দেশের ৬০ ভাগ চাহিদা বগুড়ায় তৈরি কৃষি যন্ত্রাংশে মিটছে

প্রকাশ:| সোমবার, ১২ আগস্ট , ২০১৩ সময় ০৫:৩৬ অপরাহ্ণ

শিল্পনগরী বগুড়া। এখানকার কৃষি, কুটির শিল্প, হস্তশিল্প, মত্স্য, পোলট্রি, প্রকাশনাসহ বিভিন্ন শিল্পের রয়েছে সাফল্যজনক অধ্যায়। গত কয়েক দশকে এই সাফল্যের কাতারে যুক্ত হয়েছে অপর bograএক শিল্পের নাম। আর সেটি হলো মেশিনারি। মেশিনারি শিল্পকে ঘিরে বৃহত্তর বগুড়া অঞ্চলে গড়ে উঠেছে শত কোটি টাকার এক বিশাল বাজার। বগুড়ার ফাউন্ড্রি ও ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপে উন্নতমানের কৃষি যন্ত্রাংশ উত্পাদনের এ সাফল্যে বগুড়াকে কৃষি যন্ত্রাংশ উত্পাদন জোন ঘোষণার দাবি উঠেছে। স্থানীয় শিল্প উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাই এ শিল্পের উন্নয়ন ঘটিয়েছে। গত কয়েক দশকে এখানে গড়ে উঠেছে কৃষি যন্ত্রাংশ উত্পাদনের প্রায় হাজার খানেক প্র্রতিষ্ঠান। বগুড়ার তৈরি কৃষি যন্ত্রাংশ সারাদেশের শতকরা ৬০ ভাগেরও বেশি চাহিদা মেটাচ্ছে। একসময় চীন, জাপান, কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের কৃষি যন্ত্রাংশ এদেশের বাজার দখল করে থাকলেও এখন তা দখলে নিয়েছে বগুড়ার তৈরি কৃষি যন্ত্রাংশ। বগুড়ার তৈরি কৃষি যন্ত্রাংশ একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় করছে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বগুড়ায় এ শিল্পের সাথে জড়িত আছে ১ লাখেরও বেশি মানুষ। বগুড়ায় তৈরি হচ্ছে শ্যালো মেশিনের লায়নার, পিষ্টন, রিং, স্লিপ, নজেল, পাম্প, টিউবওয়েল, থ্রেচার মেশিন, চেসিসসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ। পাওয়ার টিলারের চাকা, ফলা, ট্রলিও তৈরি হচ্ছে এখানে। এছাড়া ধান ভাঙ্গা মেশিন, আখ মাড়াই, ধান মাড়াই মেশিন তৈরি হচ্ছে বগুড়াতেই। ঢালাই কারখানাগুলোতে পুরোনো লোহা ভাঙ্গা ফার্নেসের মধ্যে ঢেলে দেয়ার পর ২শ’ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় গলানোর পর তৈরি করা হয় বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা (বিসিক) বগুড়ার কর্মকর্তারা জানান, বগুড়ায় কৃষি যন্ত্রাংশ তৈরির ৯৭৮টি কারখানা রয়েছে। এসব কারখানার মধ্যে অন্তত ৪০টি ঢালাই কারখানা। শ্যালো মেশিনের পাম্প তৈরির কারখানা রয়েছে কমপক্ষে ৩০টি। পাওয়ার টিলারের চাকা ও ধান মাড়াই মেশিন তৈরি হচ্ছে ২০টিরও বেশি কারখানায়। অন্যান্য কারখানায় মেশিনের অপর যন্ত্রাংশ তৈরি হচ্ছে। জমি নিড়ানি, বীজ বপনের জন্য অত্যাধুনিক যন্ত্র ড্রাম সিডারও তৈরি হচ্ছে বগুড়ায়। বগুড়ায় কৃষি যন্ত্রাংশ তৈরির কারিগররা অত্যন্ত দক্ষ। তারা নিজেরাই মূল মেশিনের হুবহু যন্ত্রাংশ তৈরি, যন্ত্রাংশের ফর্মা তৈরি করছে।

