নদীর স্রোতে সাংবাদিক আওরঙ্গজেব সজীব

প্রকাশ:| বুধবার, ২৩ ডিসেম্বর , ২০১৫ সময় ১১:৪০ অপরাহ্ণ

সাংবাদিক আওরঙ্গজেব সজীব। আমাদের সবার প্রিয় সজীব ভাই। তার নিখোঁজ হওয়ার খবরটি আমি প্রথম পাই বাংলামেইলের স্টাফ করেসপন্ডেন্ট শরিফ ইমতিয়াজের কাছে। সজীব ভাই যেদিন নিখোঁজ হলেন অর্থাৎ রোববার, যথারীতি অফিসের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হই। তখনো বুঝতে পারিনি অফিসে যাওয়া মাত্রই এমন একটি সংবাদের (দুঃসংবাদ) মুখোমুখি হতে হবে আমাকে। ঘড়িতে তখন বেলা ৩টা, অফিসের দরজাটা ঠেলে যেই ভেতরে ঢুকলাম, অমনি সাংবাদিক শরিফ ইমতিয়াজ তার ডান হাতটি আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘সৈকত ভাই, আমাদের ঢাকা মেডিকেল করেসপন্ডেন্ট সজীব ভাইকে পাওয়া যাচ্ছে না! তিনি নাকি লঞ্চ থেকে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিখোঁজ হয়েছেন!’

সাংবাদিক আওরঙ্গজেব সজীবদুঃসংবাদটি শোনার পর একটি ধাক্কা খেলাম। এক মিনিট কী যেন ভাবলাম। কিন্তু মুখ দিয়ে কিছুই বলতে পারলাম না। ঠিক সেই মুহূর্তে একজন সাংবাদিকের কথাও বিশ্বাস হচ্ছিল না আমার। সঙ্গে সঙ্গে ফোন লাগালাম পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের এসআই বন্ধু জুয়েল চন্দ্র দেবনাথকে। ঢাকায় আমরা একসঙ্গে আছি অনেকদিন ধরে। তার চেয়ে বড় কথা ঢাকা মেডিকেল জোনে দায়িত্ব পালনের সুবাদে সজীব ভাইয়ের সঙ্গে জুয়েলের প্রতিদিনই দেখা হয়।

খবর শুনে সে আমার চেয়ে দ্বিগুণ অবাক হলেন। ‘কি কন! নাইট ডিউটি করে সকালে বাসায় ফেরার আগেও তার (সজীব) সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। দাঁড়ান খবর নিচ্ছি?’ এই বলে ফোন কাটলেন জুয়েল। এর কিছুক্ষণ পর ‘সাংবাদিক সজীব রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ’ শিরোনামে একটি নিউজ আমার হাত দিয়েই বাংলামেইলে প্রকাশ হলো। তারপর অন্য পত্র-পত্রিকায়, টিভি স্ক্রলে সজীব ভাইয়ের নিখোঁজ হওয়ার সংবাদ আসতে দেখলাম। এভাবেই কেটে গেলো তিন তিনটি দিন।

অবশেষে মৃতদেহের ছবিসহ খবর এলো ‘নদী থেকে সাংবাদিক সজীবের মৃতদেহ উদ্ধার’। কোনো সন্দেহ রইলো না, সাংবাদিক আওরঙ্গজেব সজীব, সবার প্রিয় সজীব ভাই আর আমাদের মাঝে নেই।

সজীব ভাইয়ের কালো কলমটি হয়তো ভেসে গেছে নদীর স্রোতে। লাল কলমটির পাশেই সব সময় স্থান পেতো কালো কলমটি। বা হাতের তালুতে এক টুকরো কাগজ ফেলে কতশত মৃত্যু কিংবা দুর্ঘটনার খবরই না লিখেছেন সেই কলম দিয়ে। কলমের কাজ শেষ হতেই পকেট থেকে মোবাইলটি বের করে…হ্যালো ভাই, একটি খবর আছে… এভাবেই প্রতিদিন সংবাদ জানাতেন বাংলামেইলের নিউজরুমে। এখন কি না তিনিই বাংলামেইলের পাতায় হয়ে গেলেন প্রধান খবর।

সজীব ভাইয়ের স্ত্রী মোর্শেদা বেগম জানিয়েছিলেন, শনিবার রাতে অসুস্থ এক সাংবাদিককে দেখার কথা বলে সজীব ভাই টঙ্গী গিয়েছিলেন। বলেছিলেন- অনেক রাত হতে পারে। পরে ভোর ৫টার দিকে তিনি বাসায় ফেরেন। দুই ঘণ্টা বিশ্রাম নিয়ে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে নাস্তা খেয়ে আবার অফিসের কাজের কথা বলে বাসা থেকে বেড়িয়ে যান।

