ধামাচাপা দেয়া রহস্যজনক মৃত্যু

নিউজচিটাগাং২৪/ এক্স প্রকাশ:| সোমবার, ২১ মে , ২০১৮ সময় ১০:২১ অপরাহ্ণ

পাঠক.নিউজ:: চট্টগ্রাম মহানগরীর কোতোয়ালী থানাধীন নন্দনকানন এলাকায় চাঁদমনি ওরফে ইয়াছমিন (১৫) নামে গৃহকর্মী কিশোরীর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে।

ব্যবসায়ী গৃহকর্তা পরিবারের দাবী বকাঝকা করায় ভবনের উপর থেকে লাফিয়ে পড়ে ইয়াছমিন আত্মহত্যা করেছে। তবে এক কথা মানতে নারাজ তার তার পরিবার। তাদের দাবী ইয়াছমিনকে মেরে লাশ উপর থেকে ফেলে দিয়ে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করছে। তারা ইয়াছমিনকে মারধর করেন বলেও অভিযোগ করেন তার মা ও ভাই।

সুত্র জানায়, গত ১৭ মে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে কাদের টাওয়ারের পাশে এ,কে ম্যানসনের (ইউসিবিএল জোনাল অফিস ভবন) ৯ তলায় এ ঘটনা ঘটেলেও পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ায় কোন গণমাধ্যমে এ খবর প্রকাশ হয়নি।

পুলিশ জানায়, ঐদিন গভীর রাতে একে ম্যানসন এবং পাশের ভবন কাদের টাওয়ারের মাঝামাঝি করিডোর গলি থেকে উপর হয়ে পড়ে থাকাবস্থায় ইয়াছমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

অভিযোগ উঠেছে মাত্র ২৫ হাজার টাকায় দফারফা করে এ মৃত্যুর রহস্য উদঘটনা চাপা দেয়া হয়েছে। মামলা না করতে হুমকি-ধমকি দিয়ে সাদা কাগজে সাক্ষর নিয়ে ২৫ হাজার টাকা দিয়ে মরদেহসহ ইয়াছমিনের মা বাবাকে বুঝিয়ে দেয়া হয়। নিহত কিশোরী ইয়াছমিনের গ্রামের বাড়ী কক্সবাজার চকরিয়া থানার খুটাখালী গ্রামে। বাবার নাম নূর আহমদ।

অনুসন্ধানে জানাগেছে, নন্দনকানন এ কে ম্যানসনের ৮ম তলায় ব্যবসায়ী জাফর আহমেদের বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করত চাঁদমনি ওরফে ইয়াছমিন (১৫)। একই ভবনের নবম তলায় গোলাম সরোয়ার এর বাসায় কাজ করতো ইয়াছমিনের অপর দু বোন জোৎসনা মনি ও সুর্য্য মনি। গত পাঁচ বছর ধরে এ বাসায় চাঁদ মনি কাজ করে আসছিল। কিন্তু দরিদ্রতা আর মুখোশ্রী দুটোই কাল হলো ইয়াছমিনের জীবনে।

.

মরদেহের সুরতহালকারী কোতোয়ালী থানার উপ পুলিশ পরিদর্শক রুহুল আমিন বলেন, মরদেহের দুই পা এবং একহাত, পাজরের হাড় ভাঙ্গা ছিল। মাথার এক পাশ ফেটে মগজ বের হয়ে যায়। চোখের উপরেও আঘাতের চিহ্ন। তিনি বলেন, কিভাবে তার মৃত্যু হয়েছে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পেলে তা বলা যাবে।  তবে এটি হত্যা না আত্মহত্যা এ নিয়ে স্পষ্ট কোন মন্তব্য করেননি তিনি।

এদিকে ইয়াছমিন আত্মহত্যা করেছে বলে জোর দাবী করছেন জাফর আহমেদের পরিবারের লোকজন। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে উক্ত ভবনের একটি সুত্র জানান, মেয়েটিকে বেদম মারধর করা হয়। এক পর্যায়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লে কৌশলে তাকে ভবনের উপর থেকে ফেলে দিয়ে আত্মহত্যা বলে প্রচার করা হয়।

রবিবার বিকালে খবর শুনে ঘটনাস্থলে গেলে জাফর আহমদের শ্যালিকা সাবিনা মুক্তা বলেন, তাদের বাসার ড্রাইভারের সাথে কথা বলতে নিষেধ করা এবং বকাঝকা করার কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে ইয়াছমিন আত্মহত্যা করেছে।

সাবিনা মুক্তা বলেন, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাঁর ছেলেকে বাসার সামনে দিয়ে ইয়াছমিন চলে যায়। এরপর তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। অনেক খোঁজাখুঁজি করার পর বিষয়টি ইয়াছমিন মা বাবা এবং পুলিশকে জানানো হয়। অবশেষে রাতে ভবনের নীচে ইয়াছমিন নিথর দেহ পরে থাকতে দেখে পুলিশকে খবর দেন তাঁরা। এর পর পুলিশ এসে মরদেহ উদ্ধার করে নিয়ে যায়।

