দেশের স্বার্থে নতুন মেরূকরণ হতে পারে

mirza imtiaz প্রকাশ:| রবিবার, ২১ অক্টোবর , ২০১৮ সময় ০১:৩১ পূর্বাহ্ণ

রাজধানীতে আয়োজিত মহাসমাবেশ থেকে ১৮ দফা লক্ষ্য তুলে ধরে জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, জাতীয় পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনে লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে দেশের স্বার্থে নতুন মেরূকরণ হতে পারে। সামনের নির্বাচন জীবনের শেষ নির্বাচন এমনটি উল্লেখ করে এরশাদ বলেন, নির্বাচন হবে কিনা মানুষের মধ্যে সংশয় আছে। জাতীয় পার্টি সুষ্ঠু নির্বাচন চায়, সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা চায়। সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনেরও দাবি জানান তিনি।

গতকাল সকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় পার্টির নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত জোটের মহাসমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে এরশাদ জোটের পক্ষে ১৮ দফা লক্ষ্য তুলে ধরে বলেন, এই ১৮ দফাই আমাদের নির্বাচনী ইশতেহার। এটা হলো মুক্তির পথ, দেশের মুক্তির পথ, জাতির মুক্তির পথ। সমাবেশে জাপা’র সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ, কো- চেয়ারম্যান জি এম কাদের, মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারসহ জাতীয় পার্টি ও জোটের নেতারা বক্তব্য রাখেন।

সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু হওয়া সমাবেশ বেলা পৌনে একটায় এরশাদের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। সমাবেশে সারা দেশ থেকে নেতাকর্মীরা অংশ নেন। তাদের হাতে শোভা পায় বিভিন্ন ধরনের ব্যানার ও ফেস্টুন। দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের পক্ষে তারা মিছিল নিয়ে সমাবেশে যোগ দেন।

সভাপতির বক্তব্যে এরশাদ বলেন, জাতীয় পার্টি সবসময় নির্বাচন করেছে। আজও প্রস্তুত। যারা সংসদে আছে সবার সমন্বয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করতে হবে। নির্বাচনের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
তিনি বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচন আমার জীবনের শেষ নির্বাচন। আমার এই শেষ জীবন দেশ ও জাতির জন্য উৎসর্গ করলাম। আমি এদেশের সব থেকে বয়োজ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ। ’৯০ সালে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার পরে যেসব নির্যাতন সহ্য করেছি এদেশের আর কোনো রাজনীতিবিদ তার শিকার হয়নি। সব সময় শঙ্কায় ছিলাম কখন জেলে যাবো। ঠিকভাবে ঘুমাতেও পারি নাই।

আগামী নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে এরশাদ বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে কিনা তা নিয়ে মানুষ সংশয়ে আছে। একদল সাত দফা দাবি দিয়েছে, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী সাত দফা দাবি মেনে নেয়া সম্ভব না। সবকিছু মিলিয়ে আগামী দিনগুলো স্বচ্ছ মনে হচ্ছে না। আমি চাই, সুষ্ঠু নির্বাচন এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা। জাতীয় পার্টি সবসময় নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত আছে।

জাপা চেয়ারম্যান বলেন, আমি নতুনভাবে ১৮ দফা কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। আমরা মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে চাই। আমরা নির্বাচনের পদ্ধতি পরিবর্তন, প্রদেশিক পরিষদ গঠন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, শিক্ষা পদ্ধতি সংস্কার, স্বাস্থ্যসেবার সমপ্রসারণ, কৃষি জমি নষ্ট না করে জ্বালানি  ও  বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন, গুচ্ছগ্রাম, পথকলি ট্রাস্ট, পূর্ণাঙ্গ উপজেলা প্রতিষ্ঠা, সংখ্যালঘুদের জন্য আসন সংরক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, পল্লী রেশনিং চালু, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত, শিল্প ও অর্থনীতির অগ্রগতি সাধন, শান্তির রাজনীতি ও নিরাপদ সড়কের নিরাপত্তা করতে চাই। কিছুদিন আগে বাচ্চারা স্লোগান দিয়েছে সরকারের মেরামত চাই, আমিও সরকারের মেরামত চাই।  নির্বাচন পদ্ধতি ও নির্বাচন কমিশনের সংস্কার ও পুনর্গঠন এবং সন্ত্রাস দমনে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে ঘোষিত ১৮ দফায়। এরশাদ বলেন, আমরা ক্ষমতায় এসে প্রাদেশিক সরকার করতে চাই। আমরা প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ করতে চাই। আমরা পূর্ণাঙ্গ উপজেলা পরিষদ গঠন করতে চাই। তিনি বলেন, জাতীয় পার্টি ও সম্মিলিত জাতীয় জোট ক্ষমতায় গেলে ‘ধর্মীয় মূল্যবোধকে’ প্রাধান্য দেয়া হবে। তবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের স্বার্থ সংরক্ষণে তাদের জন্য আসন সংরক্ষণ করা হবে। ক্ষমতায় গেলে বিচার বিভাগের ‘স্বাধীনতা’ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ‘কঠোর ব্যবস্থা’ নেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন এরশাদ।

তিনি বলেন, আমরা শিল্পায়ন করব। তবে জ্বালানি ও বিদ্যুতের জন্য ফসলি জমি নষ্ট করা যাবে না। এমনিতেই ফসলি জমি কম। নষ্ট করলে আমরা অনাহারে থাকবো। আমরা খাদ্যে নিরাপত্তা আনবো। তিনি বলেন, বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতি জাতিকে ‘অন্ধকারের দিকে’ নিয়ে যাচ্ছে। এর সংস্কার করতে হবে। পরিবর্তন করতে হবে।

