ডুবে গেছে বোরো ও পাটের জমি

প্রকাশ:| রবিবার, ৭ মে , ২০১৭ সময় ১১:৫৫ অপরাহ্ণ

পাবনা শহরের বৃষ্টির পানি নামে গাজনা বিলে। এখানে প্রচলিত কথা ‘বৃষ্টি হয় পাবনায়, বিল ভরে গাজনায়’। সম্প্রতি প্রবল বৃষ্টি হয়েছে। সেই পানি গাজনা বিলে আটকে গেছে। গাজনার বিলের পানির আরেক উৎস যমুনা নদী। যমুনার পানি বাদাই নদ দিয়ে গাজনায় আসে। বাঁধেরহাট-সুজানগর সড়কের (মুজিব বাঁধ বলে পরিচিত) সাগরকান্দি গ্রামে বাদাই নদের ওপরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্লুইসগেট। এই স্লুইসগেট খোলা থাকায় আকস্মিক বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে বিলের ১ হাজার ৩০০ হেক্টর বোরো ধান ও প্রায় দুই হাজার হেক্টরের পাট। যমুনার পানি গাজনায় প্রবেশ করে সাধারণত আষাঢ় মাসের শেষ দিকে। এবার বাদাই নদের¬স্লুইসগেট দিয়ে আগাম পানি এসেছে।

জেলার সুজানগর উপজেলার সবচেয়ে বড় বিল অঞ্চল গাজনার বিল। প্রায় ১২ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই বিলে আবাদি জামির পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার হেক্টর। আকস্মিক বন্যায় তলিয়ে গেছে বিশাল এলাকার আধা পাকা বোরো ধান এবং সপ্তাহ দু-এক আগে লাগানো পাটের জমি। ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে কৃষকের।
গাজনারবিল এলাকার চাষি নবী শেখ। তিনি এবার ১০ বিঘা জামিতে বোরো চাষ করেছিলেন। অতিবৃষ্টি আর বিলে অকালবন্যায় ফলন ভালো হয়নি। পুষ্ট হওয়ার আগেই ধান কেটে নিতে হচ্ছে। বিঘাপ্রতি প্রায় চার হাজার টাকা ক্ষতি হবে তাঁর।

আজ গাজনার বিলে গিয়ে দেখা স্লুইসগেটের ছয় কপাটের ভেতরে প্রথম ও ষষ্ঠটি নষ্ট। বাদাই নদ যমুনার সঙ্গে সংযুক্ত। হঠাৎ যমুনায় পানি বেড়েছে। সেই চাপে এই¬স্লুইসগেট দিয়ে পানি ঢুকে পড়েছে বিশাল গাজনা বিলে। প্রায় এক থেকে দেড় ফুট পানিতে সয়লাব হয়ে গেছে প্রায় গোটা বিল।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়া বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুর হামলা বলেছেন, এক সপ্তাহ আগে যমুনায় আকস্মিকভাবে পানি বাড়ে। যমুনার পানি বাদাই নদ নিয়ে গাজনার বিলে আসে। বাদাই নদের মুখে যে স্লুইসগেট ছিল তার একটি জলকপাট বিকল থাকায় সেদিক দিয়ে পানি বিলে প্রবেশ করে। গত শনিবার সেটি বন্ধ করা হয়েছে। এখন বিলের পানির উচ্চতার চেয়ে যমুনায় পানির উচ্চতা বেশি বলে কপাট বন্ধ রাখা হয়েছে। যমুনার পানির উচ্চতা না কমলে কপাট খুলে বিলের পানি বের করা যাবে না।

সুজানগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মঈনুল হক সরকার জানান, এবার গাজনার বিল এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছিল। রোগবালাইয়ের প্রকোপ তেমন ছিল না। তবে মৌসুমের মাঝে যখন ধানের ‘থোড়’ অর্থাৎ শিষ বের হয়, তখন প্রবল ঝড়-বৃষ্টি হওয়ায় পরাগায়ন ভালো হয়নি বলে শিষে চিটার পরিমাণ অন্যান্য বছরের চেয়ে বেড়েছে। আর কাটার আগে আকস্মিক বন্যাতেও কিছু ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া গাজনার বিলে সাত হাজার হেক্টরে পাট চাষ হয়েছে। এর বেশ কিছু জমি জলমগ্ন হয়েছে। তবে ধান-পাটের ক্ষতির পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।

কৃষকেরা জানিয়েছেন, গত সপ্তাহে বাদাই নদের স্লুইসগেট দিয়ে যমুনার জোয়ারের পনি ঢুকে গাজনার বিল সয়লাব হয়ে যায়। ধান কাটার ঠিক সপ্তাহ দু-এক আগে এই আকস্মিক দুর্যোগে ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ধান পুরোপুরি পাকেনি। এই ধান মাঠ থেকে কেটে আনতে প্রচণ্ড দুর্ভোগ হচ্ছে।
আজ রোববার গাজনার বিলের বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, পানি নামছে না। প্রায় এক থেকে দেড় ফুট পানির জমেছে ফসলের মাঠে। তার ওপরে কোনো রকমে ধানগাছের মাথা জেগে আছে। হাঁটুপানিতে নেমে কৃষক ও দিনমজুরেরা ধান কাটছেন। সেই ধানের আঁটি নৌকায় বা মহিষের গাড়িতে আনা হচ্ছে বিলের ভেতরের রাস্তায়। সেখান থেকে ভটভটি বা মহিষের গাড়িতে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন কৃষকেরা। কর্দমাক্ত রাস্তায় প্রায়ই আটকে যাচ্ছে মহিষের গাড়িগুলো। কেউ কেউ রাস্তার পাশেই ধানের আঁটি ¯স্তূপ করে রেখেছেন। পানিতে ডোবা ধান দ্রুত বাড়িতে নিয়ে রোদে শুকাতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন বিল এলাকার শিশু থেকে বয়স্ক ব্যক্তিরা।

এখানে সবচেয়ে বড় সংকট ধান কাটার দিনমজুরের। আহম্মদপুর ইউনিয়নের চরবোয়ালিয়ার চাঁদ বললেন, এক সপ্তাহ আগেও দিনমুজরি ছিল ৩৫০ টাকা। এখন ৭০০ টাকাতেও দিনমজুর পাওয়া যাচ্ছে না। ধানের ফলন যেখানে বিঘাপ্রতি ২৫ মণ হওয়ার কথা সেখানে হচ্ছে ১২ থেকে সর্বোচ্চ ১৫ মণ। ফলে বিঘাপ্রতি তাদের প্রায় চার হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে।

ধানের পাশাপাশি গাজনার বিলে বন্যায় পাটেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিলের দুলাই ইউনিয়নের চিনাখড়া গ্রামের জামাল শেখ সোনাপানির খাপালে চার বিঘায় পাট চাষ করেছেন। তার দেড় বিঘা পানিতে ডুবুডুবু। এই পাট আর হবে না।