তিন মাসে ৬৬ ধর্ষণ, ৮৩ শিশু হত্যা ও নির্যাতনে আত্মহত্যা ১১৩

প্রকাশ:| শনিবার, ২ এপ্রিল , ২০১৬ সময় ০৯:৩৪ অপরাহ্ণ

দেশের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয় বলে মনে করে দেশের অন্যতম মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা। এই তিন মাসে পারিবারিক কোন্দলে আাহত ও নিহত, গৃহকর্মী নির্যাতন ও খুন, নারী নির্যাতন, সামাজিক ও রাজনৈতিক সহিংসতা ,শিশু হত্যার ঘটনা ছিল উল্লেখযোগ্য। মার্চে ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে বেশ সহিংসতার ঘটনা ঘটে ।

বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার জানুয়ারী থেকে মার্চ মাসের মনিটরিং-এ পাওয়া তথ্য-উপাত্ত থেকে দেখা যায়,

শিশু হত্যা ও নির্যাতনঃ গত তিন মাসে ৮৩ জন শিশু হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হয় । মার্চে ২১জন শিশুকে হত্যা করা হয়।নির্যাতনের শিকার হয় ৯ জন। ফেব্রুয়ারি মাসেই শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে সবচেয়ে বেশী। এই মাসে ৪০ জন শিশুকে নির্যাতন করা হয় । হত্যা করা হয় ২৪ শিশুকে। ১২ ফেব্রুয়ারি নাটোরের বাগাতিপাড়ার মাকুপাড়া বাজারে স্কুলপড়ুয়া তিন শিশুকে রশি দিয়ে হাত বেঁধে নির্মম নির্যাতন করা হয়। একই দিনে রাজশাহীর দুই স্কুল ছাত্রকে চুরির অপবাদ দিয়ে হাত পা বেঁধে সাত ঘন্টা ধরে নির্যাতন করা হয়। রাজধানীর বনশ্রীতে নিজ দুই সন্তানকে হত্যা করে এক মা।

যৌতুকঃ গত তিন মাসে যৌতুকেন কারনে প্রাণ দিতে হয়েছে ১৭ জন নারীকে। যৌতুকের কারনে নির্যাতিত হয়ে আহত হয় ৪১ জন নারী।
জানুয়ারী মাসে যৌতুকের জন্য প্রাণ দিতে হয়েছে ৫ জন নারীকে এবং মারাত্মক আহত হয় ৯ জন নারী । মুন্সিগঞ্জে যৌতুক না পেয়ে স্ত্রীকে বোতল দিয়ে পিটিয়ে জখম করে এক স্বামী। ।
ফেব্রুয়ারি মাসে যৌতুকের জন্য প্রাণ দিয়েছেন ৬ জন নারী এবং যৌতুকের কারনে আহত হয় ২৩ জন নারী । মুন্সিগজ্ঞের গৃহবধূ রাশিদা বেগমকে যৌতুকের কারনে ব্লেড দিয়ে কেটে রক্তাক্ত করে স্বামী ও দেবর।
মার্চে যৌতুকের কারনে নিহত হন ৬ ও আহত ৯ জন। খাগড়াছড়িতে গৃহবধূ মাজেদা বেগম ও তার শিশু সন্তানকে শ্বাসরোধে হত্যা করে পাষন্ড স্বামী ।

পারিবারিক কলহঃ পারিবারিক কলহে গত তিন মাসে নিহত হয় ৬৭ জন ও আহত হয় ৯৫ জন। তিন মাসে বেশ কিছু পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা অলোচিত হয়েছে।
জানুয়ারী মাসে নিহত হয় ২৫ জন ও আহত হয় ১২ জন । পারিবারিক কলহের জের ধরে ইকবাল হোসেন নামে এক ব্যাক্তি নিজের ভাই বোনের তিন সন্তান কে পুড়িয়ে মারে। পারিবারিক কলহে ফেব্রুয়ারি মাসে নিহত হয় ২৮ জন ও আহত হয় ৬৯ জন । পারিবারিক কলহের জের ধরে বেয়ালমাড়িতে ভাইয়ের হাতে খুন হন বোন। তাছাড়া পাবনায় পারিবারিক কলহের কারনে এক মা ও তার সন্তানের বিষ পানে মৃত্যু হয়। মার্চে নিহত হয় ১৪ জন আহত হয় ১৪ জন। পারিবারিক সদস্যদের মধ্যে দ্বন্ধ, রাগ, পরকীয়া সহ বিভিন্ন পারিবারিক কারনে এই সব মৃত্যু সংগঠিত হয়বলে জানা গেছে।

