ধারালো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মারামারিতে ছাত্রলীগ কর্মী নিহত

প্রকাশ:| রবিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি , ২০১৭ সময় ১২:১০ পূর্বাহ্ণ

নগরীর কোতয়ালি থানার রিয়াজউদ্দিন ‍বাজার এলাকায় ছাত্রলীগের দু’পক্ষের মারামারিতে ইয়াছিন আরাফাত (২২) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন।  একই ঘটনায় হারুনুর রশীদ (২৪) নামে আরও এক যুবক গুরুতর আহত হয়েছেন।

শনিবার (১১ ফেব্রুয়ারি) বিকেল পৌনে ৪টার দিকে এই ঘটনা ঘটেছে।

নিহত ইয়াছিন আরাফাত সরকারি সিটি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সম্মান শ্রেণীর তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এবং ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে জানিয়েছেন নগর পুলিশের উপ কমিশনার (দক্ষিণ) এস এম মোস্তাইন হোসেন।

তিনি বাংলানিউজকে জানান, ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মারামারি হয়েছিল।  উভয় পক্ষ ধারালো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মারামারিতে জড়িয়ে পড়েছিল। গুরুতর আহত ইয়াছিনকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেছেন।  আহত হারুনুর রশীদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

তবে পুলিশ সূত্রে ইরফান রানা নামে আরও এক কর্মীকে আহত অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।  তবে হাসপাতালে গিয়ে ইরফানকে পাওয়া যায়নি।

চিকিৎসাধীন হারুনুর রশীদকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কোতয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নূর মোহাম্মদ।

ইয়াছিন আরাফাত সাতকানিয়া উপজেলার ছদাহা ইউনিয়নের মো.কামাল উদ্দিনের ছেলে।  নগরীর বাকলিয়া ডিসি রোডে কামাল উদ্দিনের বাসা হলেও ইয়াছিস রিয়াজউদ্দিন বাজারের চৈতন্য গলিতে ব্যাচেলর মেসে থাকতেন।

আহত হারুনুর রশীদও সাতকানিয়া পৌরসভা এলাকার আব্দুল মতিনের ছেলে।  সরকারি সিটি কলেজের বিএসএস পাশ কোর্সের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র।  তাদের বাসা নগরীর নন্দনকানন এলাকায়।

ইয়াছিন এবং হারুন উভয়ই নগর ছাত্রলীগের উপ গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল আহাদের অনুসারী।  সিটি কলেজকেন্দ্রিক ছাত্রলীগ নেতা আহাদ আওয়ামী লীগ নেতা জামশেদুল আলম চৌধুরী ও সাদেক হোসেন পাপ্পুর অনুসারী।  আবার জামশেদুল প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নূরুল ইসলাম বিএসসির অনুসারী হিসেবে চট্টগ্রামের রাজনীতিতে পরিচিত।

কোতয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নূর মোহাম্মদ বাংলানিউজকে জানান, বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ইয়াছিন আরাফাত তার কয়েকজন বন্ধু নিয়ে রিয়াজউদ্দিন বাজারে সফিনা হোটেলের পাশের গলিতে একটি মেসে ভাত খেতে গিয়েছিল।  এর প্রায় আধাঘণ্টা আগে সফিনা হোটেলের সামনে ইয়াছিন ও হারুনের সঙ্গে মারামারি হয়।  এর জের ধরে ভাত খেতে বসার পর হারুন ৫-৬ জন ছেলে নিয়ে সেখানে এলে উভয়পক্ষ আবারও মারামারিতে জড়ায়।

তবে চমেক হাসপাতালের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন হারুনুর রশীদের দাবি, সকালে সিটি কলেজে জুনিয়র ছেলেদের মধ্যে মারামারি হয়েছিল।  জুনিয়র ছেলেদের মধ্যে হারুন এবং ইয়াছিন উভয়ের অনুসারী ছিল।  পরে সিনিয়র নেতারা ক্যাম্পাসে গিয়ে উভয়পক্ষকে মিটমাট করে দেন।  এরপর হারুন তার ১০-১৫ জন বন্ধু নিয়ে সফিনা হোটেলের পাশের গলিতে মেসে ভাত খেতে যায়।  সেখানে দা-কিরিচি নিয়ে ইয়াছিনের নেতৃত্বে ৩০-৪০ জন হামলা চালায়।  হামলাকারীরা সিআরবি এলাকার ছেলে বলে দাবি হারুনের।

