‘ট্যাং ফল’ চাষ এখন বাংলাদেশে

প্রকাশ:| শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারি , ২০১৪ সময় ০৮:৫৭ অপরাহ্ণ

ট্যাং ফলবাংলাদেশে চাষ হচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল ও ফিলিপাইনের জনপ্রিয় ফল প্যাশন বা ট্যাং। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) জার্মপ্লাজম সেন্টারের পরিচালক ও উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এ রহিম পুষ্টিনিরাপত্তার নতুন এ সম্ভাবনাময় ফলের বাংলাদেশে চাষপদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন।

প্রাকৃতিক গুণসমৃদ্ধ এ ফলের শরবত খেলে মানুষের শরীরের ক্ষতিকারক কোলেস্টেরল কমার পাশাপাশি দ্রুত ক্লান্তিও দূর হয়। চর্মরোগ থেকেও মুক্তি পাওয়া যায়।

অধ্যাপক এম এ রহিম জানান, বাণিজ্যিক প্রজাতির প্যাশন ফলের উৎপত্তি হয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার ‘রেইনফরেস্ট’-এর আমাজান অঞ্চলে। বিশেষ করে ব্রাজিল এবং তদসংলগ্ন প্যারাগুয়ে ও উত্তর আর্জেন্টিনায়।

তিনি জানান, ‘প্যাশন ফল একটি বহুবর্ষজীবী লতাজাতীয় উদ্ভিদ। প্যাশন ফল দুই ধরনের। পার্পল প্যাশন ফল (Passiflora edulis) ও হলুদ প্যাশন ফল (Passiflora edulis var flavicarpa)

পার্পল প্যাশন ফল থেকে প্রাকৃতিক মিউটেশনের মাধ্যমে হলুদ প্যাশন ফল উৎপত্তি হয়েছে, যা আকারে ও গুণাগুণে মাতৃ পার্পল প্যাশন ফল থেকে উন্নত।

ড. রহিম বলেন, পাঁচ পাপড়িসমৃদ্ধ প্যাশন ফলের ফুল অত্যন্ত আকর্ষণীয়, মনোমুগ্ধকর, দৃষ্টিনন্দন ও সুগন্ধিযুক্ত। দেখতে অনেকটা ঝুমকোলতার ফুলের মতো। ফুলপ্রেমী একজন মানুষ এ ফুলকে দেখে হাত দিয়ে স্পর্শ না করে বা তার গন্ধ না নিলে যেন তার তৃপ্তিই মেটে না।

গবেষকরা জানান, বাংলাদেশের দুর্গম পাহাড়ি এলাকার হলুদ প্যাশন বা ট্যাং ফলের চাষের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে এবং এটি একটি অত্যন্ত লাভজনক ফসল হিসেবে পরিচিতিও লাভ করেছে। তবে বাংলাদেশের আবহাওয়ায় প্রায় সব জায়গায়ই এ ফলের চাষ করা সম্ভব।

ইতিমধ্যে মাগুরার হাজিপুর গ্রামের তরিকুল ইসলাম ও জাহিদুল ইসলাম নামের দুই ভাই তাদের বাড়িতে পরীক্ষামূলকভাবে এ ফল চাষ করেছেন। ইন্টারনেটের মাধ্যমে এ দুই ভাই তথ্য সংগ্রহ করে বাকৃবির অধ্যাপক ড. এম এ রহিমের কাছ থেকে চারা এনে এ ফল চাষ করে সফলতাও পেয়েছেন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মপ্লাজম সেন্টারের গবেষণা সহযোগী কৃষিবিদ শামসুল আলম মিঠু জানান, ট্রপিক্যাল ও সাব-ট্রপিক্যাল দেশে এ ফল অত্যন্ত জনপ্রিয়। প্যাশন ফলের বীজকে আবৃত করে থাকা হলুদ, জিলাটিনাস, সুগন্ধিযুক্ত পাল্পকে পানিতে দ্রবীভূত করে খুবই উপাদেয় শরবত প্রস্তুত করা যায়। এটিকে অন্যান্য জুসের সঙ্গেও মিশ্রিত করে খাওয়া যায়। পাল্পকে প্রক্রিয়াজাতকরণ করে আইসক্রিম, জুস, স্কোয়াশ, জ্যাম ও জেলি তৈরি করা যায়। ফ্রেশ ফল হিসেবেও খাওয়া যায়।

তিনি জানান, বীজ ও খোসা থেকে পেকটিন ও উচ্চমাত্রায় লিনোলিক অ্যাসিডসমৃদ্ধ তেল আহরণ করা সম্ভব। ফলের আকার দৈর্ঘ্যে ৪ থেকে ৭ সেন্টিমিটার ও প্রস্থে ৪ থেকে ৬ সেন্টিমিটার। পাল্প ও জুসের রং হলুদ এবং টিএসএস ১০-১৪%।

শামসুল আলম মিঠু আরো বলেন, প্যাশন ফলে বছরে দুবার ফল পাওয়া যায়। প্রথমবার মার্চ-এপ্রিল মাসে ফুল আসে এবং জুন-আগস্ট মাসে ফল পাওয়া যায়। দ্বিতীয়বার জুলাই-আগস্ট মাসে ফুল আসে এবং ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে ফল পাওয়া যায়। গাছ লাগানোর ১৪-২০ মাসের মধ্যেই ফল পাওয়া যায়। ১৮-২০ মাস বয়সের একটি গাছে ১০০-২০০টি ফল পাওয়া যায় অর্থাৎ গাছপ্রতি ফলন ৫-১০ কেজি।

অধ্যাপক ড. এম এ রহিম জানান, ট্যাং চাষে কোনো সার, সেচ, কীটনাশক এমনকি পরিচর্যারও প্রয়োজন হয় না। শুধু শিম বা লাউ-কুমড়া গাছের মতো মাটিতে চারা লাগানোর পর তা বড় হলে বাঁশের মাচায় অথবা বড় গাছে উঠিয়ে দিলেই হয়।

তিনি বলেন, বাজারে প্রচলিত কেমিক্যালমিশ্রিত শরবতের চেয়ে প্যাশন বা ট্যাং ফল দিয়ে তৈরি শরবত অনেক বেশি সুস্বাদু ও প্রাকৃতিক গুণসম্পন্ন।