ধর্ষন ঃ এই তিন মাসে মোট ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৬৬ জন নারী ও শিশু ।
এদের মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয় ২৫ জন, ২০ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয় । ১৩ জন নারী হয় গণ ধর্ষণের শিকার হয় । ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৮ জনকে।
মার্চে ২৪ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয় । ধর্ষিত হয় ১০ জন, শিশু ধর্ষণের শিকার হয় ৮ জন, গণধর্ষনের শিকার হয় ৩ জন ও ধষৃণের পর হত্যা করা হয় ৪ জনকে। মার্চে সেনানিবাসের ভেতর কলেজ ছাত্রী তণুকে দর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটে ।
ফেব্রুয়ারিতে ধর্ষণের শিকার ২৫ জন এদের মধ্যে ৭ জন নারী, গণধর্ষণের শিকার হয় ৬ জন ও ধর্ষনের পর হত্যা করা হয় ৩ জনকে। ফেব্রয়ারিতে ৯ জন শিশুধর্ষিত হয়। পিরোজপুরে শিরিন আক্তার নামের এক কলেজ ছাত্রীকে ধর্ষনের পর হত্যা করা করে দুর্বৃত্তরা।
জানুয়ারী মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৮ জন নারী,গণধর্ষণের শিকার হয় ৪ জন ও ধর্ষনের পর হত্যা করা হয় ১ জনকে।

ক্রস ফায়ারে নিহত ঃ বিগত তিন মাসে ক্রস ফায়ারে মৃত্যু হয় ২৭ জনের ।
মার্চ মাসে কথিত ক্রস ফায়ারের নামে মৃত্যু হয় ৮জনের, এর মধ্যে পুলিশের ক্রস ফায়ারে নিহত হয় ৩ জন , র‌্যাব কর্তৃক ৫জন ।
জানুয়ারি মাসে ক্রস ফায়ারের নামে মৃত্যু হয় ৬ জনের, এর মধ্যে পুলিশের ক্রস ফায়ারে নিহত হয় ৪ জন , র‌্যাব কর্তৃক ১ জন ও অন্যান্য বাহিনী কর্তৃক ১ জন।
ফেব্রুয়ারি মাসে কথিত ক্রস ফায়ারের নামে মৃত্যু হয় ১৩ জনের, এর মধ্যে পুলিশের ক্রস ফায়ারে নিহত হয় ৩ জন , র‌্যাব কর্তৃক ৮ জন ও অন্যান্য বাহিনী কর্তৃক ২ জন।

আত্মহত্যা ঃ তিন মাসে আত্মহত্যা করেছে ১১৩ জন । এদের মধ্যে ২৫জন পুরুষ ও ৮৮ জন নারী।এর মধ্যে ঢাকাতেই আত্মহত্যা করে ৪৩ জন নারী। বাকী ঘটনাগুলো ঘটে বারশাল, রাজশাহী, খুলনা ও রংপুরে । জানুয়ারিতে আত্মহত্যা করে ৭জন পুরুষ ও ২৬ জন নারী।
ফেব্রুযারিতে আত্মহত্যা করে ২৯ জন নারী ও ৭ জন পুরুষ। পারিবারিক দ্বন্দ্ব, প্রেমে ব্যর্থতা ও যৌন হয়রানীর কারণে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।

