‘তাদের ওপর আল্লাহর গজব পড়ুক’

প্রকাশ:| বৃহস্পতিবার, ২৮ মে , ২০১৫ সময় ০৭:১৬ অপরাহ্ণ

shah alamরাঙ্গুনীয়ার শিলক ইউনিয়নে ১৩ বছর বয়সী এক দরিদ্র বাবার শিশুকন্যাকে ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত ৫৫ বছর বয়সী ‘সমাজপতি’ শাহ আলম নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ভিকটিমের জন্য উল্টো আল্লাহর ‘গজব’ কামনা করেছেন। নিজেকে নির্দোষ ও ব্রেইন স্ট্রোকের রোগী দাবির পাশাপাশি স্থানীয় রাজনীতির ষড়যন্ত্রের শিকার বলেও দাবি করেন দেশজুড়ে আলোচিত এই শিশু ‘ধষর্ণকারী’।

বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রাম আদালতে শাহ আলম এসব দাবি করেন।

বুধবার রাতে আটকের পর বৃহস্পতিবার দুপুর ৩টা ২০ মিনিটে চট্টগ্রাম সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কুদরত-ই-এলাহীর আদালতে হাজির করে তিন দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। আদালতের হাজতখানা থেকে আদালতের কাঠগড়ায় যাওয়ার পথে ও কাটগড়ায় দাঁড়ানো অবস্থায় শাহ আলমের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের।

কেন এই ঘটনা করলেন চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাকে শত্রুতা করে এসবে জড়িয়েছে। আমি একাজ করিনি, নির্দোষ। স্থানীয় রাজনীতির শিকার হয়েছি। অমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হয়েছে।’

তবে কারা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে তা জানতে চাইলে কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ থাকেন শাহ আলম।

একটু পরে তিনিআবার বলেন, ‘আমি নির্দোষ। যারা এমন করেছে আল্লাহ তাদের বিচার করবে। তাদের ওপর আল্লাহর গজব নাজিল হোক। বাবা, গত দেড় বছর ধরে আমি ব্রেইন স্ট্রোকের রোগী।’

গুজব ছিল, গত সোমবার দুপুরে এ ঘটনায় উচ্চ আদালত থেকে শাহ আলমকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেয়ার পর পুলিশ রাতেই নগরী থেকে তাকে গ্রেপ্তার করেছিল। তবে বিষয়টি বরাবরই অস্বীকার করেছিলেন পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা। যদিও গতকাল ১১টার সময় শাহ আলমকে নগরীর আন্দরকিল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন পুলিশ সুপার এম হাফিজ আক্তার।

আসলে পুলিশ কখন গ্রেপ্তার করেছিল? তা জানতে চাইলে শাহ আলম বলেন, ‘কই আমাকে তো পুলিশ গ্রেপ্তার করেনি। ঘটনার বিষয় নিয়ে জানতে আমিই পুলিশের সাথে দেখা করতে এসপি অফিসে গিয়েছিলাম। এরপর পুলিশ আমাকে আটক করে বলে জানায়।’

তবে কেন দেখা করতে গিয়েছেন সেটি তিনি খোলাসা করেননি। খবর নিয়ে জানা গেছে, গতকাল বুধবার থেকে অভিযুক্ত রাঙ্গুনীয়া থানার ওসি হুমায়ূন কবীর ও শিলক তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ এসআই মজিবুর রহমানকে নাসিরাবাদ জেলা এসপি অফিসে ডেকে পাঠানো হয়েছিল। হয়তো বিকেলে ওসির ফোন পেয়ে সেখানে গিয়েছিলেন অভিযুক্ত শাহ আলম। তবে এনিয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য কিংব তথ্য পাওয়া যায়নি।

প্রসঙ্গত, গত সোমবার ব্যারিস্টার জ্যোর্তিময় বড়ুয়া হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করলে সোমবার শুনানি শেষে সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের বিচারকরা অভিযুক্ত শাহ আলমকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে এ ঘটনাটি কেন বে-আইনি হবে না এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেয়া হবে না সে বিষয়ে ১০ জনের বিরেুদ্ধে রুল জারি করেন। রিট আবেদনে অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলামেইল২৪ডটকম ও ডেইলি ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকার প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয়া হয়।

এছাড়া গত সোমবার শিশু ধর্ষক সমাজপতি শাহ আলমের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেছেন ভিকটিমের মা নুর নাহার বেগম। চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক মীর শফিকুল আলম মামলাটি এজাহার হিসেবে গ্রহণ করে ব্যবস্থা নিতে রাঙ্গুনিয়া থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন।

