দৃষ্টি নন্দন কুষ্টিয়াতে

প্রকাশ:| শুক্রবার, ২৪ জুলাই , ২০১৫ সময় ০৯:৫০ অপরাহ্ণ

বাংলার সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত লালনের শহর কুষ্টিয়াতে নিশ্চয়ই গিয়েছেন? উপভোগ করেছেন বাউল সম্রাট লালনের আখড়া, রবি ঠাকুরের কুঠিবাড়ি, গড়াই নদীর তীর, ঘুরে বেড়িয়েছেন পদ্মার চর, লালন শাহ সেতু অথবা ঐতিহাসিক হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। মন ভরে খেয়েছেন কুষ্টিয়ার বিখ্যাত তিলের খাজা। আর মনে মনে আরো দু’একটি দর্শনীয় স্থান খুঁজে বেড়িয়েছেন, কিন্তু সময় স্বল্পতা অথবা অন্য যে কোনো কারণে তা দেখার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। যদি তাই হয়ে থাকে তবে আপনি নিশ্চিতভাবেই দেখতে পারেননি কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অবস্থিত প্রাণ জুড়ানো ‘মফিজ লেক’। শহর ছাড়িয়ে কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়ক ধরে মাত্র ২৪ কিলোমিটার দক্ষিণে গেলেই আপনাকে স্বাগত জানাবে স্বাধীন বাংলার প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়- শান্তিডাঙ্গা দুলালপুরের কুষ্টিয়াতেইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের দৃষ্টি নন্দন ফটক দিয়ে প্রবেশ করে ‘ডায়না চত্বরে’র সবুজ ঘাসের গালিচাকে পায়ে মাড়িয়ে কলা অনুষদের সামনে দিয়ে কেন্দ্রীয় মসজিদ পার হয়ে একটু পশ্চিমে তাকালেই আপনার দুই নয়ন জুড়িয়ে দেবে সবুজে ঘেরা, স্বচ্ছ জলে ভরা, শান্ত সুন্দর মফিজ লেক। আপনার মনে এবার প্রশ্ন জাগতেই পারে- লেকটির নাম ‘মফিজ লেক’ হলো কেন? কেউ হয়তো ভাবতে পারেন চট্টগ্রামের ‘ফয়’স লেকে’র আদলে হয়তবা এর নাম ‘মফিজ লেক’ রাখা হয়েছে। আসল ব্যাপারটি একেবারেই ভিন্ন। প্রথম দিকে কাগজপত্রে লেকটি ‘ইবি লেক’নামেই পরিচিত ছিল। এক প্রেমিক যুগলের পাগলামি বদলে দিয়েছে এর নাম। রসিকজনদের বলতে শোনা যায়- ‘মফিজ’ নামক কোনো এক পাগল প্রেমিক তার প্রিয়তমার প্রতি ভালোবাসার তীব্রতা প্রমাণ করতে গিয়ে নাকি সাঁতার না জেনেও কনকনে শীতের মধ্যেই ঝাঁপিয়ে পড়ে কাঁপিয়ে দিয়েছিল মফিজ লেকের শীতল পানি। ওই ঘটনার পর ‘মফিজ’তার পাষাণী প্রিয়তমার মন পেয়েছিল কি না- তা আমরা জানতে পারিনি; তবে সে নিজের অজান্তেই জয় করে নিয়েছিল সব প্রেমিকের হৃদয়। আর তখন থেকেই লেকটি ‘মফিজের লেক’নামে পরিচিতি পেতে শুরু করে আর কালক্রমে হয়ে যায় ‘মফিজ লেক’। সুবিশাল লেকের পার ধরে হাঁটার সময় দুই পাশের নাম না জানা গাছ-গাছালি দেখে এটাকে সুন্দর বন ভেবে ভুল করতে পারেন। আবার কখনো উঁচু-নিচু টিলা দেখে মনে হতে পারে আপনি বুঝি চলে এসেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম। আপনি স্বচ্ছ পানির দিকে তাকিয়ে হাঁটতে থাকবেন আর দেখবেন ঝাঁকে ঝাঁকে ছোটমাছ, তার পাশেই হঠাৎ ভেসে উঠা একটি শোল মাছ। পাশের বন্ধুটিকে দেখানোর জন্য কয়েক মুহূর্তের জন্য দৃষ্টি ফিরিয়ে মাছটিকে আর কোথাও খুঁজে পাবেন না। মন খারাপ করবেন না; সামনে এগিয়ে যেতে থাকলে আরো চমৎকার সব মাছের দেখা মেলবে। আশপাশে অনেককেই দেখবেন লেকের পানিতে জাল ফেলে কই, শিং, পুঁটি, বাইমসহ নানা প্রজাতির মাছ ধরছে। আবার কেউ কেউ বড়শী হাতে একনিষ্ঠ চিত্তে মাছ ধরায় ব্যস্ত। তার আশপাশ দিয়ে কে গেল বা এলো তা দেখার মতো সময় তার নেই। চাইলে আপনি তাদের হাত থেকে বড়শী নিয়ে ক্ষণিকের জন্য হয়ে যেতে পারেন তাদের মাছ ধরার সঙ্গী। আপনি অজস্র বুনো ফুল মাড়িয়ে এগিয়ে