বগুড়ার কৃষি যন্ত্রাংশ উত্পাদকরা জানান, ষাটের দশকে বগুড়ায় জাহেদ মেটালের স্থাপিত ফাউন্ড্রি শিল্প থেকেই শুরু হয় এই শিল্পের পথচলা। এরপর থেকে এই শিল্পের বিকাশ ঘটতে থাকে। গড়ে উঠতে থাকে একের পর এক কারাখানা। কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরি শুরু হয়েছে আশির দশকে। তখন বাংলাদেশ এগ্রিকালচার ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন (বিএডিসি) থেকে কৃষকদের সেচযন্ত্র সরবরাহ করা হতো। তারা সরবরাহ বন্ধ করে দেবার পর কৃষি যন্ত্রাংশের ভয়াবহ সংকট দেখা দেয়। কয়েক বছরের মধ্যে মেশিনগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। সরকার এসব মেশিন সচল রাখতে কৃষি যন্ত্রাংশ আমদানি করতে হিমশিম খাচ্ছিল। তখন মেশিন মেরামতের প্রয়োজন হলে বগুড়ার কারিগররা(টেকনিশিয়ান) তা পরীক্ষামূলকভাবে তৈরি করে মেশিনে সংযোজন করেন। স্থানীয়ভাবে তৈরি যন্ত্রাংশ সফলভাবে মেশিনে চালুর পর কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের মেশিনারি যন্ত্রাংশ তৈরির কাজ প্রাথমিকভাবে শুরু করা হয়। এতে সাফল্য অর্জিত হলে যন্ত্রাংশ তৈরির প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। বর্তমানে বগুড়ায় গুঞ্জন মেটাল, মিল্টন ইঞ্জিনিয়ারিং, দীলিপ মেশিনারীজ, আলিফ মেশিনারীজ, সুমন মেশিনারী, রনি ইঞ্জিনিয়ারিং, কুশিয়া ইঞ্জিনিয়ারিং, বিনিময় ইঞ্জিনিয়ারিং, বাবলু ইঞ্জিনিয়ারিং, আজাদ ইঞ্জিনিয়ারিং, দোয়েল ইঞ্জিনিয়ারিং, বগুড়া মেটাল ইন্ডাষ্ট্রিজ, রহিম ইঞ্জিনিয়ারিংসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বৃহত্ আকারের কৃষি যন্ত্রাংশ উত্পাদন করছে। বগুড়া শহরের গোহাইল রোড, রেলওয়ে মার্কেট, বিআরটিসি মার্কেট, জেলা পরিষদ মার্কেটসহ আরও কয়েকটি এলাকায় শুধুমাত্র কৃষি যন্ত্রাংশ তৈরি ও বিক্রির বিশাল মার্কেট গড়ে উঠেছে। এখানে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষি যন্ত্রাংশ কিনতে আসছেন শত শত ব্যবসায়ী। টেকসই, মজবুত ও দাম কম হওয়ার কারণে আমদানিকৃত কৃষি যন্ত্রাংশের চেয়ে বগুড়ার তৈরি এসব যন্ত্রাংশ কিনতে আগ্রহী হচ্ছেন কৃষকরা। তারা এসব যন্ত্রপাতি কিনে আর্থিকভাবে লাভবানও হচ্ছেন। বগুড়ায় কৃষি যন্ত্রাংশ তৈরির ছোট প্রতিষ্ঠান রয়েছে দু’শ’রও বেশি। প্রতিটি কারখানায় কাজ করছে ১০ থেকে অর্ধশত শ্রমিক। উদ্যোক্তারা জানান, বগুড়ার ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প গড়ে উঠেছে সম্পূর্ণ ব্যক্তি উদ্যোগে। উদ্যোক্তারা নিজস্ব তহবিল দিয়ে গড়ে তুলেছেন এসব প্রতিষ্ঠান। এসব শিল্পে ব্যাংক ঋণ বা সরকারি সহযোগিতার পরিমাণ খুবই কম। শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণেরও যথেষ্ট অভাব রয়েছে। আবার যন্ত্রপাতি তৈরিতে আধুনিক মেশিনারির অভাবও রয়েছে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে। অব্যবস্থাপনার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে। বগুড়া এগ্রিকালচার মার্চেন্ট এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রাজেকুর রহমান রাজু বলেন, কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরির জন্য বিসিকের উদ্যোগে পৃথক কৃষি শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠা করা দরকার।

বাংলাদেশ ফাউন্ড্রি ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি আইনুল হক সোহেল জানান, ফাউন্ড্রি শিল্পের কাঁচামাল কয়লা, ফার্নেস অয়েল, পিক আয়রন, হার্ডকোক, ভাঙ্গা লোহার সংকট ও ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুত্ সংকটে সম্ভাবনাময় এ শিল্প বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ ব্যাপারে সরকারের নজর দেয়া দরকার। পাশাপাশি তিনি বগুড়াকে কৃষি যন্ত্রাংশ জোন হিসেবে গড়ে তোলার দাবি জানান। বগুড়া চেম্বারের সভাপতি আলহাজ্ব মমতাজউদ্দিন বলেন, বগুড়ার ফাউন্ড্রি শিল্প বাংলাদেশে ব্যাপক সম্ভাবনার সৃষ্টি করলেও এখনও অধিকাংশ ঢালাই কারখানায় আধুনিক প্রযুক্তি না থাকায় এ শিল্প বিশ্বমানের হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে সম্ভাবনাময় এ শিল্প থেকে তেমন একটা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে না।