নিভৃত পল্পীতে এক আলোর দিশারী

প্রকাশ:| শনিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি , ২০১৪ সময় ১০:২২ অপরাহ্ণ

পংকজ মণ্ডল
প্রত্যন্ত গ্রামের নিরক্ষর শিশুদের নিভৃতে শিক্ষা দান করে যাচ্ছেন বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার বড়গুনি গ্রামের সাইফুল রহমান ও তার স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন। তাদের একান্ত প্রচেষ্টায় এলাকায় গড়ে উঠেছে একটি পাঠশালা। এখানে অসংখ্য ছিন্নমূল অসহায় শিশু প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে। অবহেলিত এসব শিশুকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাইফুল দম্পতির চেষ্টার কোনো কমতি নেই। তাদের এ মহতী উদ্যোগে অনেক ঝরেপড়া শিশু শিক্ষালাভের সুযোগ পেয়েছে।

নিভৃত পল্লীতে আলোর দিশারী হয়ে কাজ করছেন এই দম্পতি। একজন শিশু প্রকৃত মানুষ হতে যেসব শিক্ষার প্রয়োজন তার সব ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। আত্মপ্রত্যয়ী সাইফুল ও সাবিনা পরম মমতার সঙ্গে সন্তান স্নেহে গড়ে তুলছেন শিশুদের। এসব শিশুর মধ্যে এখনও রামসুন্দর বসাকের আদি বাল্যশিক্ষা ও আদর্শলিপি পড়ানো হয়। পড়ালেখার পাশাপাশি এ প্রতিষ্ঠানে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে কবিতা আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন, দেশের গান, একক অভিনয়, বক্তৃতা ও বিভিন্ন ডিসপ্লে, পিটি-প্যারেডসহ প্রত্যেক বিষয়ে সমানভাবে দক্ষ করে গড়ে তোলা হচ্ছে। এ ছাড়া খেলাধুলা, শরীরচর্চা ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বিভিন্ন বিষয়ে শিশুদের শিক্ষা দান করছেন তারা। গত কয়েক বছর ধরে উপজেলার বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠানে ডিসপ্লে ও শরীরচর্চা প্রদর্শনীতে সাইফুল রহমানের স্কুলটি প্রথম স্থান অধিকার করে আসছে। এ ছাড়া খুব অল্প দিনের মধ্যে শিক্ষাক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখার জন্য শেরেবাংলা পদক ও এশিয়া ছিন্নমূল মানবাধিকার পদকসহ অসংখ্য পদক লাভ করেছেন এই দম্পতি। তাদের স্কুলের শিক্ষা ব্যবস্থা এলাকায় পার্শ্ববর্তী উপজেলার মানুষকেও তাক লাগিয়ে দিয়েছে। পাশের গ্রামের অভিভাবকরাও তাদের ছেলেমেয়েদের এই স্কুলে এনে ভর্তি করছেন। শিশুশিক্ষায় তাদের এ অগ্রগতির কারণে এলাকাবাসীর হৃদয়ের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নিয়েছেন এ দম্পতি।
এখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে একদিন দেশের উচ্চপদে এসব ছেলেমেয়ে আসীন হবে_ এমনই আশার বাণী শোনালেন সাইফুল ও সাবিনা। ‘ওরা একদিন অনেক বড় হবে। নিজের সন্তানের চেয়ে ওদের আমরা বেশি ভালোবাসি। আমাদের সব স্বপ্ন ওদের ঘিরে। যত কষ্ট হোক, আর যত বাধা আসুক, ওদের মানুষের মতো মানুষ করে তুলব।’ শিশুদের নিয়ে নিজেদের ভাবনা ও পরিকল্পনার কথা জানালেন সাইফুল দম্পতি। শিশুদের জন্য একটি স্থায়ী ঠিকানা খুঁজছেন এ দম্পতি। অর্থনৈতিক টানাপড়েনের কারণে এখনও কোনো স্থায়ী আশ্রয় গড়তে পারেননি। ভাড়া বাড়িতে থেকে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালিয়ে আসছেন বলে জানালেন। নিজস্ব কোনো ভালো ঘর না থাকায় খোলা আকাশের নিচে বসে এসব শিশুকে পাঠদান করা হয়। মেঘ-বৃষ্টি এলেই তাদের ছুটি দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। বর্তমানে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় জরুরিভাবে একটি ভালো ভবন এবং কিছু আসবাবপত্রের প্রয়োজন।
চিতলমারী উপজেলার বড়গুনি গ্রামের আবদুল মকিতের বাড়িতে সাইফুল দম্পতি এক যুগ ধরে ভাড়া ছিলেন। পেশায় দু’জনেই পল্লী চিকিৎসক। তাদের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের ভাটিয়াপাড়া। চিকিৎসা সেবা দিতে এসে এলাকার লোকজনের ভালোবাসায় আটকে যান। এ সুবাদে সবার সঙ্গে গড়ে ওঠে আন্তরিক সম্পর্ক। ফলে নিজের এলাকা গোপালগঞ্জে আর ফিরে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ২০১০ সালে আবদুল মকিতের ভাড়া বাড়িতে থেকে মাত্র চার শিশুকে নিয়ে ‘বড়গুনি আদর্শ শিশু বিদ্যানিকেতন’ নামে একটি পাঠশালা গড়ে তোলেন এ দম্পতি। এরপর তাদের কর্মকাণ্ডে বাড়তে থাকে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা। কিন্তু গত চার বছরের মধ্যে কয়েকবার তাদের ভাড়া বাসা ছাড়তে হয়েছে। ফলে শিশুদের নিয়ে অনেকটা বিপাকে পড়েছেন সাইফুল দম্পতি। তাদের এ দুরবস্থা দেখে বর্তমানে ওই গ্রামের আমুর হোসেন মিঠু নামে এক ভদ্রলোক সাইফুল রহমানকে শিশুদের পড়ানোর জন্য অস্থায়ীভাবে তার নিজের বাড়িতে জায়গা দিয়েছেন। অনেক প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও থেমে নেই তাদের কর্মকাণ্ড। নিবেদিতপ্রাণ হিসেবে প্রত্যন্ত এই জনপদে শিশুদের জন্য তাদের অবিরাম ছুটে চলার যেন শেষ নেই।
শিশু শ্রেণীতে পড়ূয়া অথৈ মৃধার অভিভাবক পৃথী মৃধা জানান, পাঠশালাটি চালু না থাকলে তাদের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করানো অসাধ্য হয়ে পড়ত। প্রতিটি শিশুকে সন্তানের মতো ভালোবাসেন সাইফুল ভাই ও সাবিনা আপা। যে কারণে গ্রামের প্রতিটি অভিভাবক আগ্রহ করে এখানে তাদের ছেলেমেয়েদের পড়ার জন্য নিয়ে আসেন। পাঠশালার শিক্ষার্থী দিপা বিশ্বাস, মানিক হীরা, আনিক হীরা, আতিকসহ অনেকে জানায়, তারা কেউ বড় হয়ে ডাক্তার হবে, কেউ হবে ইঞ্জিনিয়ার। এখানে পড়তে তাদের খুব ভালো লাগে।
এলাকার তরুণ সমাজসেবক আমুর হোসেন মিঠু জানান, সাইফুল ভাইয়ের অবদানের জন্য আমরা ঋণী। এলাকায় চিকিৎসাসেবাসহ মানুষের যে কোনো কাজে রাত-বিরাতে সাইফুল ভাই ছুটে যান। পাঠশালাটি চালু করে শিশুদের পড়াশোনার জন্য যে মহৎ কাজটি করেছেন তার তুলনা কোনো কিছুর সঙ্গে চলে না। যে কারণে তিনি ও আশপাশের লোকজন পাঠশালাটি চালু রাখার জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।