সাবিনা বলেন, তাদের ড্রাইভার সাহেদের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে ইয়াছমিন। বৃহস্পতিবার বিকালে ভবনের ছাদের উপরে দুজনে কথা বলতে দেখে জাফর আহমেদ তাদেরকে বকাবকি করেন। এরপর ইয়াছমিনের বোন বিষয়টি নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলে দুই বোনকে বলে তোদেরকে মজা দেখাবো। তিনি বলেন, বকাঝকা করার কারণে সে আত্মহত্যা করেছে।

এদিকে জাফর আহমদের বাসায় তার স্ত্রী হিরার সাথে এ প্রতিবেদক কথা বলতে চাইলে হিরার বোন সাবিনা বার বার হিরাকে বাধা দিয়ে নিজেই কথা বলতে থাকেন। এসময় হিরাকে কথা বলতে দেননি সাবিনা। এছাড়া বাসার গৃহকর্তা জাফর আহমদকেও পাওয়া যায়নি। সাবিনার কাছে জাফর আহমদের মোবাইল নম্বর চাইলে তিনি এ প্রতিবেদককে কৌশলে সাবিনার স্বামী গোলাম সরোয়ারের নাম্বার দেন।

এ প্রতিবেদক উক্ত নাম্বারে ফোন করে ইয়াছমিনের মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চাইলে গোলাম সরোয়ার অনেকটা ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন কেন এত যন্ত্রনা দিচ্ছেন ? থানা বা কোর্টে জান সেখানে গিয়ে বিস্তারিত জানুন।

ঘটনার বিষয়ে খোঁজ খবর নিতে একে ম্যানসনের ৮ম তলায় জাফর আহমদের ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখা যায় তাদের বাসায় তালাবদ্ধ। এর পর উপরে ৯ম তলায় গিয়ে গোলাম সরোয়ারের বাসায় পাওয়া যায় জাফর আহমদের স্ত্রী হিরাকে। কিন্তু পুরো পরিবারের লোকজনকে সিন্ডিকেট হয়ে কথা বলতে লক্ষ্য করা গেছে।

এদিকে জাফর আহমদের ড্রাইভার সাহেদকে আটক করলেও পরে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বর্তমানে সাহেদ জাফর আহমদের বাসায় গাড়ী চালাচ্ছেন। ড্রাইভার সাহেদ এর সাথে প্রেমের সম্পর্কের অভিযোগ আনলেও তার ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ।

এ বিষয়ে ইয়াছমিনের মা শাফিয়া বেগম বলেন, জাফর আহমদের শ্যালিকা মুক্তা বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ফোন করে বলেন যে আমার ইয়াছমিনকে পাওয়া যাচ্ছেনা। পরে রাতে ফোন করে বলেন, ইয়াছমিন আত্মহত্যা করেছে। তিনি বলেন আমার মেয়ে আত্মহত্যা করতে পারেনা। তার মৃত্যু নিয়ে রহস্য রয়েছে। শাফিয়া বেগম বলেন, তাকে মেরে লাশ উপর থেকে ফেলে দিয়ে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করছে। বৃহস্পতিবার তারা ইয়াছমিনকে মারধর করেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

থানায় মামলা করেননি কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা গরীব বলে পুলিশ মামলা নেয়নি। বলেছে মেয়ে মরে গেছে মামলা করে কি হবে ওরা বড় লোক,ওদের সাথে লড়াই করে কি হবে। টাকা গুলো নিয়ে চলে যান, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট আসলে মামলা হবে। তিনি বলেন,২৫ হাজার টাকা দিয়ে সাদা কাগজে সই নিয়ে মেয়ের লাশ বুঝিয়ে দিয়ে আমাদেরকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

ইয়াছমিনের ছোট বোন জোৎসনা মনি জানায়,তার বোন আত্মহত্যা করেনি। নিশ্চয় কোন ঘটনা ঘটেছে যা আড়াল করা হচ্ছে। জোৎসনা জানায়, তাদেরকে জাফর সাহেব’র স্ত্রী হিরা ইয়াছমিনের সাথে কথা বলতে দিতেন না। এ ছাড়া ইয়াছমিনকে প্রায়ই সময় মারধর করা হতো।

ইয়াছমিনের ভাই রিদওয়ান বলেন, তার বোন আত্মহত্যা করেনি। তাকে হত্যা করা হয়েছে দাবী করে রিদওয়ান বলেন তার মৃত্যুর সঠিক কারণ উদঘাটন করা দরকার।

এ ব্যাপারে কোতোয়ালী থানার ওসি মো. মহসিন বলেন, ইয়াছমিন নামে এক গৃহকর্মীর মরদেহ উদ্ধার করার পর এ বিষয়ে একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মামলা না বিষয়টি অস্বিকার করে ওসি বলেন, মামলা হয়েছে। সেটা অপমৃত্যু মামলা। ময়নাতদন্তের রিপোর্টেও উপর নির্ভর করে এটি হত্যা মামলা হবে।

এদিকে নিজের মেয়েকে হারিয়ে শোকের মাতম চলছে ইয়াছমিনের পরিবারে। শোকে স্তব্ধ পুরো পরিবার। পরিবারের সবাই এ ঘটনার সুষ্ঠ তদন্ত দাবী করেন।