থানায় পৌঁছে যুবলীগ ক্যাডার বাবরের হুমকি-ধমকি

প্রকাশ:| বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন , ২০১৩ সময় ১০:২৪ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামের রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে টেন্ডারবাজি নিয়ে সশস্ত্র সংঘর্ষে দু’জন নিহতের ঘটনার মূল হোতা যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য teror-babor-bg20130626112012হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরকে (৪০) চট্টগ্রামে আনা হয়েছে। বাবরের সঙ্গে তার আরও পাঁচ অনুসারীকে চট্টগ্রামে আনা হয়েছে।

বুধবার রাত ১০টা ৪০ মিনিটে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে বাবরসহ তার পাঁচ অনুসারীকে নিয়ে পুলিশের একটি টিম নগরীর কোতয়ালী থানায় পৌঁছে। থানায় এসে যুবলীগ ক্যাডার বাবর চরম উচ্ছৃঙ্খল আচরণ শুরু করে। এসময় বাবর চিৎকার-চেঁচামেচির পাশাপাশি পুলিশকে লক্ষ্য করে বাবর হুমকি-ধমকি দেয়। এমনকি হাজতখানায় ঢোকানোর পরও বাবর চিৎকার করতে থাকে।

মঙ্গলবার গভীর রাতে রাজধানী ঢাকার গুলশানে একটি বাসায় আত্মগোপনরত অবস্থা থেকে বাবরও তার পাঁচ অনুসারীসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বাবরের সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া অন্যরা হলেন, প্রেমাসিস মুৎসুদ্দি ওরফে ছোটন বড়ুয়া (৩৫), শাহ আলম, পলাশ দাশ, রবি দে এবং  মাজহারুল ইসলাম শাকিল।

এদের মধ্যে বাবর, ছোটন বড়ুয়া ও শাহ আলম টেন্ডারবাজির ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার এজাহারভুক্ত আসামী। মাজহারুল ইসলাম শাকিল ঢাকার মোস্ট ওয়ান্টেড শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের সেকেন্ড ইন কমান্ড বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।

তাদের নিয়ে বুধবার দুপুর ২টার দিকে পুলিশের একটি টিম মাইক্রোবাসযোগে ঢাকা থেকে রওনা দেয়। রাত ১০টা ৪০ মিনিটে কোতয়ালী থানায় তারা পৌঁছে।

থানার সামনে গাড়ি থেকে নামার সময় সাংবাদিকদের দেখেই চিৎকার শুরু করে বাবর। চিৎকার করে সে বলতে থাকে, ঘটনার সময় আমি আমার ফ্ল্যাটে ছিলাম। আমি সিআরবিতে যাইনি। অথচ আমাকে মামলার আসামী করা হয়েছে। আমি এ ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত চাই।

হাজতখানায় নেবার সময় চিৎকার করে বাবর বলেন, আমি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার। চট্টগ্রামের রাজনীতি তিন ভাগে বিভক্ত। আমি এক ভাগে আছি। সেজন্য অন্যরা ষড়যন্ত্র করে আমার নাম মামলায় দিয়েছে।

এসময় থানায় হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। এর এক পর্যায়ে বাবর কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে ‘তুই’ সম্বোধন করে বলেন, ‘আমি কি চোর, ডাকাত ? আমাকে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে নিয়ে এসেছিস কেন ?’

চিৎকার করে বাবর জানায়, আমি হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নেবার জন্য ঢাকায় গিয়েছিলাম। তার আগেই পুলিশ আমাকে গ্রেপ্তার করেছে। আমাকে গ্রেপ্তারের ঘটনা ন্যাক্কারজনক।

বাবর বলেন, ‘আমি প্রমাণ করে দেব, আমি ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়।’

জিনসের প্যান্ট ও পাঞ্জাবি পরিহিত বাবর হাজতখানায় বেশ কিছুক্ষণ চেঁচামেচির পর এক পর্যায়ে শান্ত হয়ে পায়চারি করতে থাকে। এসময় তাকে সিগারেট খেতে দেখা গেছে।

বাবরকে চট্টগ্রামে নিয়ে আসা পুলিশ সদস্যরা জানান, যাত্রাপথে মাইক্রোবাসে বসা বাবর ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে পৌঁছার পুরো সময় শুধু পুলিশকে গালাগাল করেছেন। জেল থেকে বের হয়ে পুলিশকে এবং তাকে যারা মামলায় ফাঁসিয়েছে তাদের দেখে নেয়ারও হুমকি দেন।

কোতয়ালী থানার ওসি একেএম মহিউদ্দিন সেলিম বাংলানিউজকে বলেন, ‘বাবরসহ এজাহারভুক্ত আসামীদের বৃহস্পতিবার আদালতে হাজির করা হবে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাতদিনের রিমান্ডের আবেদন জানানো হবে।’

সোমবার রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রায় দেড় কোটি টাকার তিনটি কাজের টেন্ডার নিয়ে সিআরবি এলাকায় হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরের অনুসারী যুবলীগ এবং ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সম্পাদক সাইফুল আলম লিমনের অনুসারী ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের মধ্যে গোলাগুলি হয়। এতে আট বছরের এক শিশুসহ দু’জন নিহত হয়েছে।

এ ঘটনায় কোতয়ালী থানার উপ-পরিদর্শক (এস আই) মহিবুর রহমান বাদি হয়ে ৮৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৩০-৪০ জনকে আসামী করে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় লিমনকে প্রধান আসামী করা হয়েছে। আর বাবরকে ৫৩ নম্বর আসামী করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে বাদি উল্লেখ করেছেন, সিআরবি সাত রাস্তার মোড়ে ঘটনার সময় সাইফুল আলম লিমন এবং হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর উপস্থিত ছিলেন। তাদের নির্দেশে সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।

সংঘর্ষের ঘটনার পর লিমনকে ছাত্রলীগ থেকে বহিস্কার করা হয়েছে। আর বাবরের বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছেন যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ।

গ্রেপ্তার হওয়া যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর সাবেক মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী। আর সাইফুল আলম লিমন নগর আওয়ামী লীগ নেতা আ জ ম নাছির উদ্দিনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

ঘটনার পর থেকে পুলিশ এ পর্যন্ত বাবর ও লিমনসহ এ মামলার মোট ৫৬ জন আসামীকে গ্রেপ্তার করেছে। এদের মধ্যে ৪৫ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, ছাত্রজীবনে ওমরগনি এমইএস কলেজকেন্দ্রিক ছাত্রলীগ রাজনীতির সাথে জড়িত হয়ে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর। পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ এই সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে ১৯৯৫ এবং ১৯৯৬ সালে কোতোয়ালী থানায় হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে ৩টি মামলা হয়।

১৯৯৯ সালে নগরীর টাইগার পাস মোড়ে সিটি কলেজ ছাত্রসংসদের সাবেক জিএস ও ছাত্রলীগ নেতা আমিনুল ইসলামকে গুলি করে হত্যা করে।  এসমব মামলায় গ্রেফতার হয়ে সে দীর্ঘদিন কারাগারে আটক ছিল।

বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সে থাইল্যান্ডে পালিয়ে যায়। বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশে ফিরে এসে আবার সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে এবং রেলওয়ের সব ধরনের টেন্ডারে নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।

গ্রেফতার হওয়া যুবলীগের এই শীর্ষ ক্যাডার নগরীর নন্দনকানন এলাকার বুড্ডিষ্ট টেম্পল রোডের জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর পুত্র।

সংবাদ -বাংলা নিউজের


আরোও সংবাদ