নাইরোবির বিপণিবিতানে এখনো জিম্মিসংকট চলছে, নিহত ৫৯

প্রকাশ:| রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর , ২০১৩ সময় ১১:২৯ অপরাহ্ণ

Kenya_2কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবির যে বিপণিবিতানটিতে গতকাল শনিবার ইসলামপন্থী অস্ত্রধারীরা জিম্মিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটিয়েছিল, তা আজ রোববার শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত (সন্ধ্যা ছয়টা) চলছে। এখন পর্যন্ত ওই ঘটনায় অন্তত ৫৯ জন নিহত ও কয়েক শ মানুষ আহত হয়েছে।
রয়টার্স বলছে, ইসলামপন্থী ও কট্টর সংগঠন আল শাবাবের সদস্যরা এ ঘটনাটি ঘটিয়েছে। সংগঠনটি সোমালিয়ার শান্তিরক্ষা মিশনে কেনিয়ার সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণের বিরোধিতা করে আসছে।
শাবাবের সদস্যরা যে বিপণিবিতানটিতে হামলা চালিয়েছে, সেটির অনেকগুলো বিপণির মালিক ইসরায়েলি বংশোদ্ভূত লোকজন। এ বিতানটিতে বহু বিদেশি ও কেনীয় ক্রেতা ভিড় করেন।
এক প্রত্যক্ষদর্শী আজ রয়টার্সকে জানান, অনেকক্ষণ চুপচাপ থাকার পর আজ দুপুরে টানা ৩০ সেকেন্ড ধরে গোলাগুলি হয়েছে। এরপর ছদ্মবেশী সেনারা ক্রাউচ করে বিপণিবিতানটির এক রেস্তোরাঁর পেছনের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকেছে।
আল কায়েদার সহযোগী সোমালি ইসলামি সংগঠন শাবাব দাবি করেছে, গতকাল তারা ওয়েস্টগেট বিতানটিতে হামলা চালিয়ে কানাডা ও ঘানার দুজন কূটনীতিকসহ বেশ কয়েকজন বিদেশি নাগরিককে হত্যা করেছে।
কেনিয়ার সরকার গতকালই মৃতের সংখ্যা ৩৯ বলে জানিয়েছিল। আজ তা বাড়িয়ে ৫৯ জন করেছে। সরকার দাবি করেছে, তারা এখন পর্যন্ত এক হাজার জনকে জিম্মি অবস্থা থেকে উদ্ধার করেছে। এখনো কতজন জিম্মি আছে, সেটি জানা সম্ভব হয়নি। তবে ১০-১৫ জন হামলাকারীর অবস্থান নিশ্চিত করতে পেরেছেন কেনীয় সেনারা।হামলাকারীদের গুলিতে আহত এক নারী সাহায্যের জন্য আর্তনাদ করছেন। ছবি: রয়টার্স
কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উহুরু কেনিয়াত্তা জানিয়েছেন, নিহত লোকজনের মধ্যে তাঁর নিকটাত্মীয়রাও আছেন। গত মার্চে নির্বাচিত হওয়ার পরে তিনি এখন সবচেয়ে জটিল সময় অতিক্রম করছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এর আগেও এ ধরনের সন্ত্রাসী হামলা মোকাবিলা করেছি।’
নাইরোবিতে এর আগে এ ধরনের হামলা হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। সে সময় আল কায়েদার পূর্ব-আফ্রিকীয় শাখা শহরটিতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে বোমা হামলা চালিয়ে ২০০ জনকে হত্যা করেছিল। ২০০২ সালেও ইসলামপন্থীরা এক হোটেলে হামলা চালায়। ওই হোটেলটির মালিক ছিলেন এক ইসরায়েলি ব্যক্তি।
কেনিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জোসেফ ওলে লেঙ্কু প্রতিবেদকদের বলেন, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৯ জন হয়েছে। বিপণিবিতানটির ভেতর থেকে জিম্মিদের উদ্ধারে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা যথাসম্ভব সবকিছু করছে।