যেতে থাকবেন। না চাইলেও আপনার কানে কানে ভেসে আসবে দোয়েলের শিশ, শালিকের ডাক, ডাহুকের গানসহ অনেক চেনা-অচেনা পাখির কণ্ঠের সুরেলা আওয়াজ। আপনি একবার তাকাতেই ফুড়ুৎ করে উড়ে গিয়ে লুকাবে পাতার ফাঁকে। এবার একটু আকাশের দিকে তাকাবেন- আপনার চোখে ধরা পড়বে অতিথি পাখির ঝাঁক। শুধুই কী তাই! আপনার মাথার ওপর দিয়ে, হাতের কাছ দিয়ে লাফিয়ে বেড়াবে রং-বেরঙের ঘাস ফড়িং, বর্ণিল প্রজাপতি। আপনি নিশ্চয় ছবি তুলতে চাইবেন, কিন্তু পারবেন না। ক্যামেরায় ক্লিক করার আগেই দেখবেন উড়ে গেছে। তাতে কী, মনের ফ্রেমে, চোখের ক্যামেরায় বন্দী করে রাখুন দৃশ্যটি; বিশ্বাস করুন কখনোই হারাবে না। এরপর একটু আগালে আপনার দৃষ্টি কেড়ে নেবে কোনো একটি পাট কাঠির সাথে চুমুক দিয়ে থাকা দারুণ সব শামুক। হাতে ক্যামেরা থাকলে চট করে ছবি তুলে নেবেন। ছবি তোলার সময় অবশ্যই লক্ষ রাখবেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে আপনি যাতে পানিতে না পড়ে যান! অনেক হেঁটেছেন লেকের পাড় ধরে। আপনি এখন বেশ ক্লান্ত, লেকের শীতল পানিতে পা ডুবিয়ে ক্লান্তিটা মুছে নিন। চাইলে পাশের বিশাল ঘাসের রাজ্যে বসে একটু বিশ্রাম করতে পারেন। এবার ফেরার পালা। চলুন ফিরে যাই। কি লাউড স্পিকারে গান ভেসে আসছে! হ্যাঁ, ওই যে দেখুন, ওই যে ওখানে এত ছেলেমেয়ে কী করছে। কেউ নাচছে, কেউ গাইছে, কেউ বা ডিগবাজি দিচ্ছে। ওরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো এক বিভাগের শিক্ষার্থী। আজ ক্লাস পরীক্ষা নেই, তাই তারা পিকনিকে মেতেছে। বছরের প্রতিদিনই কোনো না কোনো পিকনিক লেগে থাকে এখানে। ওই যে ওরা গোল হয়ে বসে গ্রুপ ডিসকাশন করছে, সামনে পরীক্ষা তো, কী আর আর করবে- আড্ডার সাথে ফ্রি পড়াশোনা আর কি! জোড়ায় জোড়ায় প্রেমে মত্ত প্রেমিক-প্রেমিকাদের থেকে একটু দূরত্ব বজায় রেখেই হাঁটুন। কী লাভ ওদের বিরক্ত করে। করুক না প্রেম বেচারারা। সেশন জটে আটকাপড়ে বিয়ের বয়সটা যে পার হয়ে যাচ্ছে! হঠাৎই আপনার চোখ আটকে যেতে পারে নব্বইয়ের দশকের বাংলা সিনেমার নায়কের মতো বান্ধবীকে সাইকেলের সামনে বসিয়ে লেকের ধারে আসা রসিক প্রেমিককে দেখে। আর ওই যে দেখছেন ওরা, হ্যাঁ ওদের পড়াশোনা শেষ। হয়তো কয়েক দিনের মধ্যেই পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করবে, তাই শেষবারের মতো প্রিয় মফিজ লেককে একবার দেখে যাচ্ছে। মফিজ লেকের সব কিছুই আপনার ভালো লাগবে। তবে মন খারাপ হতে পারে স্বচ্ছ পানির এই লেকে কিছু কচুরি পানা দেখে। ওই জায়গায় চরম অব্যবস্থাপনা দেখে । হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে গিয়ে যখন বসার জন্য ভালো কোনো স্থান পাবেন না তখন কিছুটা খারাপ লাগতেই পারে। লেকের পানিতে নৌকা ভ্রমণ করতে পারলে ভালো লাগত। কিন্তু এত বড় লেকে এসে নৌকা-ভ্রমণের মজা হতে আপনাকে বঞ্চিত হতে হবে। ছাত্রছাত্রীদের প্রাণের দাবি, যেন এখানে বসার ভালো ব্যবস্থা করা হয়, লেকের পানিকে আরো পরিচ্ছন্ন রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়, আর লেকের ভেতরে নৌকা ভ্রমণ উপভোগ করার ব্যবস্থা করা হয়। সারা দিনের মফিজ লেক ভ্রমণ শেষে আপনি এই লেকের পানির মতো স্বচ্ছ সুন্দর একটি মন, দখিনা বাতাসে সতেজ শরীর আর নির্ভেজাল অনুভূতি নিয়ে ঘরে ফিরতে পারবেন। আপনার কানে বাজতে থাকবে পাখির গান, বাতাসে ভাসতে থাকবে বুনো ফুলের সুমধুর ঘ্রাণ। তাহলে আর দেরি কেন, সুযোগ পেলেই একবার ঘুরে যাবেন এই অনন্য সাধারণ লেকটি।