নির্বিচার শিকারে পাহাড়ে বন্য প্রাণীর সংখ্যা কমছে

প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ৭ জানুয়ারি , ২০১৪ সময় ০৯:০৯ অপরাহ্ণ

নজরুল ইসলাম লাভলু, কাপ্তাই
সংঘবদ্ধ পাচারকারী চক্রও একশ্রেণীর বিবেকবর্জিত শৌখিন শিকারীর নির্মম নিষ্ঠুরতায় কাপ্তাই, নির্বিচার শিকারে পাহাড়ে বন্য প্রাণীর সংখ্যা কমছে 1বিলাইছড়ি, রাজস্থলীসহ তিন পার্বত্য জেলার বিভিন্ন অরণ্য এলাকা থেকে নানা প্রজাতির বন্য প্রাণীর সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। নির্বিচারে পশুপাখি নিধন ছাড়াও বন্যপ্রাণী হ্রাস পাওয়ার অন্যতম কারণ হল নিরাপদ আবাস এবং তীব্র খাদ্য সংকট। এ অবস্থায় এসব এলাকায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরো কাঠোর ও দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি বলে অভিজ্ঞমহলের অভিমত। নইলে অচিরেই পার্বত্য জেলাগুলো বন্যপ্রাণী শূন্য হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
একশ্রেণীর অর্থলোভী ব্যক্তি ও সমাজের শিক্ষিত শৌখিন শিকারী কাপ্তাই, রামপাহাড়, সীতার পাহাড়, রাজস্থলী, বিলাইছড়িসহ পার্বত্য জেলাগুলোর বিভিন্ন গহীন অরণ্য এলাকা থেকে অবাধে বন্য পশুপাখি শিকার অব্যাহত রেখেছে। আবার এসব এলাকার অনেকেই জীবিকার তাগিদে বন্য পশুপাখি নির্বিচারে হত্যা করছে। এসব শিকারীরা নানা কৌশলে শিকারকাজ চালায়। অনেকে গভীর অরণ্যে ঢুকে তীর, ধনুক ও খাদ্যে বিষ প্রয়োগ করে, জাল দিয়ে ফাঁদ পেতে অথবা বন্দুক দিয়ে গুলি করে প্রতিদিন নানা জাতের বন্য পশুপাখি শিকার অব্যাহত রেখেছে।
অনেক শিকারী বনের হরিণ, বন্যমোরগ,শুকর শিকার করে ভুরিভোজন করছে। এদের মধ্যে অনেক উপজাতীয় সম্প্রদায় রয়েছে, যারা বনের বানর, হনুমান, সাপ,হরিণ,ভাল্লুক, হত্যা করে এদের মাংস খেয়ে থাকে। এছাড়া অনেকেই বনের হিংস্র জন্তু চিতাবাঘ, ভাল্লুক হত্যা করে এসব প্রাণীর চামড়া সংগ্রহ করে অন্যত্র পাচার করার অভিযোগ রয়েছে। এভাবে পশুপাখি শিকার অব্যাহত থাকায় পার্বত্য জেলাগুলোর বিভিন্ন স্থানে ইতিমধ্যে নানা প্রজাতির পশুপাখি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। একসময় পার্বত্য জেলাগুলো ছিল গহীন অরণ্যে ভরপুর। সে সময় কালেভদ্রে ঘটনাচক্রে লোকালয়ে হাতির দল দেখা যেত। কিন্তু গত কয়েক বছরে কতিপয় বন কর্মকর্তা কর্মচারীদের যোগসাজশে পার্বত্য জেলাগুলো থেকে অবাধে বনজ সম্পদ উজাড় হয়ে যাওয়ার ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। এতে বন্য হাতির দল খাদ্যের অভাবে লোকালয়ে হানা দিতে বাধ্য হচ্ছে। এতে পার্বত্য এলাকার বিভিন্ন স্থানে জানমালের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হচ্ছে । সাম্প্রতিক সময়ে কাপ্তাই পিডিবি এলাকা ও জিপতলীতে দফায় দফায় বন্যা হাতি আক্রমণ চালায়। এলাকার লোকজন তখন বাড়ি ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়। পরে জিপতলী সেনাবাহিনীর সহযোগীতা নিয়ে হাতি তাড়িয়ে তারা বাড়িতে ফিরে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে গহীন অরণ্য এলাকা ছেড়ে প্রায় কয়েক’শ বানর ও হনুমান কাপ্তাই-চট্টগ্রাম সড়কের পাশে অবস্থিত বেঙছড়ি বনবিট এলাকার গাছপালায় অবস্থান নিয়ে ছিল। এভাবে এতো বিপুলসংখ্যক বানর, হনুমান একসঙ্গে সড়কের পাশে অবস্থান নিতে এর আগে কেউ কখনো দেখেনি। সে সময় এলাকায় বসবাস করছে এমন কয়েক ব্যক্তির সাথে আলাপকালে তারা জানান, অবাধে বন উজাড় হওয়ায় এদের আবাসস্থল নেই বললেই চলে। পাশাপাশি খাদ্য সংকট দেখা দেয় চরমভাবে। আবাসভূমি হারিয়েও খাদ্য সংকটে পড়ে বানর ও হনুমান একেবারেই মানুষের হাতের নাগালে চলে এসেছে। এ ধরনের অবস্থা বিগত কয়েক যুগেও তারা দেখেনি। সূত্র জানায়, ব্যাঙছড়ি রিজার্ভ ফরেষ্ট এলাকায় অসংখ্য হাতি ও অন্যান্য পশুপাখি ছিল, বর্তমানে সেভাবে আর নেই। বিশেষ করে এই বনে হাতির পাল থাকলেও এর সংখ্যা বর্তমানে অনেক কমে গেছে। এভাবে পশুপাখি নিধন অব্যাহত থাকায় পার্বত্য এলাকায় পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রসঙ্গতঃ সাম্প্রতিক সময় কাপ্তাই সহ পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন বনাঞ্চল থেকে একশ্রেণীর অর্থলোভী মানুষ অবাধে তক্ষক (স্থানীয় ভাষায় টোটট্যাং) পাচার কাজে জড়িত রয়েছে। ইতিমধ্যে কাপ্তাই সহ পার্বত্যাঞ্চল থেকে তক্ষক পাচারকালীন একাধিক ব্যক্তিকে বনবিভাগ আটক করতে সক্ষম হয়। এ ব্যাপারে কাপ্তাই রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল মতিনের দৃষ্টি আর্কষন করা হলে তিনি বলেন, কতিপয় দুষ্কৃতিকারীরা নানা ভাবে বনাঞ্চলের বিভিন্ন বন্যপ্রাণী হত্যা সহ পাচার করার অভিযোগ রয়েছে। তবে বন কর্মকর্তা কর্মচারীরা নিয়মিত টহল অব্যাহত রেখেছে। এসব দুষ্কৃতিকারীদের আইনের আওতায় আনার ব্যাপারে বন বিভাগ সর্বদা সচেষ্ট রয়েছে। মানুষের মঙ্গলের জন্যই বনাঞ্চল এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ প্রয়োজন। এ ব্যাপারে আমরা জনগণকে সর্বদা উদ্ধুদ্ব করছি।


আরোও সংবাদ