খুন ঃ তিন মাসে সন্ত্রাসী কর্তৃক নিহত ২১৪ জন ও আহত হয় ২৭৫ জন।
মার্চে নিহত হয় ৭৪ জন ও আহত হয় ৬৯ জন।
জানুয়ারিতে দেশে সন্ত্রাসী কর্তৃক নিহত ৬৭ জন ও আহত হয় ৭৩ জন। তুচ্ছ ঘটনায় খুনের ঘটনা বেড়ে গেছে অনেক। ১১ জানুয়ারী প্রাইভেটকার ভাড়া করে গ্রামের বাড়ি গিয়ে টাকা না দিয়ে চালককে হত্যা করে পালায় তিন যুবক। কেরানীগঞ্জে হিন্দুদের এক মেলায় সন্ত্রাসীদের ছুরিকাঘাতে ঝনাটুদাস নামে এক যুবক নিহত হয়।
ফেব্রুয়ারীতে সারা দেশে সন্ত্রাসী কর্তৃক নিহত ৭৩ জন ও আহত হয় ১৪২ জন। ২১ ফেব্রুয়ারি পঞ্চগড়ে মঠ পূজারীকে নৃশংসভাবে জবাই করে হত্যা করা হয়। সিলেটে সন্ত্রাসী কর্তৃক আহত হন এক সাংবাদিক।

সামাজিক অসন্তোষঃ প্রলম্বিত বিচার পদ্ধতি, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব এই সবকিছু মিলেই দেশের আপামর জনসাধারনের মানসিক ও মানবিক চিন্তা চেতনার অবক্ষয়ের কারনে বেড়ে গেছে সামাজিক অসোন্তুষ আর এই সামাজিক অসন্তোষের শিকার হয়ে বিগত তিন মাসে নিহত হয়েছেন ৬৭জন ,আহত হয়েছে ২০২৬ জন। জানুয়ারীতে মৃত্যু হয়েছে ১৮ জনের এবং আহত হয়েছেন ৩৫৭ জন। বিভিন্ন কারনে সামাজিক অসন্তোষের শিকার হয়ে ফেব্রুয়ারিতে নিহত হয়েছেন ৩১ জন এবং আহত হয়েছেন ৬৩২ জন। বেশীর ভাগ ঘটনাই ঘটেছে জমি জমা , দুই গ্রামের খেলা নিয়ে সংঘর্ষ বা তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে।

রাজনৈতিক সহিংসতা ঃ রাজনৈতিক সহিংসতায় তিন মাসে আহত হয়েছে ৩৯৯ জন ও নিহত হয়েছে ১০ জন। বেড়ে গেছে রাজনৈতিক অন্তঃকোন্দলে আহতের সংখ্যা । জানুয়ারেিত পৌর নির্বাচন, আধিপত্য বিস্তার, টেন্ডার বানিজ্য, এলাকা দখল, চাঁদাবাজী নিয়নন্ত্রন ও ক্ষমতার দাপট প্রদর্শনের জন্য আওয়ামী লীগের অন্তঃকোন্দলে আহত ১৭৫ জন বিএনপির অন্তঃ কোন্দলে আহত হয় ৩০ জন। মার্চে ইউপি নির্বাচন সংঘর্ষে আহত হয় ১৭৩৬ জন ও নিহত হয় ২৪ জন।

তাছাড়া মাদকের প্রভাবে বিভিন্ন ভাবে নিহতের সংখ্যা ১৩ জন, আহত হয় ১৮ জন। তাছাড়া পানিতে ডুবে, অসাবধানবসত, বিদ্যুৎপৃস্ট হয়ে তিন মাসে মৃত্যুবরন করেছে ১৩২ জন। চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় মৃত্যু হয় ১৩ জনের। বিরোধী রাজনৈতিক দলকে নিয়ন্ত্রনের জন্য রাজনৈতিক অজুহাতে তিন মাসে ১৪৫৭ গনগ্রেফতার হয়েছে ।

বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা মনে করে বিদ্যমান মানবাধিকার লংঘন অব্যাহত থাকলে একদিকে যেমন দেশের অগ্রগতি ব্যাহত হবে অন্যদিকে সুশাসন প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গিকার তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে । আইনের সঠিক প্রয়োগ,অপরাধিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, নৈতিক অবক্ষয় রোধে বিভিন্ন পর্যায়ে কাউন্সিলিং, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর দক্ষতা বিষয়ক প্রশিক্ষন, ভালো কাজের জন্য পুরষ্কার, বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম ইক্যাদির মাধ্যমে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব বলে মনে করে সংস্থাটি।

