ধর্ষণের শাস্তি হোক মৃত্যুদন্ড

প্রকাশ:| সোমবার, ২৮ মার্চ , ২০১৬ সময় ১১:৪৩ অপরাহ্ণ

জীবন কৃষ্ণদেবনাথ>>নতুন বছরের শুরুতে সবচেয়ে আলোচিত অপরাধ ধর্ষণ। যদিও আলোচনার সূত্রপাত
প্রতিবেশী দেশ ভারতের ‘দামিনীর গণধর্ষণ ও তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে,
বাংলাদেশে পর পর কয়েকটি ঘটনা এসেছে আলোচনার শীর্ষে মধুপুরের এক কিশোরীকে
তিন দিন আটকে রেখে গণধর্ষণ, সাভারের এক কিশোরীকে ধষর্ণের পর ভিডিও
প্রকাশের হুমকি, রাঙ্গামাটির আদিবাসী কিশোরী, ফরিদপুর ও কক্সবাজারের
স্কুলছাত্রীর এবং ঢাকায় ৯ বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার খবর ভীতির
সঞ্চার করেছে জনমনে। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ অনলাইন ক্রাইম জার্নালিষ্ট
ফোরামের সভাপতি জীবন কৃষ্ণদেবনাথ বলেন, যদিও ঘটনাগুলোর অধিকাংশই গত বছরের
বিভিন্ন সময়ের, তবুও গত কয়েকদিনের ধর্ষনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী পদক্ষেপ
হিসেবে এবং ধর্ষকের শাস্তি দাবি করে মানববন্ধন, প্রতিবাদ সভা ইত্যাদি
হয়েছে যা গণমাধ্যমে প্রচার হয়েছে গুরুত্বে সঙ্গে। বর্তমান পরিস্থির
কাছাকাছি অবস্থার সৃষ্টি হয় ১৯৯৮ সালের বহুল আলোচিত সীমা ধর্ষণ এবং
ইয়াসমিন ধর্ষণ হত্যাকে কেন্দ্র করে। ওই এক বছরে ৮৪২টি ধর্ষণ এবং ৮৮টি
ধষর্ণের পর হত্যার পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। (সূত্র : নারী আন্দোলনের পাঁচ
দশক, মালেকা বেগম)। বিশেষভাবে আলোচনায় আসছে। অথচ ধষর্ণের ঘটনার এগুলোই
নতুন নয় বরং প্রতিনিয়ত এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের
পরিসংখ্যান অনুযায়ী শুধু ২০১২ সালে কমপক্ষে ১ হাজার ৮টি ধষর্ণের ঘটনা
ঘটে যার মধ্যে ৯৮ জনকে ধষর্ণের পর খুন করা হয়। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের
বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১১ সালে ৮০০ এর বেশি ধর্ষণ, ১৬৫টি গণধর্ষণ
এবং ১৬টি ধষর্ণের পর খুনের ঘটনা ঘটে। যেহেতু এসব পরিসংখ্যান পত্রিকা এবং
পুলিশ রিপোর্টভিত্তিক এবং বড়সংখ্যক ধষর্ণের শিকার বা তাদের পরিবার মামলা
করে না বা ঘটনাটি গোপন রাখে, তাই ধারণা করা যায় বাস্তবচিত্র আরও ভয়াবহ।
অনেক ধর্ষিত নারী লজ্জা বা ভয়ে কাউকে ঘটনা জানতেই দেয় না। কেউ কেউ
পরিবারকে জানালেও মামলা করার সাহস পায় না এবং যারা শেষ পর্যন্ত মামলা
করে তাদের অনেককেই নানা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি বা হুমকির সম্মুখীন হয়ে
মামলা তুলে নিতে হয় এবং মামলা চলাকালে মৌখিক ধষর্ণের শিকার হয়ে শেষ
পর্যন্ত সঠিক বিচার পায় অল্পসংখ্যক নারী। বাংলাদেশে ধষর্ণের কারণ
বিশে¬ষণ করলে দেখা যায়, মূল্যবোধের অবক্ষয় নারীর প্রতি বিরূপ মনোভাব,
