সুরমান আলীর কোটি টাকার মুচলেকায় জামিন

প্রকাশ:| বৃহস্পতিবার, ৬ জুন , ২০১৩ সময় ০২:৫১ অপরাহ্ণ

অস্ত্রোপচারের পর শরীর থেকে নিডল (সূচ) বের করতে ভুলে যাওয়া ডা. মো. সুরমান আলীকে ১০ জুন পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিয়েছেন চট্টগ্রামের একটি আদালত।

ভবিষ্যতে যেকোন রোগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার অঙ্গীকারনামাদেয়ার শর্তে এবং এক কোটি টাকার মুচলেকায় আইনজীবীর জিম্মায় তাকে জামিন দেন আদালত। এসময় আদালত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ধর্মঘট প্রত্যাহারের বিষয়টিও বিবেচনায় নেন।
বৃহস্পতিবার দুপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে তুমুল হট্টগোলের মধ্যে প্রায় দেড় ঘণ্টার শুনানি শেষে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ এস এম মুজিবুর রহমান আদেশ দিয়েছেন। এসময় ডা. সুরমান আলীর ভুল চিকিৎসার বর্ণণা দিতে গিয়ে রোগী আমিনুলের মা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তার বর্ণনা শুনে স্তম্ভিত হয়ে যান বিচারকও।
জামিন শুনানির সময় অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. সুরমান আলী আদালতে উপস্থিত ছিলেন। চট্টগ্রাম বারের অর্ধশতাধিক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জামিন শুনানিতে তার পক্ষে অংশ নেন। এছাড়া বিএমএ নেতাসহ বেশ কয়েকজন চিকিৎসকও আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
বৃহস্পতিবার বেলা ১২টা ২৫ মিনিটে জামিন শুনানির শুরুতে বাদিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী আদালতের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের পর অভিযোগ গঠন হবে, এরপর বিচার হবে এটাই নিয়ম। অভিযোগপত্র দাখিলের পর মিস মামলা করে জামিন প্রার্থনার সুযোগ নেই।
বাদিপক্ষে অ্যাডভোকেট নিতাই প্রসাদ ঘোষ বলেন, “ডা.সুরমান আলীর কারণে একটি সুস্থ ছেলে পঙ্গু হতে বসেছেন। উনি গুরুতর অপরাধ করেছেন। উনার বিচার এবং কঠোর শাস্তি হওয়া উচিৎ। উনি ঘটনার জন্য তো ভুল স্বীকার করেননি, ‍উল্টো ধর্মঘট করে আদালতের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছেন।
শুনানিতে অংশ নিয়ে আসামীপক্ষে অ্যাডভোকেট ইব্রাহিম হোসেন চৌধুরী বাবুল বলেন, “ডাক্তারের বিরুদ্ধে যে ধারায় মামলা করা হয়েছে, সেই ধারায় মামলা চলতে পারেনা। দন্ডবিধির ৩২৬ ধারা এক্ষেত্রে প্রয়োগ হতে পারেনা।
এসময় আদালতে উপস্থিত চট্টগ্রাম মহানগর পিপি অ্যাডভোকেট কামালউদ্দিন আহমেদও ৩২৬ ধারায় মামলা চলতে পারে না বলে মত দিলে তুমুল হইচই শুরু হয়। বাদিপক্ষে উপস্থিত আইনজীবীরাশেম, শেমবলে চিৎকার করতে থাকেন এবং এক পর্যায়ে আদালত কক্ষ ত্যাগ করতে চান।
এসময় বিচারক পিপিকে প্রশ্ন করেন, আপনি এখানে কার পক্ষে কথা বলছেন? পিপি বলেন, “আমি আইনের ব্যাখা বলছি।
এরপর আরও কিছুক্ষণ বাদি আসামিপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে হট্টগোল চলে। এর এক পর্যায়ে বিচারক বাদি দেলোয়ারা বেগমের বক্তব্য শুনতে চান আদালত। তিনি চিকিৎসার শুরু থেকে আদ্যোপান্ত ঘটনা আদালতের কাছে বর্ণণা করেন।
এক পর্যায়ে বাদি দেলোয়ারা বেগম কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “সব অপারেশন সবসময় সাকসেসফুল হয়না একটা, দুটা ভুল হতেই পারে। কিন্তু উনি যদি সেই ভুল স্বীকার করতেন তাহলেও তো মনে শান্তি পেতাম। উল্টো তিনি আমাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করেছেন।
তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আমার ছেলেকে এই ডাক্তার পঙ্গু করে দিয়েছে। তাকে প্যাম্পার্স পড়ে থাকতে হয়। আমি এই ডাক্তারের শাস্তি চাই। কোনভাবেই তার জামিন হতে পারেনা।
এসময় আদালতের ডক থেকে আসামী ডা.সুরমানআলীকে সামনে এজলাসের সামনে ডেকে নেন বিচারক। তিনি আসামীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আপনি কি বাদির বক্তব্য শুনেছেন?”

