দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ বদরখালী সমবায় কৃষি ও উপনিবেশ সমিতি ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে অর্ধশত বছরের পুরনো ভবন

প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ১৮ মার্চ , ২০১৪ সময় ০৯:৫৮ অপরাহ্ণ

মুহাম্মদ জিয়াউদ্দীন ফারুক,চকরিয়া:
চকরিয়া উপজেলায় অবস্থিত বাংলাদেশের সমবায় অঙ্গনের অনন্য বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন আত্মনির্ভরশীল বৃহদাকার সমবায়ী প্রতিষ্টান বদরখালী সমবায় কৃষি ও উপনিবেশ সমিতি। কালের সাক্ষী সেই অর্ধশত বছরের পুরাতন ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটি অবশেষে ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে। ১৯৬৪সনে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা কমিটি এ ভবনটি নির্মাণ করেন। দীর্ঘ ৪যুগ অতিবাহিত জরাজীর্ণ এ ভবনে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সভ্যগণ সমিতির যাবতীয় দাপ্তরিক কর্মকান্ড চালিয়ে আসছিল।
১৯৯১সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাসের কারণে মারাত্মকভাবে বিপর্যয় ঘটে প্রাচীন এই ভবনটির। বিগত ব্যবস্থাপনা কমিটি সমিতির বার্ষিক সাধারণ সভায় ভবনটি অপসারণের জন্য বিশাল বাজেটের মাধ্যমে সমিতির সভ্যরা সভায় অনুমতি দেন। কিন্তু ওই ব্যবস্থাপনা কমিটি তাদের উদ্যেগে জরাজীর্ণ এই ভবনটি ভেঙ্গে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়নি ।
গত ২০১৩সালে দেশের বহুল আলোচিত ঢাকার সাভারে রানা প্লাজা ধসে বহু শ্রমিক হতাহতের ভয়াবহ ট্রাজেডি ও ঘনঘন ভূমিকম্পের কারনে শেষ পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এ ভবনটি অপসারণের উদ্যোগ নেয় বর্তমান বদরখালী সমবায় কৃষি ও উপনিবেশ সমিতির ব্যবস্থাপনা কমিটি। সমিতির জরাজীর্ণ ও ঝুকিপূর্ণ ভবনের ব্যাপারে দেশের স্থানীয়,আঞ্চলিক ও জাতীয় সংবাদপত্রে তথ্যবহুল রিপোর্টও প্রকাশিত হয়।
ভবনটি ভাঙ্গার বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে সমিতির বর্তমান সম্পাদক এ.কে.এম ইকবাল বদরী জানান, পুরাতন ভবনটি অপসারণ করে নতুন ভবন নির্মাণ করার ব্যাপারে অনেক আইনী জটিলতা ছিল। আইনী প্রক্রিয়া শেষে সমিতির বিশেষ সাধারণ সভার অনুমোদন সাপেক্ষে চলতি বছরের শুরুতে ভবনটি ভেঙ্গে ফেলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বর্তমানে জরাজীর্ণ ভবনটির পুরোদমে ভাঙ্গন কাজ চলছে। নতুন ভবন নির্মাণের জন্য প্রাথমিকভাবে ১৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ব্যয় বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী এ ভবনটি হবে ৫তলা পর্যন্ত । তবে প্রাথমিক পর্যায়ে দ্বিতল পর্যন্ত ভবন নির্মান চুড়ান্ত করা হবে। ভবন নির্মানের জন্য বিগত ব্যবস্থাপনা কমিটি বার্ষিক সাধারণ সভায় অনুমোদন সাপেক্ষে ১কোটি টাকা বরাদ্ধ রেখেছে। নতুন ভবন নির্মাণ খাতে বরাদ্দকৃত টাকাগুলো ব্যয় করা হবে।