ওয়েস্টগেট বিপণিবিতানের হামলায় স্বজনদের হারিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়া এক ব্যক্তিকে চিকিত্সার জন্য বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবীরা। ছবি: রয়টার্সহামলা
গতকাল শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টায় (বাংলাদেশ সময় বেলা সাড়ে তিনটা) শাবাবের সদস্যরা হামলা চালায়। ‘দ্য গার্ডিয়ান’ বলছে, ভারী অস্ত্রসহ হামলাকারীরা কয়েকটি কারে চড়ে ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে নাইরোবির সবচেয়ে অভিজাত বিপণিবিতানটিতে প্রবেশ করে। এরপর তারা সেখান থেকে মুসলমানদের বের হয়ে যেতে দেয়। তবে এর জন্য লোকজনকে প্রমাণ দিতে হয় যে তারা মুসলমান। কোনো সুরা, আয়াত বা দোয়া মুখস্থ বলে বা ইসলাম-সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাব দিয়ে মুসলমানেরা ছাড়া পান। যাঁরা জবাব দিতে পারেননি, তাঁদের তারা গুলি করে হত্যা করে।
ক্রেতা, প্রবাসী ও ধনী কেনীয়রা যে যেদিকে পারে, সেদিকে পালানোর চেষ্টা করে। অধিকাংশ দোকানের কোণে, বারান্দায় বা ব্যাংকের ভল্টে ঢুকে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করে।
এর কয়েক ঘণ্টা পর নিরাপত্তা বাহিনীর অস্ত্রধারী সেনারা উদ্ধারকাজে যোগ দেন। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা বিপণিবিতানটির ভেতরে ঢুকে বহুতল ভবনটির প্রতিটি তলা একে একে খালি করতে শুরু করেন। ইসলামপন্থীদের গুলিতে আহত লোকজনের অনেককে ক্রেতাদের ঠেলাগাড়িতে করে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়।
২০০৮ সালে সন্ত্রাসীরা মুম্বাইয়ের তাজমহল হোটেলে যে ধরনের হামলা চালিয়েছিল, এখানেও অনেকটা তা-ই করা হয়েছে। বহুতল ভবনটির বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করছে হামলাকারীরা। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা এক আহত বন্দুকধারীকে আটক করেছিলেন। কিন্তু সে পরে মারা যায়।ওয়েস্টগেট বিপণিবিতানটির বাইরের চিত্র। ছবি: রয়টার্স
আল শাবাব টুইটারের এক বার্তায় ঘটনার দায়দায়িত্ব স্বীকার করেছে। শাবাবের মুখপাত্র বলেন, সোমালিয়ায় কেনীয় সেনারা যে নৃশংসতা চালিয়েছে, সেটির জবাব হিসেবে তারা এ হামলা চালিয়েছে।
তারা লিখেছে, ‘সোমালিয়ার মুসলমানেরা কেনীয় হানাদারদের যে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, ওয়েস্টগেট বিপণিবিতানে হামলা তার একটি ক্ষুদ্র উদাহরণ মাত্র।… আমরা বহুদিন ধরে আমাদের দেশে কেনীয়দের বিরুদ্ধে লড়ছি। এখন সময় এসেছে যুদ্ধক্ষেত্র স্থানান্তর করে যুদ্ধটিকে তাদের দেশে নিয়ে যাওয়ার।’ ওই টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে আরও বলা হয়, ‘কেনীয় সরকার বিপণিবিতানের ভেতরে ঢুকে আমাদের সঙ্গে সমঝোতা করতে চাইছে। কিন্তু কিছুতেই সমঝোতা হবে না।’
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, নিহতদের মধ্যে শিশুরাও আছে। নিহতদের বয়স দুই বছর থেকে ৭৮ বছর পর্যন্ত। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, ভুক্তভোগীদের অনেকে ছিলেন এক রান্না প্রতিযোগিতার দর্শক। ওই অনুষ্ঠান চলাকালে অস্ত্রধারীরা দর্শকদের ওপরে হামলা চালায়।
সেনা সদস্যরা হেলিকপ্টারে করে রাজধানীর আকাশে টহল দিচ্ছেন। আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যরাও রাইফেল কাঁধে করে ভবনটির আশপাশ জুড়ে রয়েছেন।

কেনিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী ও আল শাবাব সদস্যদের গোলাগুলির মধ্যে পড়ে নিহত ১৮ বছর বয়সী এক মুসলমান তরুণের লাশ কবর দিতে নিয়ে যাচ্ছে তাঁর স্বজনেরা। ছবি: রয়টার্সঅভিযান
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জোসেফ ওলে লেঙ্কু বলেন, এখন পর্যন্ত আহত ১৭৫ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে।
ধারণা করা হচ্ছে, এ হামলার কারণে পূর্ব আফ্রিকার সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশটি অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে। কারণ, দেশটির প্রধান উপার্জন খাত পর্যটন শিল্প।
ফ্রান্স আজ বলেছে, তাদের দুজন নাগরিক মারা গেছেন। কানাডাও বলেছে, তাদের দুজন নাগরিক নিহত হয়েছেন। তাদের একজন ২৯ বছর বয়সী কূটনীতিক। ঘানার কূটনীতিক ও কবি কফি আওনুরও আছেন নিহতদের মধ্যে। চীনের সংবাদ সংস্থা বলছে, নিহতদের মধ্যে এক চীনা বৃদ্ধাও আছেন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বলেছেন, কয়েকজন মার্কিন নাগরিক আহত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (ইউএসএআইডি) এক কর্মকর্তার স্ত্রীও আহত হয়েছেন। কেরি কেনিয়াকে সব ধরনের সহায়তার প্রস্তাবও দিয়েছেন।
এর আগে শাবাব কয়েকবার কেনিয়াকে হুমকি দিয়ে বলেছিল, যদি কেনিয়া শান্তিরক্ষা মিশন থেকে সরে না আসে, তবে তারা দেশটিতে হামলা চালাবে।