেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন।

পুলিশ তদন্ত করে মামলার যে অভিযোগপত্র দাখিল করেছিল তাতে বলা হয়েছিল নুর মোহাম্মদ একজন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী।  আর র‌্যাবের দাখিল করা সম্পূরক অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, নুর মোহাম্মদের প্রাক পরিচিতি যাচাই করে স্থানীয় থানা তার স্বভাবচরিত্র ভাল নয় মর্মে জানায়।

নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (প্রসিকিউশন) নির্মলেন্দু বিকাশ চক্রবর্তী বাংলানিউজকে জানান, সোমবার (৩ এপ্রিল) মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা র‌্যাবের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মহিউদ্দিন ফারুকী আদালতে সম্পূরক অভিযোগপত্র জমা দেন।  এতে পুলিশের অব্যাহতি দেওয়া নুর মোহাম্মদের পাশাপাশি তার ভাই মোস্তাক আহমেদ খাঁনকেও আসামি করা হয়েছে।  পুলিশের অভিযোগপত্রের আটজনসহ সম্পূরক অভিযোগপত্রে মোট আসামি ১০ জন।

২০১৫ সালের ৭ জুন চট্টগ্রাম বন্দরে একটি কনটেইনারে তরল কোকেন পাওয়া যায়।  এই ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দায়ের হওয়া মামলা তদন্ত শেষে ২০১৫ সালের ১৯ নভেম্বর আদালতে আটজনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দাখিল করেছিলেন নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার মো.কামরুজ্জামান।  এতে এজাহারভুক্ত প্রধান আসামি নুর মোহাম্মদকে বাদ দিয়ে আটজনকে আসামি করা হয়েছিল।