পুরুষশাসিত সমাজে নারীকে ছোট করে দেখা, পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ে
নারী অধিকারের অপপ্রয়োগ, কুশিক্ষা, কুসংস্কার ইত্যাদি। অপরাধ বিজ্ঞানের
দৃষ্টিতে ধর্ষণ মূলত ৩ ধরনের হয়ে থাকে। ১. অহমবৎ জধঢ়ব- যা মূলত মানসিক
সমস্যা যেমন হতাশার ফলশ্র“তিতে হয়ে থাকে। গবেষণায় দেখা যায়, চড়বিৎ
ৎধঢ়রংঃ বা শারিরিক ও মানসিক অসুস্থতার কারণে ধর্ষণে প্রভাবিত হয় ফলে
তারা সুযোগ পেলে প্রায়ই ধর্ষণ করে। এ ধরনের ধর্ষকের জন্য উন্নত বিশ্বে
বিভিন্ন মানসিক ও শারিরিক চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। যা আমাদের দেশে
প্রচলিত নই। বাংলাদেশের ধর্মীয় ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে কৈশোর থেকেই ছেলে
ও মেয়ের মাঝের ত্র“টিপূর্ণ দেয়াল তৈরি করে দেয়া হয়। পরস্পরের প্রতি
বন্ধুভাবাপন্ন না হয়ে বিরূপ মনোভাব নিয়ে বড় হয় তারা। পারিবারিক ও
সামাজিকভাবে নারীকে ছোট করে দেখার মানসিকতা তৈরি হয়, দেখার মানসিকতা
তৈরি হয়, যা প্রভাবিত করে নারী নারীর অবমূল্যায়নকে । কিশোর-কিশোরীদের
“যৌনতা” সম্পর্কে স্বাভাবিক শিক্ষা দেয়া হয় না, পরিবার বা বিদ্যালয়ে
কারও সঙ্গেই খোলামেলা কথা বলার বা সঠিক তথ্য জানার সুযোগ পায় না তারা।
যেহেতু গোপন বিষয়ে কৈশোর এবং প্রাক-কৈশোরের প্রবল আগ্রহ থাকে এবং
আলোচনার সুযোগ না পেয়ে তারা সমবয়সীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে ভুল তথ্য। এ
ভুল ধারণা নিয়ে বড় হওয়া তরুণরা নারীকে দেখে মেয়ে মানুষ ও ভোগের পণ্য
হিসেবে। তাদের কাছে সামাজিক বা ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতার চেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ হয় সাময়িক আনন্দ। কিছু তরুণ দরিদ্র এবং বেকারত্বের কারণে
যুক্ত হয় অপরাধ চক্রের সঙ্গে। যারা নানা প্রলোভনে তাদের যুক্ত করে যৌন
অপরাধের সঙ্গে। সাভারের ধর্ষণের ঘটনার মতো অনেক দানেশ রয়েছে এ সমাজে।
যারা তরুণদের ব্যবহার করে টাকা উর্পাজনের মাধ্যম হিসেবে। সমাজে অবহেলিত
অপরাধের শিকার বা প্রলোভন পড়ে কিছু নারীও যুক্ত হয় এসব ঘৃণিত অপরাধের
সঙ্গে। যেমন যুক্ত হয় মধুপুরের বীথি। বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং
উপজাতিরা নানা সময়ে সহিংসতার শিকার হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত বছর
আগষ্টে পুলিশ কনস্টেবল দ্বারা ধষর্ণের শিকার হন এক উপজাতি নারী এবং চারজন
বাঙালি ধর্ষণের পর হত্যা করে এক উপজাতি কিশোরীকে একই বছর সেপ্টেম্বরে।
জানুয়ারি ২০০৭ জুলাই ২০১২ ইং পর্যন্ত কমপক্ষে ৩৮ উপজাতি নারী ধর্ষণের
শিকার হন। যার মধ্যে ৯ জন ধষর্ণের পর খুন হন। ধষর্ণের শিকার হন। যার
মধ্যে ৯ জন ধষর্ণের পর খুন হন। ধর্ষনের প্রচেষ্টার শিকার হন কমপক্ষে ২৮জন
