টেস্ট ক্যাপ তো নয়, মুড়িমুড়কি!

প্রকাশ:| রবিবার, ৭ সেপ্টেম্বর , ২০১৪ সময় ০৩:০৪ অপরাহ্ণ

টেস্ট ক্যাপ লাগবে টেস্ট ক্যাপ? নেবেন নাকি টেস্ট ক্যাপ?
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে কি কখনো কখনো আপনার ফেরিওয়ালা মনে হয়? কাবুলিওয়ালার মতো বেঢপ ঢাউস একটা কাপড়ের পুঁটলি নিয়ে পথে পথে ঘোরা এক ফেরিওয়ালা। যে কিনা টেস্ট ক্যাপ ফেরি করে ফিরছে পথে পথে। একদম পানির দরে!
অথচ টেস্ট ক্যাপ অমূল্য, পবিত্র একটা জিনিস বলেই ক্রিকেটীয় সংস্কৃতির মধ্যে পড়ে। ক্রিকেটারদের আজন্ম আরাধ্য স্বপ্ন হয়ে থাকে একটা টেস্ট ক্যাপ। প্রথম ক্যাপটা পেতে কী ভীষণ লড়াই করতে হয় একজন ক্রিকেটারকে, পেরিয়ে আসতে হয় কত হার্ডল, কত পথ। তবেই না স্বপ্নপূরণ!
নিজের প্রথম ব্যাগি গ্রিন ক্যাপটা মলিন, টুটে-ফুটে যাওয়ার পরও কী পরম মমতাতেই না পরতেন স্টিভ ওয়াহ। রিকি পন্টিংকে তাঁর সেই শৈশবেই দাদি জন্মদিনে একটা ব্যাগি গ্রিন টুপি উপহার দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমাদের রিকি একদিন অস্ট্রেলিয়ার হয়ে টেস্ট খেলবে।’
টেস্ট অভিষেকের সময় অভিষিক্ত ক্রিকেটারটির মাথায় যখন টেস্ট ক্যাপ পরিয়ে দেওয়া হয়, কী এক আবেগঘন দৃশ্যেরই না জন্ম হয়! সাধারণত ক্যাপটি তুলে দেন সেই দেশের কিংবদন্তিতুল্য সাবেক তারকাদের কেউ। এ যেন পূর্বসূরির হাত থেকে দেশের পতাকা উত্তরসূরির হাতে সমর্পিত হওয়া।
কিন্তু বাংলাদেশ? বাংলাদেশে টেস্ট ক্যাপ বিলানো হয় অকাতরে। বাংলাদেশের মতো টেস্ট ক্যাপ পৃথিবীর আর কোনো দেশে এতটা সহজলভ্য নয়। টেস্ট আঙ্গিনায় ১৪ বছরে ৮৪টি টেস্টে বাংলাদেশের হয়ে অভিষেক হয়েছে ৭৩ জন খেলোয়াড়ের। প্রতিবছর বাংলাদেশ গড়ে ছয়টি করে টেস্ট খেলেছে। প্রতিবছর বাংলাদেশে গড়ে প্রায় ছয়জন করে খেলোয়াড়ও টেস্ট ক্যাপ পেয়েছেন।
বাংলাদেশের টেস্ট ম্যাচ আর টেস্ট খেলোয়াড়ের সংখ্যা প্রায় সমান। এবং এই হার দিনকে দিন বাড়ছে। সর্বশেষ ১৫ টেস্টে বাংলাদেশের হয়ে টেস্ট অভিষেক হয়েছে ১২ জনের!
যেখানে শ্রীলঙ্কা ৩২ বছরে ২৩৬ টেস্ট খেলে টেস্ট ক্যাপ দিয়েছে ১২৭ জনকে। পাকিস্তানের হয়ে ৬২ বছরে ৩৮৭ টেস্টে অভিষেক হয়েছে ২১৭ জনের। ভারতের হয়ে ৮২ বছরে ৪৮৫ টেস্টে খেলেছেন ২৮২ জন।
সমস্যা হলো, একে তো বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের কাঠামো দুর্বল, প্রতিদ্বন্দ্বিতাও হয় না তেমন, তার ওপর সেই ঘরোয়া ক্রিকেটে খুব বেশি খেলার অভিজ্ঞতা না থাকার পরেও বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের নামিয়ে দেওয়া হয় টেস্ট ক্রিকেটে। কুয়োর ব্যাঙকে মহা সমুদ্রে নিয়ে গিয়ে ফেলা। ঘরোয়া ক্রিকেটের আগুনে পুড়ে পুড়ে খাঁটি সোনা হয়ে ওঠার আগেই, দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার আগেই বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যান বা বোলারদের মুখোমুখি হওয়ার পরীক্ষায় নামিয়ে দেওয়া।
এ যেন হাঁটতে শেখার আগেই কোনো শিশুকে পানিতে নামিয়ে দিয়ে বলা, সাঁতরাও। কিংবা স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার দৌড়ে ফার্স্ট হওয়া ছেলেটিকে বলা, নাও, এবার উসাইন বোল্টের সঙ্গে দৌড়াও।
স্কিলের সঙ্গে ফিটনেসও একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। শুধু কঠোর অনুশীলনে আর জিম করলে ফিটনেস বাড়ে না। ক্রিকেটে সব সময়ই বলা হয়, ম্যাচ খেলার চেয়ে বড় অনুশীলন আর নেই। চার দিনের ম্যাচ খেলে খেলে পাঁচ দিনের টেস্ট খেলার ধকল নেওয়ার যোগ্যতাও অর্জন করতে হয় ক্রিকেটারদের। সেই সৌভাগ্যও বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের হয় না।
মাত্র ৩৪টি ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচ খেলা শুভাগতকে নামিয়ে দেওয়া হলো এই টেস্টে। শুভাগত তবু ‘অভিজ্ঞ’, তাইজুল যে খেলেছেন তাঁরও অর্ধেক, ১৮টি প্রথম শ্রেণীর ম্যাচ! এ কারণেই টেস্ট অভিষেকে বা শুরুর দিকে ভালো করে নজর কাড়লেও সেই খেলোয়াড়টি দ্রুতই হারিয়ে যান। ফর্ম হারান। ফিটনেস হারান।
শুরুতে প্রতিপক্ষের কাছে খেলোয়াড়টি অচেনা থাকে। তাঁকে নিয়ে ভিডিও বিশ্লেষণ করার সুযোগ থাকে না প্রতিপক্ষ কোচের। কিন্তু এক-দুটো ম্যাচ খেলার পরই তাঁকে নিয়ে কাটা-ছেঁড়া চলে। পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ। বের হয়ে আসে শক্তি আর দুর্বল দিকগুলো। ফলে প্রথম বা দ্বিতীয় টেস্টে বা সিরিজে পারফর্ম করা যত সহজ, ততই কঠিন এরপর পারফর্ম করা। কারণ আপনার দুর্বল আর শক্তির জায়গাগুলো প্রতিপক্ষের কাছে আর অজানা থাকবে না।
এখানেই একজন ভালো আর একজন গ্রেট খেলোয়াড়ের পার্থক্য। সাকিব আল হাসানের শক্তি আর দুর্বলতার জায়গা কি প্রতিপক্ষ জানে না? তার পরও সাকিব ধারাবাহিক। কারণ তিনিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের দুর্বলতাই শুধু কাটিয়ে ওঠেন না, শক্তির দিকটা আরও শক্তিশালী করে তোলেন।
আফসোস, বাংলাদেশের একটাই সাকিব। ফলে মোটের ওপর যেটা হয়, নতুনরা দ্রুত হারিয়ে যান। তাঁদের শূন্যতা পূরণে আবার নতুনদের দিকে হাত বাড়াতে হয়। সেই নতুনরাও একসময় হারিয়ে যান…। এই চক্র চলতে থাকে। এ যেন কী ভীষণ অভিশপ্ত এক দুষ্টচক্র!
আর তাই বিসিবিকেই ফেরিওয়ালার সাজে নামতে হয় পথে। হাঁক দিতে হয়—টেস্ট ক্যাপ লাগবে টেস্ট ক্যাপ!


আরোও সংবাদ