২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত মানবাধিকার লংঘনের ঘটনার চিত্র :
মানবাধিকার পরিস্থিতির
ক্র নং বিষয় জানুয়ারি ফেব্রুয়ারী মার্চ
১ গণগ্রেফতার ৬৩২ ৭২৫ ১০০
২ এসিড নিক্ষেপে আহত ২ ৪ ০
৩ সন্ত্রাসী কর্তৃক আহত ৭৩ ১৪২ ৫৯
৪ সন্ত্রাসী কর্তৃক নিহত ৬৭ ৭৩ ৭৪
৫ বিএসএফ কর্তৃক নির্যাতনে আহত ৩ ২ ০
৬ বিএসএফ এর গুলিতে নিহত ৩ ১ ১
৭ বিএসএফ কতৃর্ক অপহরণ ৩ ৪ ০
৮ আহত (পারিবারিক কলহ) ১২ ৬৯ ১৪
৯ নিহত (পারিবারিক কলহ) ২৫ ২৮ ১৪
১০ যৌতুকের কারণে হত্যা ৫ ৬ ৬
১১ যৌতুকের জন্য নির্যাতন ৯ ২৩ ৯
১২ সামাজিক সহিংসতায় নিহত ১৮ ৩১ ১৮
১৩ সামাজিক সহিংসতায় আহত ৩৫৭ ৬৩২ ১০৩৭
১৪ গণপিটুনিতে নিহত ১ ৮ ৬
১৫ গণপিটুনিতে আহত ১৫ ৭ ২
১৬ বোমা হামলায় নিহত ০ ০ ০
১৭ বোমা হামলায় আহত ০ ১ ০
১৮ সাংবাদিক নির্যাতন আহত ১ ৬ ৯
১৯ সাংবাদিক নির্যাতন নিহত ৩ ০ ০
২০ নিখোঁজ ১২ ১২ ৩
২১ নারী ধর্ষণ ৮ ৭ ১০
২২ ধর্ষণের পর হত্যা (নারী) ১ ৩ ৪
২৩ শিশু ধর্ষণ ১ ৯ ১০
২৪ গণধর্ষণ (নারী) ৪ ৬ ৩
২৫ সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ১৬৪ ১৮২ ১৫৬
২৬ সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ৫৬৮ ৫৪২ ৩২৩
২৭ র‌্যাবের- পুলিশের সঙ্গে বন্দ–ক য–দ্ধে নিহত ৬ ১৩ ৭
২৮ চিকিৎসকের অবহেলায় মৃত্যু ২ ৬ ৫
২৯ লাশ উদ্ধার (নারী) ৩ ৫ ২
৩০ লাশ উদ্ধার (পুরুষ) ১২ ৫ ৩
৩১ রাজনৈতিক সহিংসতায় আহত ১৭৪ ১৭২ ৫৩
৩২ রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৪ ২ ৪
৩৩ গৃহপরিচারিকা নির্যাতনে আহত ০ ৭ ২
৩৪ গৃহপরিচারিকা নির্যাতনে নিহত ০ ৩ ৬
৩৫ অপহরণ (নারী) ১ ৩ ৫
৩৬ অপহরণ (পুরুষ) ২ ১
৩৭ আত্মহত্যা(পুরুষ) ৭ ৭ ১১
৩৮ আত্মহত্যা(নারী) ২৬ ২৯ ৩৩
৩৯ শিশু হত্যা ও নির্যাতন ৮৩
৪০ মাাদকের কারনে নিহত ৯ ১ ৩
৪১ মাদকের কারনে আহত ১২ ৬ ০
৪২ ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় মৃত্যু ২ ৬ ৫

বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা ৭০ ধরনের মানবাধিকার লংঘনের ঘটনার তথ্য সংরক্ষণ করে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ৪২ ঘটনার গত তিন মাসের তুলনামূলক চিত্র উপরে উল্লেখ করা হয়েছে।

(তথ্য সুত্রঃ জানুয়ারী থেকে মার্চ, ২০১৬ মাসে দেশে প্রকাশিত বিভিন্ন দৈনিক পত্র-পত্রিকা এবং সংস্থার বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও পৌরসভা শাখার মাধ্যমে সংগৃহিত তথ্য। এর বাইরেও মানবাধিকার লংঘন জনিত কিছু ঘটনা থাকতে পারে যা আমাদের সীমাবদ্ধতার কারনে সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি)