দক্ষিণ চট্টগ্রামে সাত উপজেলায় ৫০ কোটি টাকার পেয়ারার ফলন

প্রকাশ:| বুধবার, ১৩ আগস্ট , ২০১৪ সময় ০৯:৪৫ অপরাহ্ণ

পেয়ারাচলতি মৌসুমে দক্ষিণ চট্টগ্রামে পেয়ারার বাম্পার ফলন হয়েছে। এ এলাকার সাত উপজেলায় এ বছর প্রায় ৫০ কোটি টাকার পেয়ারা উৎপাদদ হয়েছে। পটিয়া, চন্দনাইশ,সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও বাঁশখালীর পাহাড়ি অঞ্চলে উত্পাদিত হচ্ছে প্রচুর পেয়ারা। এসব এলাকার উত্পাদিত পেয়ারা পাওয়া যাচ্ছে চট্টগ্রামের বিভিন্নস্থানে। শুধু চন্দনাইশ উপজেলার হাশিমপুর, কাঞ্চনাবাদ ইউনিয়নের অধিকাংশ পাহাড়ি এলাকায় পেয়ারা চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছে কয়েক হাজার মানুষ। চন্দনাইশের এ দু’ইউনিয়ন পেয়ারা গ্রাম নামে এলাকায় বেশ পরিচিতি রয়েছে। এখানকার পেয়ারা সুস্বাদু এবং বড় আকারের বলে গ্রহণযোগ্যতা বেশি। এ দু’এলাকার উত্পাদিত পেয়ারার চাহিদা শুধু দেশে নয়, বিদেশেও রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এসব এলাকার পেয়ারা রপ্তানি হচ্ছে। এতে স্থানীয় পেয়ারাচাষীরা অধিক লাভবান হচ্ছেন। তারা জানান, দেশের সবচেয়ে বেশি পেয়ারা উৎপাদন হয় দক্ষিণ চট্টগ্রামে। এর মধ্যে চন্দনাইশ ও পটিয়ার পেয়ারা সবচেয়ে সুস্বাদু। এর চাহিদাও প্রচুর।

পেয়ারা১চট্টগ্রাম (দক্ষিণ) কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর জেলার সাত উপজেলায় প্রায় চার হাজার একর জমিতে পেয়ারার চাষ হয়েছে। গত বছর এর পরিমাণ ছিল প্রায় সাড়ে তিন হাজার একর। এখানে ছোট-বড় প্রায় সাড়ে ছয় হাজার বাগান রয়েছে। বেশির ভাগ বাগান গড়ে উঠেছে পাহাড়ে। এছাড়া শ্রীমতি খাল ও শঙ্খ নদী পাশে পেয়ারার চাষ করা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় গত বছরের চেয়ে এবার ফলন ভালো হয়েছে। ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে উত্সাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে। এখানে মূলত কাজী, আঙ্গুরী, বাউ ও কাবিরি জাতের পেয়ার চাষ করা হয়। এছাড়া পটিয়া ও চন্দনাইশে আদিংশ জাতের একধরনের সুমিষ্ট পেয়ারার চাষ করা হয়, যার ভেতরের একাংশ লাল।

পটিয়া ও চন্দনাইশের পেয়ারা চাষীরা জানান, প্রতি বছর এ দুই উপজেলা থেকে প্রায় ২৫-৩০ কোটি টাকার পেয়ারা বিক্রি হয়। কিন্তু স্থানীয় কৃষি অফিস চাষীদের কোনো সহায়তা করে না। এছাড়া বেসরকারি পর্যায়ে এ পর্যন্ত কেউ এগিয়ে আসেনি। এতে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করতে পারছেন না তারা।

চন্দনাইশ উপজেলার মুরাদাবাদ গ্রামের পাইকারি পেয়ারা ব্যবসায়ী নূর আহম্মদ বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমি পেয়ারার ব্যবসা করে আসছি। এখানে উৎপাদিত পেয়ারা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। প্রতিদিন এখানকার হাট-বাজারে হাজার পাইকার আসে পেয়ারা নিতে।’

পেয়ারাসরেজমিনে দেখা যায়, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পটিয়া কমল মুন্সীর হাট থেকে দোহাজারী পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে ২৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে অস্থায়ী পেয়ারার হাট বসেছে। চাষীরা তাদের বাগান থেকে পেয়ারা সংগ্রহ করে বিক্রির জন্য সারিবদ্ধভাবে বসে আছে। পাইকারি ক্রেতারা তাদের চাহিদামতো পেয়ারা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। জুন থেকে আগস্ট এ দুই মাসে শুধু চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরাই নন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকাররা ছুটে আসেন পটিয়া ও চন্দনাইশসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামে।

চন্দনাইশ উপজেলার পেয়ারা চাষী কৃষক মো. আলতাফ মিয়া বলেন, ‘আমি ২৮০ শতক জমিতে পেয়ারা চাষ করেছি। আমার বাগান সাতটি। এ বছরের মতো ফলন গত দুই বছরেও হয়নি। চাষীরা পেয়ারার ভালো দাম পেয়েছেন। প্রতিটি বাগান থেকে গড়ে ৩-৫ লাখ টাকার পেয়ারা বিক্রি করা যায়।

অর্গানিক পেয়ারা দক্ষিণ চট্টগ্রামের গহিন অরণ্য ও পাহাড়ের পাদদেশের অর্গানিক পেয়ারা চট্টগ্রামের গণ্ডি ছাড়িয়ে সারাদেশে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। চারা রোপণ থেকে শুরু করে ফলন আসা পর্যন্ত গাছে কোনো ধরনের রাসায়নিক সার, ক্ষতিকারক কীটনাশক ব্যবহার ছাড়াই বিষমুক্ত স্বাস্থ্যসম্মতভাবে চন্দনাইশের কাঞ্চননগরী জাতের পেয়ারা উত্পাদন হয়।
পেয়ারা১একটানা ৭০ বছর ধরে এভাবেই উত্পাদিত হয়ে আসছে স্বাস্থ্যসম্মত এ পেয়ারা। চারা রোপণ থেকে শুরু করে গাছে ফলন আসা সবই হচ্ছে প্রকৃতিগতভাবে। এখানকার পাহাড়ি মাটি যেমন উর্বর তেমনি মাটিতেও রয়েছে প্রচুর ভিটামিন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। এ কারণে এখানকার চাষিরা গাছে সার-কীটনাশক ব্যবহার করেন না। এছাড়া গাছে ফল আসা থেকে শুরু করে পরিপক্ব ফল তোলা এবং বাজারজাত করা পর্যন্ত কোনো ধরনের ক্ষতিকারক প্রিজারভেটিভ দেওয়া হয় না। ফলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের গহিন অরণ্যে উত্পাদিত পেয়ারা প্রকৃতিগতভাবেই অর্গানিক ও স্বাস্থ্যসম্মত। প্রায় ৭০ বছর আগে চন্দনাইশ উপজেলার কাঞ্চননগর পাহাড়ি এলাকায় সর্বপ্রথম এই পেয়ারার আবাদ শুরু হয়। পর্যায়ক্রমে তা ছড়িয়ে পড়ে পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রামে। বর্তমানে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাত উপজেলায় হাজার হাজার হেক্টর জায়গায় পেয়ারা চাষ হচ্ছে। সম্প্রতি চন্দনাইশ উপজেলার কাঞ্চননগরে উত্পাদিত পেয়ারাকে সরকারিভাবে চন্দনাইশের কাঞ্চননগরী জাত হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে।
চন্দনাইশ উপজেলার হাশিমপুর ইউনিয়নের পেয়ারা চাষি মোহাম্মদ সাহাব উদ্দীন বলেন, এখানকার মাঠি উর্বর হওয়ায় কখনই পেয়ারা চাষে কোনো ধরনের কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয় না। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে প্রায় ৪০-৫০ বছর ধরে এলাকার চাষিরা পেয়ারা উত্পাদন করে আসছে।

