নিজ দেশে ফিরে যেতে চায় রোহিঙ্গারা

প্রকাশ:| সোমবার, ৩০ জানুয়ারি , ২০১৭ সময় ১০:২৮ অপরাহ্ণ

কায়সার মানিক, উখিয়া  প্রতিনিধি
কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী শিবির ও আন রেজিস্ট্রার ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন রাখাইন অ্যাডভাইজারি কমিশনের একটি প্রতিনিধি দল।  সোমবার সকাল ১০টার দিকে কুতুপালং শরণার্থী শিবির সম্মেলন কক্ষে এক বৈঠকে মিলিত হন। উক্ত বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের দায়িত্বরত কর্মকর্তা সামসুদ্দোহা, বিভিন্ন এনজিও সংস্থার প্রতিনিধি, শরণার্থী ব্যবস্থাপনা কমিটির ২জন সদস্য। কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম নোমান বলেন, নিরাপত্তা ও নাগরিকত্বা পেলে মিয়ানমারে ফেরৎ যেতে চাই নির্যাতিত রোহিঙ্গারা। আরো বলেন, মিয়ানমার সরকারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সুচি গঠিত রাখাইন অ্যাডভাইজরি কমিশনের সদস্যরা দ্বিতীয় দিনের মতো সোমবার সকাল ১০টার দিকে উখিয়ার কুতুপালং শরনাথী ক্যাম্প পরিদর্শনে আসেন। রাখাইন স্টেটে সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারে সেনা-পুলিশের নিপীড়নের শিকার গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত জামবুনিয়ার আমির হোসেন, দু’ছেলে মেয়েকে হারিয়ে চলে আসা মুহাম্মদ জহুর, স্ত্রী ও মেয়ের নির্মম হত্যার দৃশ্য দেখে আসা হোসেন আহমদসহ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ৪০ নারী, ১৮ শিশু ও ১২জন পুরুষের সাথে কথা বলেন কমিশন সদস্যরা। তাদের কাছ থেকেও নিজ দেশে নির্যাতনের বর্ণনা মনোযোগ দিয়ে শুনেন তারা। প্রতিনিধি দলের সদস্যরা জানিয়েছেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করতে হবে। এসব সমস্যা সমাধান হলে সরকারকে নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানাবেন বলে আশ্বাস দেন নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের। ৩ সদস্যের প্রতিনিধি হলেন ২ জন মিয়ানমারের উইন ব্রা, আই লুইন ও ১ জন লেবাননের ঘানশন সালামী। কফি আনান ফাউন্ডেশনের সহযোগীতায় মিয়ানমারের ৬জন নাগরিক ও তিনজন বিদেশী বিশেষজ্ঞ গঠিত কমিশন এ বছর দ্বির্তীয়াদে সুপারিশ জমা দিবেন। রাখাইন রাজ্যের সব নাগরিকের মানবিক উন্নয়ন, নাগরিকত্ব, মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উপাদান গুলোকে কমিশন সুপারিশ তৈরী করবেন।
ক্যাম্প সূত্র আরো জানায়, রেজিস্টার ক্যাম্প থেকে বিরিয়ে কমিশন সদস্যরা অনিবন্ধিত ক্যাম্পের বিভিন্ন অলিগলি ঘুরে যার সাথে ইচ্ছে হয়েছে কথা বলেছেন। এসময় তাদের ভবিষ্যত চাওয়া সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে আশ্রিত রোহিঙ্গারা বলেছেন, নিজ দেশেই তারা ফিরে যেতে চান। তবে, নাগরিকত্ব নিয়েই তারা স্বাধীন ভাবে দেশে ফেরার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তাদের দাবি, মিয়ানমারে ১৪৭ জাতের মধ্যে রোহিঙ্গা ছাড়া বাকি সবার নাগরিকত্ব রয়েছে। তাই নিজ জন্মভূমি হলেও পরবাসীর মতোই জীবন কাটাতে হয় রোহিঙ্গা মুসলিমদের। পরিবারের পুরুষ সদস্যদের কাজে লাগিয়ে পারিশ্রমিক দেয়া হয়না। তাদের এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কোন কথা বলতে গেলে নির্যাতনের শিকার হতে হয়। এরই ধারাবাহিকতায় পুলিশ ক্যাম্পে দূর্বত্ত হামলার সূত্র ধরে রোহিঙ্গাদের ভোগদখলীয় জমি দখল, বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ, হত্যা-গুম ও নারীদের গণধর্ষণ করে অবর্ননীয় নির্যাতন করা হচ্ছে। তাই জীবন বাঁচাতে তারা সীমান্তবর্তী বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। আশ্রয় পেলেও বাংলাদেশে তারা থেকে যেতে চান না। নাগরিক মর্যাদা পেলে তারা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মিয়ানমার ফিরে যেতে চান। এটি নিশ্চিত করতে তারা কমিশন সদস্যদের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন। এসময় ক্যাম্প এলাকায় নানা পেস্টুনসহ লাইনে দাড়িয়ে নিজেদের দাবি দাওয়া তুলে ধরেন নির্যাতিত রোহিঙ্গারা।
শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে বেলা ২টার দিকে জেলা প্রশাসনের সাথে বৈঠক করেন রাখাইন কমিশনের সদস্যরা। জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে প্রায় ঘন্টাব্যাপী রুদ্ধদার বৈঠক করেন তারা।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোঃ আলী হোসেন বৈঠকের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, রাখাইন কমিশনের সদস্য মিয়ানমারের নাগরিক উইন ম্রা, আই লুইন এবং লেবাননের নাগরিক ঘাসান সালামেসহ আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম), জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন (ইউএনএইচসিআর) ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা সোমবার সকালে দ্বিতীয় দিনের মতো উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে যান। সেখান থেকে ফিরে জেলা প্রশাসকের অফিস কক্ষে বিশেষ সভায় মিলিত হন তারা।
তিনি আরো জানান, বৈঠকে রাখাইন কমিশন সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে মিয়ানমারের বিভিন্ন অভিযোগ ও দাবি সম্পর্কে জানতে চান। যুক্তিতে মিয়ানমারের অভিযোগ ভ্রান্ত বলে প্রমাণ করে দেয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক রাখাইন স্টেটে সংগঠিত ঘটনায় বাংলাদেশী জড়িত বলে মিয়ানমারের দাবিকে কল্পকাহিনী বলে জানানো হয়েছে। কারণ, মিয়ানমারের চেয়ে আমাদের জীবনযাত্রা অনেক উন্নত। তাই সেখানে আমাদের এখানকার কেউ যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। রোহিঙ্গারা আমাদের দেশে অবস্থান গেড়েছেন এমন প্রমাণ অহরহ রয়েছে, কিন্তু মিয়ানমারে আমাদের কোন বাংলাদেশী আবাস গেড়েছে এমন কোন প্রমাণ তারা দেখাতে পারবে না।
বৈঠকে বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ (বিজিবি), জেলা পুলিশের প্রতিনিধি, জাতিসংঘ ও অন্যান্য বিদেশি সংস্থার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


আরোও সংবাদ