হারুনের আরও দাবি, তাদের হাতে কোন অস্ত্রশস্ত্র ছিল না।  ইয়াছিনরা তাদের মারতে মারতে মার্কেটের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়।  এসময় ইয়াছিনের সঙ্গে যাওয়া ‍কারও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তার মৃত্যু হয়েছে।

তবে আটক হারুনের এই দাবি সত্য নয় জানিয়ে ঘটনাস্থলে যাওয়া পুলিশ পরিদর্শক নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘ভাত খেতে গিয়েছিল ইয়াছিনরা।  সেখানে হারুনরা গিয়ে হামলা করে। ’

চমেক হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক জহিরুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, ইয়াছিনের বুকের মধ্যে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে জখমের চিহ্ন দেখা গেছে।  আর আহত হারুনের দুই হাতের বিভিন্ন অংশে, দুই বাহু এবং গলায় জখমের চিহ্ন দেখা গেছে।

চমেক পুলিশের ধারণা, আহত আরেকজন ইরফান রানা হাসপাতালে বোরহান নামে প্রথমে ভর্তি হয়েছিল।  ক্যাজুয়ালিটিতে প্রাথমিক চিকিৎসা নেয়ার পর সে পালিয়ে গেছে।

‘ইয়াবা ব্যবসা’ নিয়ে বিরোধে হত্যাকান্ড  

প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, ইয়াছিন ও হারুন উভয়ই নগর ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল আহাদের কর্মী।  তবে সম্প্রতি ইয়াছিন রিয়াজউদ্দিন বাজারকেন্দ্রিক ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে।  এটা নিয়ে তাদের গ্রুপে সমস্যা সৃষ্টি হয়।  রিয়াজউদ্দিন বাজারকেন্দ্রিক আরও বিভিন্ন ধরনের অবৈধ কর্মকান্ড নিয়েও গ্রুপের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়।

এরপর আহাদ তাকে গ্রুপ থেকে বের করে দেয়।  এরপর থেকেই মূলত ইয়াছিনের অনুসারীরা এবং আহাদের অনুসারী হারুনের ছেলেরা পরস্পর মুখোমুখি অবস্থান নেয়।

কোতয়ালি থানার ওসি মো.জসীম উদ্দিন বলেন, তাদের (ছাত্রলীগ) কাছ থেকেই শুনছি ইয়াবা ব্যবসা নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল।  এটা আমরা তদন্ত করে দেখছি।

কোতয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নূর মোহাম্মদ বাংলানিউজকে বলেন, মাস দেড়েক আগে আহাদের গ্রুপে সমস্যা হয়।  তারপর থেকে ইয়াছিন আর তাদের সঙ্গে ছিল না।  মূলত সমস্যা সেখান থেকেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা বাংলানিউজকে বলেন, রিয়াজউদ্দিন বাজারকেন্দ্রিক হুন্ডি, চোরাই মোবাইল, ইয়াবা ব্যবসার নিয়ন্ত্রকদের মধ্যে ছাত্রলীগের এই গ্রুপটি ছিল।  দোকানে দোকানে চাঁদাবাজিও করত।  আধিপত্য কিংবা কলেজকেন্দ্রিক কোন বিরোধ নয়, অবৈধ ব্যবসার বিরোধেই এই হত্যাকান্ড ঘটেছে।

আহত ছাত্রলীগ কর্মী হারুনুর রশীদ বাংলানিউজকে বলেন, ইয়াছিন ইয়াবা আর চোরাই মোটর সাইকেলের ব্যবসা করত।  ৫-৬ মাস আগে আহাদ ভাই তাকে গ্রুপ থেকে বের করে দিয়েছিল।  এরপর থেকে সে একা একাই চলত।  আমাদের সঙ্গে আর মিশত না।

এই ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছেন কোতয়ালি থানার ওসি জসিম উদ্দিন।

‘আমরা কেউ বিএনপি করি, কেউ জামায়াত’

ইয়াছিন আরাফাত সিটি কলেজে ভর্তি হয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়ালেও তার পরিবারের সদস্যরা বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।  চমেক হাসপাতালে ভাতিজার মরদেহ দেখতে এসে একথা জানিয়েছেন খোদ ইয়াছিনের চাচা আবছার উদ্দিন।

ইয়াছিন সাতকানিয়া ছদাহায় এসএসসি ও এইচএসসি শেষ করে ভর্তি হন সিটি কলেজে।  এর আগ পর্যন্ত ইয়াছিন কখনোই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল না বলে জানিয়েছেন আবছার।

তিনি বাংলানিউজকে বলেন, আমাদের ফ্যামিলিতে কেউ বিএনপি করি, কেউ জামায়াত করি।  ইয়াছিন ছাত্রলীগ করত।   তাকে বলতাম, রাজনীতি করছ, বেশি ফ্ল্যাশ (ফোকাস) হওয়ার দরকার নেই।

ইয়াছিনের বাবা কামাল উদ্দিন রাজনীতি করেন কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগে বিএনপি করতেন।  জামায়াতও করতেন।  বিএনপি-জামায়াত সব করেন।  আমরা চার ভাই।  আমরা কেউ বিএনপি করি, কেউ জামায়াত করি।  একজন আওয়ামী লীগ করে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, চৈতন্য গলিতে শিবিরের মেস হিসেবে পরিচিত একটি বাসায় থাকত ইয়াছিন।  আহাদের নেতৃত্বে তাদের গ্রুপে যারা ছিল তাদের প্রায় সবার বাড়ি সাতকানিয়ায়।  রিয়াজউদ্দিন ‍বাজারে জামায়াতপন্থী ব্যবসায়ীদের আধিপত্য আছে এমন মার্কেটগুলোতেই ছিল তাদের বেশি আনাগোনা।

ইয়াছিনের বাবা কামাল উদ্দিন নগরীর বাকলিয়ায় ডিসি রোডের মুদি দোকানদার।  তার ৪ ছেলে ও ২ মেয়ের মধ্যে ইয়াছিন সবার ছোট।

কামাল উদ্দিন বলেন, আমি দোকানে ছিলাম।  হঠাৎ আমার মেয়ে ফোন করে বলে, আব্বু তাড়াতাড়ি মেডিক্যালে আসেন।  ভাইয়ের অবস্থা খুব খারাপ।  আমি এসে দেখলাম ছেলের লাশ।

একথা বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন কামাল উদ্দিন।  তিনি বলেন, রাজনীতি মানে তো খুন খারাবি না।  ছেলেকে বারবার বলেছিলাম এই রাজনীতিতে যাইস না।  ছেলে কথা শুনেনাই।  এখন লাশ হতে হল।

ইমু বললেন ‘সক্রিয় ছাত্রলীগ কর্মী’

হত্যকান্ডের খবর পেয়ে চমেক হাসপাতালে যান নগর ছাত্রলীগের সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমু।

তিনি ইয়াছিনকে সক্রিয় ছাত্রলীগ কর্মী দাবি করে বলেন, ঘটনার এক ঘন্টা আগেও কলেজে আমার সঙ্গে তার দেখা হয়েছে।  সে বলল, ভাইয়া আমি বাসায় যাচ্ছি।  এর কিছুক্ষণ পর শুনতে পেলাম তাকে রিয়াজউদ্দিন বাজারে কারা নাকি ছুরি মেরেছে।

তিনি বাংলানিউজকে বলেন, সফিনা হোটেলের সামনে সিসি ক্যামেরা আছে।  পুলিশ ভিডিও ফুটেজ দেখে হত্যাকান্ড কারা ঘটিয়েছে সেটা উদঘাটন করুক।  হত্যাকারীদের গ্রেফতার করুক।  আমি এই ঘটনার বিচার দাবি করছি।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত সিটি কলেজ ছাত্রলীগ এককভাবে সাবেক মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও সহ সভাপতি খোরশেদ আলম সুজনের  নিয়ন্ত্রণে ছিল।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সিটি কলেজের সাবেক-বর্তমান নেতাদের একটি অংশ তৎকালীন সাংসদ (বর্তমানে মন্ত্রী) নূরুল ইসলাম বিএসসির সঙ্গে যোগ দেয়।  ২০১৫ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর বিএসসির গ্রুপ থেকে কাউন্সিলর তারেক সোলায়মান সেলিমের নেতৃত্বে একটি অংশ বেরিয়ে মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের গ্রুপে যোগ দেয়।

ইমুর দাবি, ইয়াছিন আহাদের সঙ্গে মিলে একটি গ্রুপে থাকলেও সবার সঙ্গে তার ভাল সম্পর্ক ছিল।  ইয়াছিন একজন সক্রিয় ছাত্রলীগ কর্মী ছিল।