পেয়ারা ভিত্তিক মাল্টি জুস প্ল্যান্টের সম্ভাবনা উজ্জ্বল– যোগাযোগ ব্যবস্থা ও প্রিজার্ভেশনের (সংরক্ষণ) অভাবে বছরে কোটি টাকারও বেশি পেয়ারা নষ্ট হয়ে যায়। পেয়ারা ভিত্তিক মাল্টি জুস প্ল্যান্টচট্টগ্রামের একাধিক কৃষিবিদ সংগ্রামকে জানান, দক্ষিণ চট্টগ্রামে পেয়ারা ভিত্তিক একটি ফ্রুটস প্রিজার্ভেশন প্লান কমপ্লেক্স করা হলে মাল্টি জুস এন্ড জেলীস জাতীয় কারখানা গড়ে তোলা সম্ভব হতো।
পটিয়া ও চন্দনাইশ কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, দক্ষিণ চট্টগ্রামে প্রায় ৩ হাজার একর জমিতে পেয়ারা চাষ হয়। এতে প্রায় ২০ হাজার ছোট বড় বাগান রয়েছে। বাগানের বেশি ভাগই পাহাড়ি এলাকায়। বাকিগুলো শক্মখ নদী ও শ্রমতি খাল লাগোয়া। বোয়ালখালী উপজেলার রত্তনপুর-করলডেঙ্গা এলাকা থেকে শুরু করে পটিয়া হয়ে চন্দনাইশের দোহাজারী পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে পেয়ারা চাষ হচ্ছে। তার মধ্যে চন্দনাইশের হাশিমপুর, কাঞ্চননগর, পূর্ব এলাহাবাদ, লট এলাহাবাদ, ছৈয়দাবাদ, রায় জোয়ারা, লালুটিয়া, জামিরজুরি ও দোহাজারীতে সবচেয়ে বেশি চাষাবাদ হয়েছে পেয়ারার। চন্দনাইশের পাহাড়ি এলাকা লট এলাহাবাদে গিয়ে দেখা যায়, ওখানে দুই প্রকারের পেয়ারা দেখা যায়। যার মধ্যে কাজী পেয়ারা ও কাঞ্চনা পেয়ারা। পটিয়ার খরনা ইউনিয়নের কমলমুন্সির হাটে বিক্রি হচ্ছে প্রায় পাঁচ রকমের পেয়ারা। তারমধ্যে সাহেব পেয়ারা ও মাথা পেয়ারা প্রসিদ্ধ। সাহেব পেয়ারা গুণগত মানের দিক দিয়ে অনেক উন্নত ও ওজনে এবং আকারে বড়।
কমলমুন্সি বাজারের পেয়ারা ব্যবসায়ী আহমদ নূর জানান, সাহেব পেয়ারার ওজন সর্বোচ্চ ১ কেজি ও সর্বনিম্ম ২৫ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে। প্রকৃতিগত কারণে পেয়ারাগুলোর স্বাদ সুমিষ্ট ও ঘ্রাণ মোহনীয় এবং দেখতে সুন্দর।
জুস প্ল্যান্টপটিয়ার খরনা, কচুয়াই, হাইদগাঁও, উত্তর শ্রীমাই, রত্তনপুর, কেলিশহর, বোয়ালখালী উপজেলার করল ডেঙ্গা, শ্রীনগর , সাতকানিয়ার পাহাড়ি এলাকায় প্রচুর পরিমাণে পেয়ারা বাগান রয়েছে। প্রতিবছর আষাঢ় মাস থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত পেয়ারা পাওয়া যায় বাগানগুলোতে। হাইদগাঁও ইউনিয়নের পেয়ারা চাষী দেলোয়ার হোসেন জানান, আগে পেয়ারা চাষে প্রচুর উপার্জন হতো। এখন দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়ায় পেয়ারা চড়া দামে বিক্রি করেও তেমন লাভ থাকেনা। সুষ্ঠু যোগাযোগ ব্যবস্থা অভাবে অনেক সময় পেয়ারা বাগানে নষ্ট হয়ে যায়। নগরীর বহদ্দরহাট এলাকার পেয়ারা ব্যবসায়ী আব্দুল আজিজ বলেন, দক্ষিণ চট্টগ্রাম থেকে প্রতিদিন শত শত মিনি ট্র্াক করে নগরীর রিয়াজ উদ্দিন বাজার, বহদ্দরহাট, কাজীর দেউরী বাজার এলাকায় পেয়ারা আসছে। চট্টগ্রামের মানুষের চাহিদা শেষে অবশিষ্ট পেয়ারা পানির দামে বিক্রি অথবা নষ্ট হয়ে যায়। তিনি জানান, পেয়ারা মৌসুমে খুব কম দামে পেয়ারা বিক্রি হয় চট্টগ্রামে। দেশের বাইরে এই পেয়ারা যায় না । ফলে উৎপাদিত পেয়ারার বেশি ভাগ পচে গলে নষ্ট হয়ে যায়। প্রিজার্ভেশন প্ল্যান থাকলে চাষী ও ব্যবসায়ীরা যেমন ন্যায্য মূল্য পেত , তেমনি বছরে সব সময় দেশের মানুষ পেয়ারার স্বাদ পেত।
সংশ্লিষ্ট এলাকার কৃষি অফিস সূত্র জানায়, প্রতি বছর কেবল পেয়ারা বিক্রি করেই চাষীরা প্রায় ৩০ কোটি টাকা আয় করে। এর সঙ্গে পরিবহন, শ্রমিক, আড়ৎ ও আনুষঙ্গিক খরচ মিলে প্রায় ৫০ কোটি টাকারও বেশি আয় করে। তারা জানান, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে ১৩ টি জায়গায় প্রতিদিন অস্থায়ী পেয়ারার হাট-বাজার বসছে। পটিয়ার কমলমুন্সির হাট, খরনা বাস ও রেল স্টেশন, চন্দনাইশের রৌশনহাট, খানহাট, বাগিচাহাট, গাছ বাড়িয়া কলেজ বাজার, বাদামতল, দোহাজারী রেল স্টেশন বাজার প্রসিদ্ধ।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) পটিয়ার যুগ্ম পরিচালক মোহাম্মদ শাহনেওযাজ জানান, দক্ষিণ চট্টগ্রামে পেয়ারা ও মৌসুমী ফল ভিত্তিক একটি প্রিজার্ভেশন প্ল্যান বা মাল্টি জুস এ্যান্ড জেলিস প্ল্যান গড়ে তোলার পরিবেশ রয়েছে। এ ব্যাপারে উপর মহলে জানানো হয়েছে। এ প্ল্যানটা করা গেলে ফল চাষীরা অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হবে।