সুরমান আলী হ্যাঁসূচক উত্তর দিলে বিচারক বলেন, “আপনি কি ঘটনার জন্য অনুতপ্ত ? ভবিষ্যতে কি আরও সতর্কভাবে রোগীকে চিকিৎসা দেবেন ?’ সুরমান আলী এসময় হ্যাঁসূচক মাথা নাড়েন। বিচারক বলেন, ‘আপনাকে লিখিত অঙ্গীকারনামা দিতে হবে।
এরপর বাদিপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, “আমরা ক্ষতিপূরণ চাই। এজন্য দুদিনের সময় দেয়া হোক। আর চিকিৎসকরা ধর্মঘট ডেকে আদালতের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছেন। তারা ধর্মঘট প্রত্যাহার করুক। তারপর জামিনের বিষয়টি আদালত বিবেচনায় নিলে সেটি সঠিক সিদ্ধান্ত হবে।
কিন্তু আসামীপক্ষের আইনজীবীরা আপোষের বিরোধিতা করলে এবং লিখিত অঙ্গীকারনামা দেয়ার বিরোধিতা করেন। এসময় আরও কয়েক দফা দুপক্ষে হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। তবে এর মধ্যে বিএমএ নেতা ডা.ফয়সাল ইকবাল আদালতকে ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে জানান।
এরপর আদালত ধর্মঘট প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়ার কথা বলে লিখিত অঙ্গীকারনামা দেয়ার শর্তে এবং এক কোটি টাকার মুচলেকায় আইনজীবীর জিম্মায় জামিন দেনউল্লেখ্য ২০১২ সালের ৩০ মে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আমিনুল ইসলামের মলদ্বারের অপারেশন করার সময় শরীরের ভেতর নিডেল রেখে দেন দুচিকিৎসক।
এরা হলেন, চমেক হাসপাতালের ল্যাপরোস্কোপিক, কলোরেক্টাল জেনারেল সার্জন ডা.মো.সুরমান আলী এবং বেসরকারী ল্যানসেট ডায়াগনস্টিক এন্ড রিসার্স সেণ্টারের চিকিৎসক ডা.জাকির হোসেন।
অপারেশনের পর থেকে আমিনুল প্রচন্ড ব্যথায় ভুগতে থাকেন। আমিনুল চিকিৎসককে জানান, তার মনে হচ্ছে অপারেশনের স্থানে কিছু একটি রয়ে গেছে। একথা শোনার পর চিকিৎসক আরও দুদদফা অপারেশনের নামে তার সঙ্গে প্রতারণা করেন। এসব অপারেশনে তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। যন্ত্রণা তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে।
এরপর তাকে চিকিৎসার জন্য ভারতের কোলকাতায় এ্যাপোলো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। গত বছরের ৩০ জুন এ্যপোলো হাসপাতালের কনসালটেন্ট রেডিওলজিস্ট ডা.দেবাশীষ দত্ত তার অস্ত্রোপচার করে তার আগের অপারেশনের স্থান থেকে নিডেল বের করেন।
ঘটনায় গত ২৮ জানুয়ারি মহানগর হাকিম আদালতে দুদচিকিৎসকের বিরুদ্ধে দন্ডবিধির ২৬৯, ২৭০, ৩২৬, ৪২০ ৩৪ ধারায় আমিনুলের মা দেলোয়ারা বেগম অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগ দায়েরের পর মহানগর হাকিম আলী মনছুর অভিযোগটিকে সরাসরি মামলা হিসেবে গ্রহণের জন্য পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন।
মামলার আসামী হিসেবে দুচিকিৎসক প্রথমে হাইকোর্ট থেকে দুসপ্তাহের জামিন নেন। এরপর গত ১৪ মার্চ চট্টগ্রাম মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে আত্মসমর্পণ করে মামলার অভিযোগপত্র দাখিল না হওয়া পর্যন্ত জামিন নেন।
গত ৩০ মে পাঁচলাইশ থানার এস আই রহুল আমিন আদালতে দুচিকিৎসককে আসামী করে অভিযোগপত্র জমা দেন। গত সোমবার মামলার নির্ধারিত দিনে অভিযোগপত্রটি মহানগর হাকিম নূরে আলম ভূঁইয়ার কাছে দাখিল করা হয়।
আগে দেয়া জামিনের শর্ত অনুযায়ী সুরমান আলী অভিযোগপত্র দাখিলের সময় গত জুন আদালতে আত্মসমর্পণ করলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠান। অপর আসামী ডা.জাকির হোসেন আগে থেকেই উচ্চ আদালতের জামিনে আছেন।
ডা.সুরমান আলীকে কারাগারে পাঠানোর প্রতিবাদে জুন বিকেল থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু করেন চট্টগ্রামের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। বৃহস্পতিবার জামিন শুনানির সময় বিএমএ তাদের ধর্মঘটপ্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়