রোববার সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত সজীব ভাইয়ের অবস্থান ছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই। একটি বেসরকারি টেলিভিশন থেকে সরাসরি সম্প্রচারিত এক অনুষ্ঠানে তিনি লাইভ ভয়েজও দিয়েছেন। নিখোঁজের আগেরদিন তিনি ছিলেন টঙ্গীতে। ওইদিন রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে সকাল সোয়া ৯টায়  ‘এমভি তাকওয়া’ নামের একটি ছেড়ে গিয়েছিল। সেই লঞ্চ থেকে তিনি লাফ দিয়েছেন বলে বলা হচ্ছে। কিন্তু তার মোটরসাইকেলটি ঢাকা মেডিকেলের পুলিশ ক্যাম্পে পাওয়া গেছে। সেখানেই প্রতিদিন তিনি মোটরসাইকেল রেখে কাজে যেতেন। তবে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে মোটরসাইকেলটিকে চাবি লাগানো অবস্থাতেই পাওয়া গেছে।

সজীব ভাই বাংলাদেশ মেডিকলে রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমআরএ) সাবেক সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুরে। তিনি এক ছেলে ও স্ত্রীসহ ঢাকার বকশীবাজার কমলদাহ রোডের ৯ নম্বর বাসার তৃতীয় তলায় বসবাস করেন। সজীবের একমাত্র সন্তান সোহান। তিনি প্রকৌশল বিষয়ে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। বাসায় কারো সাথেই তার কোনো মনোমালিন্য বা ঝগড়া হয়নি বলে তার পরিবারের দাবি।

নিখোঁজের তিনদিন পর বিকেলে নিউজরুমে ফোন দেন আমাদের মুন্সীগঞ্জ করেসপন্ডেন্ট শিমুল ভাই। জানান, সজীব ভাইয়ের মরদেহ পাওয়া গেছে। ধলেশ্বরী নদী থেকে ভাসমান অবস্থায় সেটি উদ্ধার করেছে মুন্সীগঞ্জ পুলিশ। বিকেল পৌনে ৪টার দিকে তার মরদেহ মুন্সীগঞ্জ শহর সংলগ্ন প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ স্কুল অ্যান্ড কলেজের পেছনে নয়াগাঁও এলাকার ধলেশ্বরী নদী থেকে উদ্ধার করা হয়।

 

নয়াগাঁও এলাকায় ধলেশ্বরী নদীতে গোসল করতে গেলে কচুরিপানার মধ্যে একটি মরদেহ দেখতে পায় স্থানীয়রা। পরে তারা মুন্সীগঞ্জ পুলিশকে খবর দেয়। খবর পেয়ে সদর থানার ওসি মো. ইউনুসের নেতৃত্বে স্থানীয় মুক্তারপুর নৌ-পুলিশের একটি দল বিকেল পৌনে ৪টার দিকে নদী থেকে সজীব ভাইয়ের নিথর দেহটি উদ্ধার করে। সজীব ভাইয়ের পরনে ছিল ফুলপ্যান্ট, একটি গোলাপী রঙয়ের স্টাইপ ফুলহাতা শার্ট, তার উপরে একটি হাফ সোয়েটার। এছাড়া তার বুক পকেটে প্রিয় লাল রঙয়ের কলমটিও ছিল।

তবে মরদেহটি ফুলে যাওয়ায় তার চেহারা চেনা যাচ্ছিল না। তথ্য সংগ্রহের জন্য ঘটনাস্থলে ছুটে যান স্থানীয় সাংবাদিকরা। মরদেহের মুখে গোপ থাকার কারণে সাংবাদিকরা তাকে নিখোঁজ আওরঙ্গজেব সজীব বলে ধারণা করে। সবশেষে সজীব ভাইয়ের ছেলে সোহান, স্ত্রী মোর্শেদা বেগম এবং তার ভাই রাজন নিশ্চিত করেন যে, সেটি সজীব ভাই-ই।

কিন্তু সন্দেহ হচ্ছে- সজীব ভাইয়ের মতো সদালাপি-হাস্যোজ্জ্বল একজন মানুষ লঞ্চ থেকে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে মারা যেতে পারেন কি না। বিশেষ করে, একজন নির্ভীক সাংবাদিকের ভাসমান মৃতদেহের বুক পকেটে যখন সুন্দরভাবে গেঁথে থাকে একটি লাল কলম।  >>

সৈকত ধারা, নিউজরুম এডিটর, বাংলামেইল২৪ডটকম