নারী (সূত্র ঃ এআইপিপি এবং বিআইডবি¬উএন)। ৩৭৫ ধারায় বলা আছে, কোন নারীর
ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক বা ভীতি প্রদর্শনপূর্বক বা ভীতি
প্রদর্শনপূর্বক বা ভীতি প্রদর্শনপূর্বক যৌন সর্ম্পক করলে ১০ বছরের
কারাদন্ড। ভিকটিমের মৃত্যু হলে সর্বোচ্চ মৃত্যুদন্ড এবং একাধিক ব্যক্তি
ধর্ষণ করলে প্রত্যেকের সর্বোচ্চ মৃত্যুদন্ড এবং একাধিক ব্যক্তি ধর্ষণ
করলে প্রত্যেকের সর্বোচ্চ মৃত্যুদন্ড পর্যন্ত শাস্তি বিধান রয়েছে।
উলে¬খ্য, ধর্ষক কিশোর হলে মৃত্যুদন্ডের কোন বিধান নেই। ধর্ষণ প্রতিরোধে
শুধু মানববন্ধন বা প্রতিবাদ সভাই যথেষ্ট নয়, প্রচেষ্টা গড়ে তুলতে হবে
সমাজের প্রতিটি স্তরে। কিশোর-কিশোরীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পারিবারিক
পর্যায়ে “যৌনতা” সম্পর্কে সঠিক শিক্ষা দিতে হবে। গ্রাম পযার্য়ে
কিশোরীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গ্রাম সমন্বয় কমিটি গঠিত হতে পারে।
যেখানে কিশোরীদের সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা হবে।
কিশোরদের নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিও পরিবর্তন এবং নারী-পুরুষ
বন্ধুত্বপূর্ণ সর্ম্পকই পারে বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি বন্ধ করতে। ধষর্ণের পর
পুলিশ যেন তাৎক্ষণিক মামলা নেয় এবং ধর্ষিত নারীকে মেডিকেল পরীক্ষার জন্য
প্রেরণ করে তা নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকা মেডিকেল কলেজে আসা ধর্ষিতদের মধ্যে
১৯৯৬-২০০০ সালে ৪৪১ নারী মেডিকেল পরীক্ষা করতে অস্বীকৃতি জানায় পরীক্ষক
পুরুষ চিকিৎসক হওয়ায়। এ কারণে প্রতিটি মেডিকেল কলেজ এবং পর্যায়ক্রমে
জেলা সদর এ ধরনের পরীক্ষা উপযোগী যন্ত্রপাতি ও নারী চিকিৎসক নিয়োগ দেয়া
প্রয়োজন। কিশোর অপরাধীদের যেহেতু বিচার কিশোর আদালতে হয় এবং সংশোধনের
জন্য কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয় সেহেতু এ ধরনের কিশোরদের জন্য
সেখানে শারিরিক ও মানসিক চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখতে হবে। সমাজের সর্বস্তরের
মানুষের সচেতনতা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, গণমাধ্যমের সঠিক উপস্থাপন ও
বিশে¬ষণ, উপযুক্ত আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ নিশ্চিতকরণ, সর্বোপরি মূল্যবোধ ও
নৈতিকতার উন্নয়নই পারে ধর্ষণসহ নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ করতে
আমাদের সমাজে সমাজ সচেতন যুবসমাজকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাথে একযোগে
এগিয়ে আসতে হবে। এমনকি প্রয়োজনে ধষর্ণের শাস্তি বাংলাদেশী আইনে
মৃত্যুদন্ড কার্য্যকর করা জোর দাবী জানাচ্ছি।

Editor
jiban krishna deb nath
www.amadershongbad.com