নিজেকে ‘নিরপরাধ’ দাবি করলেন রেজা

প্রকাশ:| রবিবার, ১৪ জুন , ২০১৫ সময় ০৯:২৯ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম সরকারি নার্সিং কলেজের সিনিয়র শিক্ষিকা অঞ্জলী দেবী রাণী হত্যাকাণ্ডে প্রধান সন্দেহভাজন হিসাবে পটিয়া মাদ্রাসার সাবেক ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাকে (৩৮) গ্রেপ্তার করেছে নগর গোয়েন্দা পুলিশ।

চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি নগরীর পাঁচলাইশ থানার তেলিপট্টি মোড়ে নিজ বাসার কাছেই উর্দুগলির মুখে অঞ্জলী দেবী রানীকে এলোপাতাড়ি চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে দুর্বৃত্তরা। এর কয়েক ঘন্টাপর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

দিনদুপুরে সংঘটিত ‘ক্লুলেস’ এই হত্যাকাণ্ডে কোন গতি না পেলেও রহস্য উদঘাটনে সদা তৎপর ছিল গোয়েন্দা পুলিশের একটি টিম। এডিসি তানভীর আরাফাতের নেতৃত্বে এই টিমের টানা তিন মাসের গোয়েন্দা জালে শেষ পর্যন্ত আটকা পড়তে বাধ্য হলেন পটিয়া মাদ্রাসার সাবেক ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাকে। গোয়েন্দা পুলিশের দেয়া দাওয়াতে অংশ নিতে এসেই আটকা পড়েন গোয়েন্দা জালে। যিনি নার্সিং কলেজে হিজাব পড়া সংক্রান্ত বিষয়টি নিয়ে অঞ্জলী দেবী রানীকে উকিল নোটিশ দিয়েছিলেন। সেকারণে প্রথম থেকেই সন্দেহের তালিকায় ছিলেন তিনি।

শনিবার রাতে নগরীর জিইসি মোড়ের ‘মেরিডিয়ান’ নামের একটি রেস্টুরেন্ট থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়। রাতভর জিজ্ঞাসাবাদে এই হত্যাকাণ্ডের সাথে নিজের সম্পৃক্ততা স্বীকার করেননি তিনি। তবে ছাত্রীদের হিজাব পড়া নিয়ে আন্দোলনের জের ধরে অঞ্জলী দেবীকে উকিল নোটিশ পাঠানোর কথা স্বীকার করেছেন প্রধান সন্দেহভাজন সাবেক মাদ্রাসা কর্মকর্তা রেজা।

গোয়েন্দা পুলিশ রোববার দুপুরে তাকে আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের জন্য নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের হাতেই খুন হয়েছে শিক্ষিকা অঞ্জলী দেবী। হত্যার তদন্ত করতে গিয়ে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে পটিয়া মাদ্রাসার সাবেক কর্মকর্তা রেজার নামই সামনে চলে আসে। এরপর থেকে তার খুঁজে থাকে গোয়েন্দা পুলিশ। তবে গত বছরের জুন থেকে পটিয়া মাদ্রাসার চাকরিটিও ছেড়ে দেন মাদ্রাসার ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজা। এরপর থেকে নগরীর বাকলিয়া থানার রাহাত্তারপুল এলাকায় বসবাস করতে থাকেন তিনি। তাকে সন্দেহের তালিকায় রাখলেও সন্দেহ পাকাপোক্ত করতে না পারায় তাকে আটক করতে পারছিলেন না গোয়েন্দা পুলিশ।

এরপরও হাল ছাড়েনি গোয়েন্দা পুলিশ। সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতায় জঙ্গি কার্যক্রমের সাথে তার সম্পৃক্তা নিশ্চিত হওয়ার পরপরই তাকে ধরার ফাঁদ পাতে ডিবি। সন্দেহভাজন প্রধান আসামী রেজার পূর্ব পরিচিত নগর গোয়েন্দা পুলিশের এক পরিদর্শককে একাজে লাগানো হয়। তাকে দিয়ে চায়ের দাওয়াত দিয়ে নগরীর জিইসি মোড়ে অবস্থিত মেরিডিয়ান রেস্টুরেন্টে আনেন শনিবার রাতে। চা-নাস্তা খাওয়ার পর তাকে গোয়েন্দা পুলিশের অপর একটি টিম গিয়ে তাকে আটক করে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে আসে। তবে এই হত্যাকাণ্ডে রেজার সম্পৃক্ততার বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত হতে আরো দুই তিন দিন সময় লাগবে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র।

নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার এস এম তানভীর আরাফাত বলেন, ‘অঞ্জলী দেবী রানীকে নার্সিং কলেজের হিজাব পড়া সংক্রান্ত একটি ঘটনা নিয়ে রেজা উকিল নোটিশ দিয়েছিলেন। এছাড়া তার অতীত ও পারিবারিক কর্মকাণ্ডকে দীর্ঘদিন ধরে পর্যবেক্ষণে রেখে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। অঞ্জলি হত্যাকাণ্ডটা যেহেতু একটি অর্গানাইজড ক্রাইম। সেহেতু জঙ্গি সংগঠনের সাথে তার সম্পৃক্তা রয়েছে কিনা কিংবা এই হত্যাকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততা কতটুকু তা তদন্তে উঠে আসবে।’

তবে অঞ্জলী দেবী রানী হত্যাকাণ্ডের প্রধান সন্দেহভাজন মোহাম্মদ রেজার সাথে (৩৮) শনিবার দুপুরে ডিবি কার্যালয়ে কথা এ প্রতিবেদকের। এসময় তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ডের সাথে আমার নূন্যতম সম্পৃক্ততা নেই। আমি শতভাগ নির্দোষ। আমি ইনোসেন্ট।’

অঞ্জলী দেবীকে উকিল নোটিশ দেয়ার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘পত্রিকা পড়ে আমি জানতে পারি, অঞ্জলী দেবী নার্সিং কলেজের এবাদত খানায় প্রবেশ করে মুসলিম শিক্ষার্থীদের বলেছিলেন, জুতা পায়ে দিয়ে তো আমি এখানে ঢুকলাম। তোমাদের আল্লাহ তো আমার কিছুই করেনি। হিজাব পড়ার দরকার নেই। এসব বলে তিনি ইসলামকে নিয়ে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেছিলেন।’

কেন উকিল নোটিশ দিয়েছিলেন ? এমন প্রশ্নের উত্তরে গ্রেপ্তার রেজা বলেন, ‘অঞ্জলী দেবীর এই কথা পত্রিকায় পড়ে আমি সহ্য করতে পারিনি। ধর্মীয় অনুভূতি আঘাত দেয়ার অভিযোগ এনে আমি তাকে (অঞ্জলী দেবী) একটি উকিল নোটিশ দিয়েছিলাম। তার জবাব পেয়ে আমি আর কিছু বলেনি। এই জবাবে আমি সন্তুষ্ট ছিলাম। তিনি কথাটি এভাবে বলেননি বলে আমাকে জানিয়েছেন এবং তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন।’

পুলিশের দাবি এই হত্যাকাণ্ডে রেজাই প্রধান সন্দেহভাজন আসামী। কিন্তু সেই রেজাই বলছেন, ‘গত বছরের জুন মাস পর্যন্ততো আমি পটিয়া মাদ্রাসায় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলাম। ওই সময় নিজ বাড়ী পটিয়ায় থাকলেও চাকরি ছাড়ার পর থেকে আমি বাকলিয়া থানার রাহাত্তারপুল এলাকায় বসাবাস করে আসছিলাম। পাশপাশি টুকটাক ব্যবসা করছিলাম।’ তবে কি ব্যবসা করা হয় সেটি স্পষ্ট করেননি অঞ্জলী হত্যার প্রধান সন্দেহভাজন আসামী রেজা।

গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘পূর্ব পরিচিত ডিবি এক পরিদর্শকের দেয়া মেরিডিয়ানে দাওয়াত খেতে আসার পর ডিবির আরেকটি টিম আমাকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে আসে। তারা বলেছেন, রাতে এই মামলা নিয়ে কথা বলে আমাকে ছেড়ে দেবে। কিন্তু এখন বলছে, আমাকে নাকি এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে নেবে।’ বিষয়টি স্বীকার করেছেন এডিসি তানভীর আরাফাতও।

কোন জঙ্গি সংগঠনের সাথে জড়িত আছেন কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে সাবেক মাদ্রাসা কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজা বলেন, ‘আমি কোন সংগঠনের সাথে জড়িত নই। এসবের সাথে কেন আমাকে জড়ানো হচ্ছে। আল্লাহ জানে অঞ্জলীকে কে হত্যা করেছে। আমি একজন আইএ পাশ করা মানুষ। আমি কেন এসব হত্যাকাণ্ড করতে যাবো। আমার কোন স্বার্থ আছে নাকি।’