তথ্য সুত্রে জানা যায়, জেলার উপকূলীয় সমৃদ্ধ জনপদের নাম বদরখালী। বদরখালী ইউনিয়নে ১৯২৯সালে স্থাপিত হয় বদরখালী সমবায় কৃষি ও উপনিবেশ সমিতি। ১৯৩০ সনে ৩৭/সি মূলে সমিতিটি নিবন্ধিত হয়। ২৬২জন সভ্য নিয়ে সমিতির অগ্রযাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে সমিতির সভ্য সংখ্যা ১৫০০জন। ২৬২ জন সভ্য নিয়ে সমিতির যে অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছিল তারা পৃথিবীতে কেউ বেঁচে নেই। ১৯২৯সালে উপনিবেশিক সরকার জনবসতি গড়ে তোলার জন্য ওই এলাকায় বদরখালী সমবায় কৃষি ও উপনিবেশ সমিতি গঠন করে ২৬২ টি ভূমিহীন পরিবারকে ৩৯১০একর জমি ইজারা দেয়। চকরিয়ার প্রাচীনতম সুন্দরবন এলাকায় ওই জমি বনমুক্ত করে কৃষি,ভূমি হিসেবে ৩৭৭৭ একর জমি সমিতির অনুকূলে বন্দোবস্তী দেয়া হয় । বন্দোবস্তীকৃত ওই জমি সমিতির ২৬২ শেয়ার অনুকূলে ১২ একর করে জমি বরাদ্ধ দেয়া হয়।
সমিতির ভূ-সম্পত্তি হিসেবে ৩৭৭৭একর জমির মধ্যে বেশির ভাগ লবণ ও চিংড়ি চাষের উপযোগী জমি। এসব জমির বাৎসরিক আয়ের রাজস্ব থেকে সমিতির সকল ব্যয়ভার নির্বাহ করা হয়। সমিতিকে ৩টি ব্লকে বিভক্ত করা হয়েছে। বদরখালী ইউনিয়নের সমিতির তাদের সভ্য, পোষ্য ও অংশীদার রয়েছে প্রায় ৪০হাজার।
সমিতির হিসাব রক্ষকের তথ্যমতে আরো জানা যায়, সমিতি প্রতিষ্ঠার পর থেকে গণতান্ত্রিক পন্থায় প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে সমিতি পরিচালনার জন্য ১২ সদস্যের নির্বাচিত কমিটি ৩ বছরের জন্য দায়িত্ব পালন করেন। তাদের মধ্যে ১ জন সভাপতি, ১জন সহ-সভাপতি, ১জন সম্পাদক ও ৯জন পরিচালক (ডাইরেক্টর) রয়েছেন। সমিতির যাবতীয় দাপ্তরিক কর্মকান্ড চালানোর জন্য রয়েছেন ১৪জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। এর মধ্যে ম্যানেজার ১ জন (বর্তমানে শূন্য পদ), হিসাব রক্ষক ১জন, সহকারী ব্যবস্থাপক ১জন, ক্যাশিয়ার ১জন, প্রধান কালেক্টর ১জন, সার্ভেয়ার ১জন, পেশকার ১জন, গার্ড ২ জন(কালেকশন),অফিস পিয়ন ১জন, কম্পিউটার অপারেটর ১ জন, নোটিশ জারীকারক ১জন, নৈশ প্রহরী ১জন,সুইপার ১জন।
প্রতিষ্টালগ্ন থেকে বিভিন্ন দূর্যোগময় মুহুর্ত ছাড়াও এলাকায় রাস্তাঘাট, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, মন্দির ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ করে আসছে বদরখালী সমবায় কৃষি ও উপনিবেশ সমিতি। সমিতির নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত প্রতিষ্টানগুলোর মধ্যে জামে মসজিদ ৩৯টি, ফোরকানিয়া ও পাঞ্জেখানা ১১টি, মন্দির ১টি, হাইস্কুল ৩টি,মাদ্রাসা ৪টি(১টি ফাজিল ও ৩টি দাখিল), কলেজ ১টি, প্রাথমিক বিদ্যালয় ৯টি, কেজি স্কুল ৪টি, হেফজখানা-এতিমখানা ৭টি, গোরস্থান ১৯টি,শশ্মান ১টি, সাইকো¬ন শেল্টার ১৯টি, ৩টি কমিউনিটি ক্লিনিক। এছাড়াও সমিতির জায়গায় রয়েছে ১টি হাসপাতাল,পোষ্ট অফিস ১টি, ১টি নৌ-পুলিশ ফাঁড়ি ও খাদ্য গুদাম ১টি, পানি উন্নয়ন বোর্ড ১টি,ওয়ারল্যাস অফিস ১টি,সোনালী ব্যাংক ১টি, বিদ্যুৎ রিভার ক্রসিং ১টি।
সমিতির আয়ের প্রধান খাত-চিংড়ি, রিজার্ভ জমি এবং খাল। চিংড়ি প্রকল্প থেকে বাৎসরিক আয় আসে প্রায় ৮০লক্ষ টাকা, রিজার্ভ জমি হতে ৬ লক্ষ টাকা, খাল থেকে ১৫লক্ষ টাকা।
সমিতির নিজস্ব অর্থায়নে কর্ম এলাকায় অবকাঠামোগত অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধনের মাধ্যমে প্রায় ৪০হাজার জনগোষ্টীর বাস্তবধর্মী সেবা দিয়ে আসছে। যেটি জেলায় নয়, পুরো বাংলাদেশে ছাড়িয়ে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ কৃষি উপনিবেশ সমবায় সমিতি হিসেবে নজির স্থাপন করেছে। বিশেষ করে এ সমিতি কৃষিবান্ধব হিসেবে এতদাঞ্চালে ব্যাপক অবদান রাখায় বিগত ২০০৯ সালে ৪০তম জাতীয় সমবায় দিবসে কৃষিভিত্তিক শ্রেষ্ঠ সমবায় প্রতিষ্টান হিসাবে স্বর্ণপদক ও সনদ প্রদান করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।