ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিত মানুষের বস্তি

প্রকাশ:| সোমবার, ১৪ ডিসেম্বর , ২০১৫ সময় ১১:১৬ অপরাহ্ণ

অতীতের সোনালি দিনগুলোর কথা স্মরণ করে বিশিষ্ট সাহিত্যিক, এমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিত মানুষের বস্তিতে পরিণত হচ্ছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিত মানুষের বস্তিতিনি বলেন, ‘আমরা সমস্যার গভীরে প্রবেশ করতে পারিনি বলেই বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী নির্যাতন, হত্যা, ছাত্র-শিক্ষকের সমন্বয়হীনতাসহ অসংখ্য অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে। আর এসবের কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা শিক্ষিত মানুষের বস্তিতে পরিণত হচ্ছে।’

সোমবার বিকেলে বাংলা একাডেমি আয়োজিত ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস’ পালন অনুষ্ঠানে একক বক্তৃতায় সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এ কথা বলেন।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত ইতিহাস আমাদের সবার জানা। ছাত্র সংসদ ছাড়া পৃথিবীতে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বিশ্ববিদ্যালয় বলা যায় কি না সে বিষয়ে প্রশ্ন আছে। বাস্তবতা হলো দুই দশক ধরে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নেই।’

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘একাত্তরে যেসব বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়েছিল তারা সরকার পক্ষের নয়, জনগণের পক্ষের মানুষ ছিলেন। সমকালীন উপযুক্ত সিদ্ধান্তে ভুল না করায় এর যে শক্তি তা উপলব্ধি করতে পেরেছিল পাকিস্তানিরা। আর সে কারণেই দেশকে পঙ্গু করার অভিপ্রায়ে প্রাণে শেষ করে দেয় এ দেশের বুদ্ধিজীবীদের।’

বর্তমান বুদ্ধিজীবীদের চিন্তার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘একাত্তরে যেসব বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছে তারা ছিলেন মনে-প্রাণে দেশপ্রেমিক। সঙ্কটে ও সম্ভাবনায় তারা জনগণের পক্ষে ছিলেন। কিন্তু আজ এ সঙ্কটে দেশের অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী জনগণের বিপক্ষে অবস্থান করছেন।’

সর্বক্ষেত্রে দেশের স্বপ্ন ব্যর্থ হয়েছে মন্তব্য করে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আমরা কোনো কিছুর গভীরে প্রবেশ করতে চাই না। না শিক্ষায়, না সাহিত্যে, না রাজনীতিতে। ফলে সর্বক্ষেত্রে আমার আমাদের স্বপ্ন ব্যর্থ হয়েছে। পরিণামে বিকাশ ঘটেছে পুঁজিবাদের। আর এর যে ফল তা তো প্রতিদিনই দেখতে পাচ্ছি।’

বাংলা একাডেমির বানান সংস্কারের বিষয়ে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘অযাচিতভাবে বাংলা একাডেমির বানানের দীর্ঘ-রীতিকে হত্যা করা হলো। যেসব বানানে দীর্ঘ-ঈ কার ছিল তার ৭০ ভাগ হ্রস্ব-ই কার হয়ে গেছে। এমনকি আইন তৈরি করে বাংলা একাডেমি বানান পরিবর্তন করে করা হয়েছে। এসবের কোনো দরকার ছিল না। সকলের মনে রাখা দরকার অভিধান ভাষা তৈরি করে না বরং ভাষাই অভিধান তৈরি করে।’

গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আমরা যে আশার আলো দেখেছিলাম তার মধ্যে একটি ছিল গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন। ভেবেছিলাম এটির মাধ্যমে দেশের নাটক প্রান্তিকে ছড়িয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে কী হল? নাটকে বাঙালি ও বাংলাদেশের যাপিত জীবন নিয়ে এ আন্দোলন প্রান্তিকে পৌঁছাল না। কারণ, এখানেও গভীরে প্রবেশের অভাব।’

বর্তমান সঙ্কটের কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সমাজে বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে, শিক্ষা বিভাজিত হয়েছে, রাজনীতিতে ধর্মের আশঙ্কজনক অপব্যবহার হয়েছে, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে অস্বাভাবিক শূন্যতা।’

বর্তমান সঙ্কট উত্তরণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বর্তমান সঙ্কট উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো সমাজ বিবর্তন। সে বিবর্তনে কেবল ধনিক শ্রেণিকে গুরুত্ব না দিয়ে বিপুল সংখ্যক দরিদ্র শ্রেণির মানুষের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে।’

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক আহমদ কবির, কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক, লেখক শান্তনু কায়সার প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ড. তানভির আহমেদ সিডনী।

এর আগে সকালে একাডেমির পক্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বুদ্ধিজীবী সমাধি, মিরপুরস্থ শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ এবং রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়।

বাংলা একাডেমির শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে এমিরেটাস অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ দাশের কবিতার অংশ নিয়ে কোলাজ আবৃত্তি করেন কাজী মদিনা। মুনীর চৌধুরীকে লেখা আবু হেনা মোস্তফা কামালের খোলা চিঠি পাঠ করে শোনান নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার।