ডাবের কদর

প্রকাশ:| শুক্রবার, ২৫ এপ্রিল , ২০১৪ সময় ১১:০৪ অপরাহ্ণ

ডাবউপকূলীয় অঞ্চলে উত্পাদিত ডাবের কদর বেশি। এখানকার ডাব নৌ ও স্থলপথে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করে পাইকাররা।

উপজেলার সেউতিবাড়ীয়া গ্রামের ডাবের পাইকার টুলু জানান, পাইকারীভাবে ১০ থেকে ১৫ টাকা দরে বিক্রি হয় প্রতিটি ডাব।

কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার প্রায় ১৫০ হেক্টর জমিতে নারিকেলের চাষ হয়। এখানকার চাষিরা স্থানীয় জাতের নারিকেলের চাষ বেশি করে থাকেন। স্থানীয় জাতের প্রতিটি ডাবে প্রায় ৪০০ গ্রাম পানি হয়ে থাকে। এ অঞ্চলের উত্পাদিত মোট নারিকেলের ৭০ ভাগ ডাব হিসেবে ব্যবহূত হয়।

উপজেলা কৃষি অফিসার অমিতাভ মন্ডল জানান, এ উপজেলায় নারিকেলের উত্পাদন বেশ ভাল। অধিকাংশ চাষি ডাব আকারে তাদের নারিকেল বিক্রি করে লাভবান হচ্ছেন। আমরা নারিকেলের উত্পাদন বৃদ্ধির জন্য চাষিদের বছরে দু’বার সার প্রয়োগ এবং গাছ পরিষ্কার রাখার পরামর্শ দিয়ে থাকি।

ডাবের উপকারিতা অনেক
ডাব আমাদের সকলের কাছে প্রিয় একটি নাম। রোগীর পথ্য ছাড়াও দৈনন্দিন জীবনে নিজে পান করা, পরিবার পরিজনকে ডাবের পানি পান করানো বাঙালীর স্বভাব। কোমল পানীয় থেকে ডাবের স্বাদের পাশাপাশি উপকারিতাও অনেক। তাই অতিথি অপ্যায়নে ডাবের জুড়ি নেই। শরবতের পরিবর্তে, গাছের তাজা ডাব ছিড়ে এনে পানি পরিবেশন করার রীতি বহু দিনের। বৈশাখের প্রচ- দাবদাহে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ডাবে চুমুক দেয়ার দৃশ্যও অহরহ। তবে ডাবের স্বাদ বিভিন্ন রকমের। এ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট কৃষিবিদদের মতে ডাবের বয়স, জাত এবং এলাকাভিত্তিক ডাবের পানির স্বাদও আলাদা হয়ে থাকে। আবহাওয়ার উপরও অনেকটা রিলেটেট। তবে স্বাদ যাই হোক ডাবের পানির গুনাগুন প্রায় সমান। শ্বেতি ডাবের পানি অপেক্ষাকৃত বেশি মিষ্টি। গাজর রংরের ডাবেও পানিও সুস্বাধু। কমলা রঙের ডাবের পানিও ভিন্ন রকমের স্বাদ রয়েছে। মুন্সীগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় এই ভিন্ন রকমের ডাব দেখা যায়। ডাব ফুড বা ফল হিসাবেই পরিগণিত। খাবার স্যালাইনের পরিবর্তেও ডাব পান করা যায়। দুধের পরেই এর অবস্থান। শিশু মায়ের দুধ না পেলে ডাবের পানি পান করালে অনেকটা পুষিয়ে নেয়া সম্ভব।
ডাবের গুণাগুণ ॥ ডাবের পানি হচ্ছে- মায়ের দুধের কাছাকাছি। পেটের দুধের চেয়ে বেশি গুণ রয়েছে ডাবে। খাদ্য ছাড়াও শরীরে অনেক প্রটেকশনের কাজ করে ডাবের পানি। জাদুকরের মতো কাজ করে। অসুস্থ ব্যক্তি ডাবের পানি পান করলে সহজে অনুধাবন করতে পারেন। ক্লান্ত অবস্থায় একটি ডাব পানের পর বোঝা যাবে- ডাব কত বেশি কার্যকর। এছাড়া ¯œায়ুবিক দুর্বলতা দূর করে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে। পরীক্ষার্থীর জন্য ডাব মহাওষুধ। ডাব নিয়ে তাই কবিতা প্রবন্ধ ছাড়াও রয়েছে জনপ্রিয় গান, “কঁচি ডাবের পানি…”। মানব জীবনে ডাব শুধু এত উপকারীই নয়, ডাব গাছ দেশের ভাগ্য বদলাতে পারে। ডাবের সোফা প্রসিংয়ের মাধ্যমে শক্তিশালী সাদা রঙের রশিও তৈরি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। বেট কুশন, গাড়ির সিটের পরিবেশ বান্ধব গদি। এই ডাব-নারিকেল সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নাজিরুল ইসলাম এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ডাবের ব্যবহার ॥ দেশে বছরে প্রায় ১০০ মিলিয়ন (১০ কোটি) ডাব বা নারিকেল হয়ে থাকে। এর ৪০ শতাংশ ডাব হিসাবে ব্যবহার হয়। নারিকেল তেল করার জন্য ব্যবহার হয় মাত্র ৯ শতাংশ। ১২ থেকে ১৩ শতাংশ নারিকেল বেশি পেকে যাওয়ার কারণে বীজ হিসাবে ব্যবহার হয়ে থাকে। বাডশ নারকেল পিঠাপুলিসহ নানা কাজে ব্যবহার হয়, সরাসরি ফল হিসাবে বা রান্নার উপকরণ হিসাবে ব্যবহার হয়। নারকেল বা ডাব খাওয়া যায় ৬৫ শতাংশ। বাডশ ৩৫ শতাংশ আইচা ও নারিকেলের খোসা অব্যবহৃত থেকে যায়। খাওয়া অংশ থেকে পাঁচগুণ বেশি আয় করা সম্ভব এই অব্যবহৃত অংশ দিয়ে। বরিশালের স্বরূপকাঠির ইন্দোর হাট, সোহাগদল, বালিয়ারিসহ পার্শ¦বর্তী ৮/১০টি গ্রামের আড়াই থেকে ৩ হাজার পরিবার এই অব্যবহৃত অংশ দিয়ে জীবন নির্বাহ করে থাকেন। তারা দড়ি. পাপাস ও আশ তৈরি করে বাজারজাত করেন। নারিকেল ফুলের ডাটা দিয়ে বিভিন্ন ধরনের পেন্সিলদানী কমলদানী। ইন্দোনেশিয়ায় নারিকেল গাছের ফুল ফোটার আগেই থোরাগুলো দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখে আস্তে আস্তে কাটে আর রশ বের করে। এই রশের গুড় ডায়াবেটিকস রোগীর জন্য উপযোগী গুড়। সুস্বাধু ও সুগন্ধি এই গুড়ের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এছাড়া নারিকেলের ছাড়াটি অতি মূল্যবান। এটি রোদ বৃষ্টিতে ক্ষতি হয় না, পানিতে পচে না দীর্ঘস্থায়ী হয়। তাই বিভিন্ন দেশে ইলেক্ট্রিক বাল্পের ওপর শেড হিসাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
ডাবের রকমফের ॥ সাধারণত লম্বা জাতের ডাব গাছের সংখ্যাই আমাদের দেশে বেশি। বাণিজ্যিকভাবেও লম্বা জাতের ডাবই সর্বত্র। শৌখিনভাবে হাতে গোনা কিছু খাটো জাতের ডাব গাছ রয়েছে। খাটো জাত থেকে চারা করা কঠিন তাই এর বিস্তারও খুব কম। তবে লম্বা জাতের মধ্যেও বিভিন্ন ধরনের ডাব গাছ রয়েছে। বারি নারকেল-১ এবং বারি নারকেল-২ নামের দু’টি জাত রয়েছে। এই জাত থেকে বীব করা যায় না। এরোমেটিক-সুগন্ধি ডাবও রয়েছে কোথাও কোথাও, তবে এই জাত সংগ্রহ করার ব্যাপারে কৃষি বিভাগ কার্যকর ভূমিকা নিতে পারেনি। ৪০ স্কায়ার কিলোমিটার পরপর আবহাওয়াগত প্রভাব পরিলক্ষতি হয়। গাছের ফলের মধ্যে তারতম্য হয়ে থাকে। পরিবেশের সঙ্গে জেনেটিক পরিবর্তন আসে। সেই অনুযায়ী ৫৬টি ভাগ রয়েছে এই দেশে। সে কারণে দক্ষিণাঞ্চলের জাত অন্য এলাকায় রোপন করলে সেই রূপ ফলন হয় না। তাই স্থানীয় জাতকেই সম্প্রসারণ করতে হবে। তবে নির্দিষ্টভাবে ডাবের প্রকার বলা না গেলেও স্থানীয়ভাবে ১০/১২ রকমের ডাব বা নারিকেল দেখা যায় বলে বিশেষজ্ঞগণ মত প্রকাশ করেছেন। ডাবের বয়স এবং জাতের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী স্বাদের তারতম্য হয়।
