দূষণ-দখল জলজপ্রাণ শূন্য বুড়িগঙ্গা!

প্রকাশ:| বৃহস্পতিবার, ২৩ জানুয়ারি , ২০১৪ সময় ১১:৪২ অপরাহ্ণ

শাহেদ শফিক>>দ্রবীভূত অক্সিজেন পর্যাপ্ত না থাকাসহ পানির গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় রাজধানী ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বুড়িগঙ্গা নদী জলজপ্রাণ শূন্য হয়ে পড়ছে। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এর প্রাকৃতিক ভারসাম্য। সেই সঙ্গে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে নগরবাসীর জনস্বাস্থ্য।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও প্রাণিবিদ্যার হিসাবে, মৎস্য ও জলজ প্রাণীর জন্য পানিতে প্রতি লিটারে দ্রবীভূত অক্সিজেন (DO) ৫ মিলিগ্রাম বা তার বেশি থাকা প্রয়োজন। অপরদিকে দ্রবীভূত হাইড্রোজেন আয়নের সক্রিয়তার (pH) মাত্রা কমপক্ষে ৭ মিলিগ্রাম থাকা উচিৎ।

সম্প্রতি বুড়িগঙ্গা নদীর ওপর পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) পরিচালিত এক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, নদীর বিশাল অংশের পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ শূন্যের কাছাকাছি। এ অবস্থায় কোনোভাবেই জলজপ্রাণ জীবিত থাকতে পারে না।

পবার পরীক্ষায় দেখা গেছে, বুড়িগঙ্গা নদীর পানিতে সদরঘাট এলাকায় লিটার প্রতি ০.৪০ মিলিগ্রাম, ধোলাইখালে ০.৩৮ মিলিগ্রাম, পোস্তাগোলা-শ্মশানঘাটে ০.৫৫, শ্যামপুর খালের ভাটিতে ০.৬২ মিলিগ্রাম, পাগলা ওয়াসা ট্রিটমেন্ট প্লান্টের নির্গমন ড্রেনের ভাটিতে ০.৩৩ মিলিগ্রাম, পাগলা বাজার এলাকায় মাত্র ০.৩০ মিলিগ্রাম দ্রবীভূত অক্সিজেন (ডিও) রয়েছে।

নদীর দক্ষিণ পাড়ে বসুন্ধরা ইয়ার্ডে ০.১৪, পানগাঁওয়ে ০.২৩, ডকইয়ার্ডে ০.২১ মিলিগ্রাম ডিও রয়েছে যা পুরো নদীর মধ্যে সর্বনিম্ন।

অনদিকে নদীতে পড়া নালার পানিতে পিএইচের মাত্রা ১০.৩২ ও খালের মুখে ৯.৯৯। অর্থাৎ এই পানিতে এসিডের মাত্রা অত্যন্ত বেশি।

পর্যবেক্ষণে আরো দেখা গেছে, বুড়িগঙ্গার শ্যামপুর এলাকার শিল্পকারখানা এবং ডিএনডি বাঁধের টেক্সটাইল ডাইং ও ওয়াশিংয়ের বর্জ্য অপরিশোধিত অবস্থায় নদীতে ফেলা হচ্ছে। নদীতে পরীক্ষাকৃত স্থানসমূহে ডিও ৭.৯ থেকে ৮.৯৮ রয়েছে।

জানা গেছে, ঢাকা ওয়াসার পাগলা পয়ঃপরিশোধনাগার থেকে নির্গত বর্জ্যে ডিও প্রতি লিটারে ২.১৬ মিলিগ্রাম এবং পিএইচ ৮.৮৪ পাওয়া গেছে, যা কোনভাবেই প্রাণিবান্ধব হতে পারে না। ফলে দেখা গেছে, ওয়াসার এই পরিশোধনাগার বর্জ্য পরিশোধনে কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখছে না।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এক সময়ের মৎস্য সম্পদে ভরপূর বুড়িগঙ্গায়এখন আর কোনো জেলেকে মাছ ধরতে দেখা যাচ্ছে না। তাছাড়া পানির দুর্গন্ধে ব্যবহার তো বটেই এর আশপাশেও যাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে।