জাপা প্রধান বলেন, আগামীতে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় আসবে। দেশবাসীর কাছে আমার আবেদন আপনারা জাতীয় পার্টিকে ক্ষমতায় আনেন। পোস্টার এবং ব্যানার দেখে কাউকে মনোনয়ন দেয়া হবে না। যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়া হবে। শিগগিরই পার্লামেন্ট বোর্ড গঠন করা হবে। যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়া হবে। জাপা শিগগিরই নির্বাচনী যাত্রা শুরু করবে বলেও তিনি জানান।

সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ বলেন, বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন করেছেন কিন্তু জনগণের কছে স্বাধীনতার ফসল পৌঁছে দিয়েছে জাপা। জাপা’র সৃষ্টিই হয়েছে দেশ ও জাতির জন্য। আমরা তাদের জন্যই কাজ করে যাচ্ছি। আজ আবারো তারা জেগে উঠেছে। আমরা অনেক বছর ক্ষমতায় যেতে পারিনি। তবে এই সমাবেশ দেখে মনে হচ্ছে আমরা আবার ক্ষমতায় যাবো। আমাদেরকে ক্ষমতায় যেয়ে প্রমাণ করতে হবে। জনগণের উৎসাহ ও আগ্রহ দেখে মনে হচ্ছে আমরা আবার ক্ষমতায় যাই। আগামীতে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য যা যা করা দরকার তাই করতে হবে।

রওশন এরশাদ বলেন, দেশের যে অবস্থা হয়েছে কোনো শান্তি নেই। জনগণের কর্মসংস্থান নেই, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নেই। কিন্তু জাতীয় পার্টির শাসনামলে দেশে শান্তি ছিল, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা ছিল। মাদকে ছেয়ে গেছে যেটা আমাদের সময় ছিল না। বক্তব্যের এক পর্যায়ে জাপা কো-চেয়ারম্যান ২টি গান গেয়ে শোনান। আসল মানুষ না চিনে আমি করেছি মস্ত বড় ভুল, নাঙ্গলে ভোট না দিয়ে করেছি মস্ত বড় ভুল- রংপুরের এই গানটি তিনি গাইতে থাকেন। তার সঙ্গে উপস্থিত নেতাকর্মীরা ঠোঁট মেলান। এরপর তিনি ‘নতুন বাংলাদেশ গড়বো’ শিরোনামে আরেকটি গান করেন।

জাপা’র মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, আজকে নির্বাচন নিয়ে আবার অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। আপনারা সকল দলকে দেখছেন। দেশের যে দুর্বিষহ ঘটনা ঘটেছে তা আমরা দেখেছি। আমরা এখন দুর্নীতি ও ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ দেখতে চাই। জাতীয় পার্টি অনেক প্রতিকূল অবস্থা পার করে এ পর্যন্ত এসেছে। আমাদের চেয়ারম্যানকে বারবার হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। আমরা এখন একটা নিরাপদ দেশ গড়বো। এর আগে যেটা এরশাদের আমলে মানুষ দেখেছে। তিনি জাপা’র নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত জোটের আকার বাড়ার ঘোষণা দেন।

সমাবেশে প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম, এসএম ফয়সল চিশতী, ফখরুল ইমাম, নুরুল ইসলাম ওমর, রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তাফা, রুস্তম আলী ফরাজী, খেলাফত মজলিসের জোবায়ের আহমদ আনসারী, ইসলামিক ফ্রন্টের এমএ মান্নান, আবু সুফিয়ান, বিএনএ’র সেকান্দর আলী প্রমুখ।

জাপা’র প্রেসিডিয়াম সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, এমএ সাত্তার, জিয়াউদ্দিন বাবলু, কাজী ফিরোজ রশিদ, মো. আবুল কাশেম, অধ্যাপক দোলোয়ার হোসেন খান, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, গোলাম কিবরিয়া টিপু, খেলাফত মজলিসের মাওলানা মাহফুজুল হকসহ জাপা ও জোটের শীর্ষ নেতারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
চেয়ার ছোড়াছুড়ি করলেন নেতাকর্মীরা

সকাল সাড়ে নয়টার দিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ মঞ্চের সামনে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের মধ্যে কয়েক দফায় চেয়ার ছোড়াছুড়ির ঘটনা ঘটে। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে লক্ষ্য করে চেয়ার ছুড়ে মারেন। এতে কয়েকজন নেতাকর্মী আঘাতও পান। এসময় শতাধিক চেয়ার ভাঙচুর করা হয়। তখন মঞ্চ থেকে অনুরোধ করে শান্ত করা হয় কর্মীদের।  রংপুর থেকে সমাবেশে আসা জসিম উদ্দিন বলেন, আমাদের পার্টি। আর আমাদের বলে যে, কোথায় থেকে আসছি। এ জন্য ওদের চেয়ার ছুড়ে মেরেছি। এরপর এইচ এম এরশাদ বক্তব্য দেয়ার সময় বিভিন্ন এলাকা থেকে নেতাকর্মীরা ব্যানার উপরে তুলে ধরেন। তখন এরশাদ বলেন, ‘ব্যানার ও পোস্টার নামাতে হবে। তোমরা এগুলো নামাও।’

পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরুর পর জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তব্য রাখতে শুরু করেন। সকাল সাড়ে ৮টা থেকেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাপা নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত জাতীয় জোটের শরিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা আসতে শুরু করেন। মহাসমাবেশের কারণে শাহবাগ মোড় থেকে হাইকোর্ট মোড় পর্যন্ত দুই পাশের রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ থাকে। এর ফলে সাময়িকভাবে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। সমাবেশ ঘিরে আশেপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কড়া নিরাপত্তা জোরদার করে।


আরোও সংবাদ