ধরা ছোয়ার বাইরে স্বর্ণ পাচারের মূল হোতারা!

প্রকাশ:| সোমবার, ২৭ জুলাই , ২০১৫ সময় ১১:০৮ অপরাহ্ণ


নিউজচিটাগাং স্পেশাল::
চট্টগ্রাম শাহ্ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নিয়ে স্বর্ণ পাচার থেমে নেই। শাহজালালে দেড় কেজি স্বর্ণসহ যাত্রী আটকপ্রতি সপ্তাহে ধরা পড়ছে একাধিক স্বর্ণের চালান। তবে ধরা ছোয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে স্বর্ণ পাচারের কারবারীরা! স্বর্ণ পাচারের ঘটনায় থানায় মামলা হয়। অথচ সেই সব মামলায় বেরিয়ে আসছে না মূল হোতাদের নাম। অভিযুক্তদের কাউকেই শনাক্ত করা যায়নি বলে দেয়া হচ্ছে প্রতিবেদন। যথাসময়ে চার্জশিট দাখিল করা নিয়েও রয়েছে পুলিশের নানা কৌশল। আর এসব কারণে বারবার আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাচ্ছে দেশের স্বর্ণ পাচারের কারবারীরা।
জানা গেছে, বিমানবন্দরে স্বর্ণ পাচারের ঘটনায় বেশির ভাগ মামলা দায়ের হয়েছে বন্দর নগরীর পতেঙ্গা থানায়। এই থানাতেই গত ৩ বছরে ৭০টির বেশি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলাগুলোতে উঠে আসেনি কোন gold স্বর্ণপাচারকারী কিংবা স্বর্ণ বহনকারীর নাম। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের এক শ্রেণীর কর্মকর্তা অভিযুক্তদের চিহ্নিত করা যায়নি বলে মন্তব্য করে চার্জশিট থেকে বহনকারী কিংবা আমদানিকারকদের নাম বাদ দিয়ে দিচ্ছেন। পুলিশের এমন গাফিলতির কারণে চোরাকারবারিরা দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে বেশ কয়েকটি ঘটনায় স্বর্ণের বার উদ্ধারের পর বহনকারী লোকদের ছেড়ে দেয়ার একাধিক তথ্য পাওয়া গেছে। এদিকে চলতি বছর পতেঙ্গা থানা পুলিশ মাত্র ৭টির অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। কিন্তু এসব মামলার কোনটিতেই কারও নাম নেই বলে সূত্র জানিয়েছে।
কয়েকজন সোনা ব্যবসায়ী জানান, মধ্যপ্রাচ্যের স্বর্ণ নিখাদ হওয়ায় বাংলাদেশে এনে এসব স্বর্ণে প্রতি ভরিতে তিন থেকে চার আনা পর্যন্ত খাদ মেশানো হয়। এরপর দেশের জুয়েলারিগুলোতে বিক্রি করা হচ্ছে। ছোট একটি চালান থেকে কমপক্ষে ২০/২৫ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। এজন্য প্রচুর বিদেশী স্বর্ণ দেশে আসছে। আবার কেউ কেউ বলছেন, চোরাপথে আসা মাদকসহ বিভিন্ন পণ্যের মূল্য পরিশোধে এই স্বর্ণ ব্যবহৃত হচ্ছে।
শুল্ক কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রামের প্রায় ১২ লাখ লোক বাস করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। এসব লোকজনের শাহজালালে ১২ কেজি স্বর্ণ আটকমধ্যে রয়েছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। তাদের সঙ্গে গোপন নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে ভারতসহ আন্তর্জাতিক চক্রের। এছাড়া ভারতের চোরাই বাজারের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট বাংলাদেশের এসব সোনার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণকে চিহ্নিত করেছেন বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তিরা। গত বেশ কয়েক বছর ধরে দেশটির সরকার সোনা আমদানির ওপর শুল্ক ৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করেছে। দুবাই থেকে এক কেজি স্বর্ণ কিনে ভারতে পাচার করে বিক্রি করলে ৫ লাখ রুপির বেশি মুনাফা পাওয়া যায়। ফলে ভারতীয় কারবারিরা কৌশলে বাংলাদেশ থেকে সোনা সেই দেশে পাচার করছে সীমান্ত দিয়ে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের একটি সূত্র জানান, চালান ধরার জন্য অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি না থাকায় নিরাপদ রুট হিসেবে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরকে বেছে নিচ্ছে চোরাকারবারীরা। প্রয়োজনীয় আর্চওয়ে ও মেটাল ডিটেকটর না থাকা, স্ক্যানার মেশিন নষ্ট হওয়া, আন্তর্জাতিক রুটের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ যাত্রীদের একই ফ্লাইটে পরিবহনসহ নানাবিধ সুযোগের কারণে স্বর্ণের চোরাচালান বেড়েছে। চোরাকারবারিরা প্রতিদিনই কৌশলে দেশের বাইরে থেকে কোটি টাকার সোনা বয়ে নিয়ে আসছেন। যা সহজে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রভাবশালী মহলের চাপের কারণে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর দিয়ে স্বর্ণ পাচারের ঘটনায় আটক বেশ কয়েকজনকে ছেড়ে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরের ৭ই ফেব্রুয়ারি সকালে ওমান এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে তল্লাশি চালান গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। এই সময় পাওয়া যায় প্রচুর সোনা। কিন্তু স্বর্ণের বার বহনকারী রহিম উদ্দিন ও নুরুল হককে ছেড়ে দেন তারা। বিভিন্ন ঘটনা থেকে হাটহাজারী উপজেলার কাটিরহাট এলাকার বাসিন্দা মো. ইয়াকুব, রাউজান পূর্বগুজরা এলাকার মহিন উদ্দিন, রাউজান উত্তর গুজরা এলাকার নাহিদ তালুকদার, ফটিকছড়ি শাহনগর এলাকার ইমতিয়াজ খান, ফটিকছড়ি রায়পুর এলাকার পেয়ারুল ইসলাম, মুন্সীগঞ্জ জেলার হালদা এলাকার মনসুর ইসলাম নামের বেশ কয়েকজন ব্যক্তির কাছ থেকে প্রচুর স্বর্ণ উদ্ধারের পরও তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ।
স্বর্ণবারপতেঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলমগীর হোসেন বলেন, ‘বিমানবন্দরে স্বর্ণ সহ আটককৃতদেরকে আদালতে প্রেরণ করা হয় এবং নির্দিষ্ট সময়ে চার্জশীট প্রদান করা হচ্ছে। আটককৃতরা মূল হোতাদের নাম বলতে না পারায় অনেক সময় চার্জশীটে তাদের নাম আসছে না।’
চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে শুল্ক বিভাগের সহকারী পরিচালক সুশান্ত পাল বলেন, ‘আমরা চালান আটক করে থানায় মামলা করলেও অনেক সময় সংশ্লিষ্টদের গাফিলতির কারণে মূল হোতারা ধরা পড়ছে না। এরা আইনের ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো জোরদার করা হয়েছে। এজন্য স্বর্ণের চালান ধরা পড়ছে বেশী। শুল্ক বিভাগে আর্চওয়ে বসানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বর্তমানে স্ক্যানার মেশিনগুলো মাঝেমাঝে সমস্যা করছে। নতুন করে আরো স্ক্যানার মেশিন বাড়ানোর ব্যাপারে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এসব হলে আমরা আরো ভালোভাবে আমাদের কাজ চালাতে পারব।