দেশের চেহারা বদলে দিতে পারে ॥ দিন বদলে বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে ডাব বা নারকেল গাছ। দেশে ৩০ হাজার মেট্টিক টন তেলের চাহিদা রয়েছে। যার বিপরীতে দেশে মাত্র ৫ হাজার মে. টন তেল উদপাদন হয়ে থাকে। এছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নারিকেল তেল রান্নার কাজে ব্যবহার হয়ে থাকে। যা স্বাস্থের জন্যও খুবই উপকারী। প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে নারিকেলের গন্ধও থাকে না। রান্নায়ও সুস্বাধু। দক্ষিণাঞ্চলসহ দেশে নারিকেল চাষের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই ২০ মিলিয়ন ( দুই কোটি) ডাব গাছ রোপণ করা সম্ভব। পরবর্তী ১০ বছরেই নারিকেল উৎপাদন হবে ১২ লাখ টন। তাতে নারিকেল উৎপাদনকারী দেশ হিসাবে বাংলাদেশের স্থান হবে ৪র্থ থেকে ৫ম অবস্থানে। তেল আমাদানিতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে অন্তত ৩৪ হাজার কোটি টাকা। ব্যাপক কর্ম সংস্থান সৃষ্টি ছাড়াও এই খাতে বিনিয়োগ দেশের চেহারা বদলে দেবে অতি সহজে।
যশোরের চাচরা আঁশ তৈরির আধুনিক কারখানা রয়েছে। এখানে নারকেলের সোফা সাদা আঁশ ও আশের দড়ি তৈরি হয়। মামরুমের জীবাণু (স্পোর) দিয়ে তুষ পচিয়ে উন্নতমানের জৈব সার তৈরি হচ্ছে। যা চাষীদের কাছে জনপ্রিয় সার। এসব তথ্য দিয়ে বরিশাল রহমতপুরের আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্রের প্রিন্সিপাল সাইন্টেফিক কর্মকর্তা ড. নাজিরুল ইসলাম আরও জানান, দেশীয় প্রচেষ্টায় নারিকেল গাছ লাগানো গেলে দেশের অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন অবশাম্ভী। ফিলিপিন্স, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়া নারিকেল উৎপাদন করে তাদের অর্থনীতিতে পরিবর্তন এনেছে। বিশেষজ্ঞরা জানান, এই দেশে নারিকেলের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। ইউএনডিপিসহ আন্তর্জাতিক পুনবাসন সংস্থাসহ দাতা সংস্থাগুলো এই বিষয়ে সাহায্য সহযোগিতা করতে পারেন।
উৎপাদন ॥ দেশে বর্তমানে প্রায় ৫ মিলিয়ন (৫০ লাখ) ডাব গাছ রয়েছে। এগুলো থেকে বছরে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১০০ মিলিয়ন (১০ কোটি) ডাব বা নারিকেল। গাছপ্রতি গড় উৎপাদন উৎপাদন ২০টি। তবে বরিশাল, পটুয়াখালী, নেয়াখারী, লক্ষ্মীপুর, বাগেরহাট, যশোর, পিরোজপুর ও খুলনা এলাকায় ৮০ শতাংশ নারিকেল বা ডাব উৎপাদন হয়। গড় উৎপাদন ১শ’র বেশি। নাটোর, শেরপুর ও জামালপুর এলাকায়ও ডাবের একটি সম্ভাবনাময় এলাকা রয়েছে। শেরপুর শহরে এমন গাছও রয়েছে বছরে ৪/৫ শ’ নারকেল বা ডাব হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে এগুলোকে হাজারী নারকেল বলা হয়। কক্সবাজারের রামুতে ন্যাচারাল হাইব্রিট দিয়ে একটি নারিকেল বাগান করা হয় ১৯৮২ সালে। কিন্তু বাগানটিরও যাথাযথ সংরক্ষণ হচ্ছে না।
বারি’র (বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট) ওয়েবসাইডে দেখা যায়, বিভিন্ন আবহাওয়ায় চাষ উপযোগী ১২/১৩টি গবেষণা কেন্দ্রে জাত সংগ্রহ করা আছে। সেগুলো কার্যকরভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে না।
মুন্সীগঞ্জের ডাব ॥ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের দেয়া তথ্যানুযায়ী এই জেলায় ৬১ হাজার ৯শ’ ৫৫টি ডাব গাছ রয়েছে। তবে কি পরিমাণ ডাব এই জেলায় উৎপাদন হয় তার সঠিক পরিসংখ্যান স্থানীয় কৃষি বিভাগে সংরক্ষণ নেই। নদী বেষ্টিত এই জেলায় ডাবের স্বাদের দিক থেকে ভিন্ন। অনেক জেলা থেকেই এই জেলার ডাব সুস্বাধু। তাই রাজধানী ঢাকায় মুন্সীগঞ্জ তথা বিক্রমপুরের ডাবের চাহিদা বেশি। গোলাকৃতির এখানকার ডাবে পানিও বেশি। এই জেলায় শ্বেতি ডাব, গাজর রঙের এবং কমলা রঙের ডাবও রয়েছে বলে কৃষি বিভাগ জানায়। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ পরিচালক মোঃ হাবিবুর রহমান উপজেলা কৃষি অফিসগুলো থেকে পরিসংখ্যান নিয়ে ডাব গাছের এই সংখ্যা নিশ্চিত করে বলেন, এই জেলায় ডাবের উৎপাদন ভাল। মুন্সীগঞ্জের ডাব চাষী হিরু মিয়া জানান, নারকেলের চেয়ে ডাবের ব্যবহার অন্য এলাকার চেয়ে বেশি। নারিকেলের চেয়ে ডাবের দামও বেশি। তাই গাছে বেশিদিন রেখে নারিকেল না বানিয়ে কঁচি অবস্থায় ডাব বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। ডাব ব্যবসায়ীরা আগাম গাছ কিনে নিচ্ছে। এখানে খুচরা বাজারে একটি ডাবের দাম এখন ৩০ টাকা। গাছ থেকে কেনা হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ টাকায়।