দুষণের কারণ
রাজধানীবাসীর পয়ঃবর্জ্য ও গৃহস্থালী বর্জ্য, হাজারীবাগের ট্যানারি শিল্পের বর্জ্য, শিল্প কারখানার বর্জ্য এবং নৌযানের বর্জ্য বুড়িগঙ্গা নদী দূষণের অন্যতম কারণ।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকায় পয়ঃবর্জ্যের পরিমাণ প্রায় ১৩ লাখ ঘনমিটার। এসব বর্জ্য পরিশোধনের জন্য ১ লাখ ২০ হাজার ঘনমিটার পরিশোধন ক্ষমতাসম্পন্ন পাগলায় ওয়াসার পরিশোধনাগার রয়েছে। যেখানে মাত্র ৫০ হাজার ঘনমিটার পরিশোধন করা হচ্ছে। বাকি ১২ লাখ ৫০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য অপরিশোধিত অবস্থায় সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। ফলে নদীর পানির গুণগত মানের অবনতি; মাছ ও জলজ প্রাণীর ক্ষতি; শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি ও গৃহস্থালী কাজে ব্যবহার অনুপযোগী; জীবাণুজনিত দূষণ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে হাজারীবাগের ট্যানারি শিল্প থেকে দৈনিক ২১ হাজার কিউবিক মিটার অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে পড়ছে। এসব বর্জ্যে ক্রোমিয়াম, সীসা, সালফিউরিক এসিড, পশুর মাংসসহ ক্ষতিকর পদার্থ রয়েছে। ট্যানারি হতে নির্গত এসব বিষাক্ত তরল ও কঠিন বর্জ্য বুড়িগঙ্গার পানির পাশাপাশি এর তলদেশ ও পাড়ের মাটি ও বাতাসকে ভয়াবহ দূষিত করছে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এসব ট্যানারি অতিদ্রুত সাভার ও কেরানীগঞ্জের চামড়া শিল্প নগরীতে না সরানো হলে নদীর সঙ্গে প্রাকৃতিক পরিবেশের দূষণ মাত্রা প্রতিদিনই বাড়বে।

অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, রাজধানীর অধিকাংশ টেক্সটাইল কারখানার বর্জ্য পরিশোধনাগার নেই। ফলে প্রতিদিন এ শিল্পের বিভিন্ন কারখানা থেকে প্রায় ৯০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য নদীতে পড়ে।

অপরদিকে নদীপথে চলাচলকারী নৌযানগুলোতে বর্জ্য সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই। এর মধ্যে সৃষ্ট বর্জ্য সংরক্ষণ করতে না পারায় এগুলো সরাসরি ফেলা হয় নদীতে। এর ফলেও দিনদিন দূষিত হচ্ছে নদীর পানি।

পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, অধিদপ্তর কর্তৃক পরীক্ষিত ১৩টি নদীর মধ্যে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বালু নদীর পানির মান খুব খারাপ এবং শুষ্ক মৌসুমে এসব নদীতে কোনো প্রাণ বাঁচতে পারবে না।

নদী রক্ষায় করণীয়
পয়ঃবর্জ্য পরিশোধনাগার স্থাপন; গৃহস্থালী বর্জ্য পানি প্রবাহে ফেলা থেকে বিরত থাকা; ট্যানারিগুলো জরুরিভিত্তিতে স্থানান্তর এবং বর্জ্য পরিশোধনাগার স্থাপন ও বর্জ্য পরিশোধন করা; শিল্পকারখানায় বর্জ্য পরিশোনাগার (ইটিপি) স্থাপন এবং নিয়মিত তা পরিচালনা করা; নৌযানের ডিজাইনে বর্জ্য সংরক্ষণ বা ধারণ করার স্থায়ী কাঠামো গড়ে তোলা; বিআইডব্লিউ কর্তৃক নৌযানের বর্জ্য সংগ্রহকরণ ও তা পরিশোধনপূর্বক পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ; নৌযানের বর্জ্য ও তেল নদীতে ফেলা থেকে বিরত থাকা এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন পবার যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আবদুস সোবহান বাংলামেইলকে বলেন, ‘নদী ভরাট ও দখলের মাত্রা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। ভরাট হয়ে যাওয়ায় নদীগুলো পানির ধারণ ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে। এভাবে চলতে থাকলে নদীর পানি ব্যবহার করার উপায় থাকবে না।’

তিনি আরো বলেন, ‘প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় আমাদের কেউ সচেতন হচ্ছে না। সরকার যদি অতি দ্রুত এসব নদ-নদী ও তার জীববৈচিত্র্য রক্ষায় উদ্যোগ গ্রহণ না করে তাহলে পরিবেশের ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটবে। যেটা আমাজের জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।’

সোবহান আরো বলেন, ‘যেসব কলকারখনা বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান আইন ভঙ্গ করে নদী ও তার পরিবেশ নষ্ট করছে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ওইসব প্রতিষ্ঠানকে সংশ্লিষ্ট আইন মানা ও পরিবেশের ঝুঁকির দিকগুলো সম্পর্কে সচেতন করতে পারলেই নদীগুলোকে রক্ষা করা যাবে।’
>>স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বাংলামেইল২৪ডটকম