মামলার এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন-অভিযুক্ত শাহ আলম ধর্ষিত শিশুটির প্রতিবেশী এবং দুঃসম্পর্কের দাদা হয়। সেই সূত্রে আসামীর অনুরোধে ধর্ষিত শিশুটি তার বাড়ীতে কাজ করতো এবং রাতের বেলায়ও ধর্ষিতাকে নাতনি উল্লেখ করে নিজের রুমে রেখে দিতেন। বাদীর সরলতার সুযোগে শিশুটিকে ফুঁসলিয়ে গত ছয় মাস যাবৎ ধর্ষণ করে আসছিল আসামী শাহ আলম। ফলে শিশুটি চার মাসের গর্ভবতী হয়ে পড়লে বাদী অর্থ্যাৎ মা নুর নাহার বেগম শাহ আলম কর্তৃক ধর্ষণের বিষয়টি মেয়ের কাছ থেকে জানতে পারেন।

পরবর্তীতে বাদী নুর নাহার বিষয়টি আসামী শাহ আলমের কাছে জানতে চাইলে কাউকে এসব কথা না বলে শিশুটির গর্ভপাত করানোর নির্দেশ দিয়ে হাতে কিছু টাকা গুঁজে দেন। আসামীর কথা মত বাদীও স্থানীয় একটি হাসপাতালে শিশুটির গর্ভপাত করান। এনিয়ে গত ৮ মে রাঙ্গুনীয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে হাজির হয়ে আসামী শাহ আলমের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ দায়ের করলে সেই শাহ আলমকে আটক করে পুলিশ। পরবর্তীতে রাত ২টায় রাঙ্গুনিয়া থানার ওসি হুমায়ূন কবির, এস আই মজিবুর রহমান মিলে রাঙ্গুনীয়া উপজেলা চেয়ারম্যান আলী শাহ’র গাড়ীতে করে আসামী শাহ আলমকে থানা থেকে বের করে নিরাপদ স্থানে পাঠিয়ে দেয়।

একপর্যায়ে বাদী নুর নাহার বেগম আসামী শাহ আলমের বিরুদ্ধে থানায় যে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন গত ৯ মে সেই অভিযোগটি ছিড়ে শাহ আলমের নাম বাদ দিয়ে উল্টো ধর্ষিতার ১৫ বছর বয়সী ছেলেকে বোনের ধর্ষণকারী সাজিয়ে করা মামলায় তাদের মা নুর নাহার বেগমের স্বাক্ষর নেয়া হয়। ওই মিথ্যা মামলার ওপর ভিত্তি করে ভিকটিমের ভাইকে আদালতের মাধ্যমে জেলে প্রেরণ করে পুলিশ। এসময় বাদীকে আসামী ও পুলিশ আশ্বাস দেয় যে, তার ছেলে সফুরকে এক সপ্তাহের মধ্যে তাদের নিজ খরচে ছাড়িয়ে আনবে। পুলিশ ও আসামীর উপর্যপুরি হুমকিতে ভীত হয়ে নিজ বোনকে ধর্ষণের দায় মাথায় নিয়ে জেলের বাসিন্দা হয় ১৫ বছর বয়সী বড় ভাই সফুর। এমনকি তাদের প্রভাবের কারণে ধর্ষিতা শিশুটি ও ভাই সফুর ১৬৪ ধারা ও ২২ ধারায় আদালতে জবানবন্দিও প্রদান করে। এঘটনার প্রতিকার চেয়ে আদালতের সরানাপন্ন হন বলে উল্লেখ করেন বাদী নুর নাহার বেগম। মামলায় মোট ৬ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। এরমধ্যে বাদী নিজে ছাড়াও ভিকটিম, মাহমুদুল হাসান, আব্দুল কাদের, আলমগীর, গিয়াস উদ্দিনকে সাক্ষী করা হয়েছে। । তাদের প্রত্যেকের বাড়ী মিনা গাজীর টিলা, শিলক, রাঙ্গুনিয়া।

উল্লেখ্য, চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার শিলক ইউনিয়নে ১৩ বছর বয়সী দরিদ্র পিতার এক শিশুর ধর্ষণকারীকে বাঁচাতে ধর্ষিতার ১৫ বছর বয়সী আপন ভাইকেই ধর্ষক সাজিয়ে জেলে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। একাজে রাঙ্গুনিয়া থানা পুলিশের তিন কর্মকর্তা ও সরকার সমর্থিত প্রভাবশালী একজন জনপ্রতিনিধির প্রত্যক্ষ মদদ দেয়া ও ভিকটিমের পরিবারসহ প্রশাসনকে বিপুল অংকের টাকা ঘুষ দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সৌজন্যে- বাংলামেইল