ঝুঁকির মধ্যে চট্টগ্রামের অর্ধেকের বেশী স্থাপনা

প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ৫ মে , ২০১৫ সময় ১১:৪৮ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রামের আড়াই লাখ স্থাপনার মধ্যে প্রায় দেড়লাখ স্থাপনা ভূমিকম্প ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম।
ঝুঁকির মধ্যে চট্টগ্রামের অর্ধেকের বেশী স্থাপনা
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স মিলনায়তনে আয়োজিত ‘আর্থকোয়াক রিস্ক ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি এ কথা জানান।

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘বাংলাদেশ বড় ধরনের ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। ৮দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ব্যাপক প্রাণহানির পাশাপাশি ৬শ কোটি ডলারের ক্ষতির মুখে পড়বে দেশ। এছাড়া চট্টগ্রামের আড়াই লাখ স্থাপনার মধ্যে প্রায় দেড়লাখ স্থাপনা ভূমিকম্প ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর, বিমানবন্দর, তেল পরিশোধানাগার ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘ভারত-মিয়ানমার ও বাংলাদেশ অংশের প্লেটটি এখনো সক্রিয় এবং তা ক্রমে অগ্রসর হচ্ছে। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, রাজশাহীর তানোর, কুমিল্লা, চট্টগ্রামের ডুবরী, সীতাকুণ্ড, সিলেটের শাহজীবাজার ও রাঙামাটির বরকলে আটটি ভূতাত্ত্বিক চ্যুতি বা ফল্ট জোন সচল অবস্থায় রয়েছে। বুয়েটের গবেষণায় দেশে বড় ধরনের ভূমিকম্প ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে।’

চুয়েটের ভিসি বলেন, ‘নেপালে ভূমিকম্পের পর আমার ঘুম আসছে না। আমাদের এখানে হলে কি হবে। নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে আমরা একসাথে কাজ করেছি। নেপাল সফরের সময় সেখানকার বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে আমরা বলেছি ভবনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ। এগুলো ঝুঁকিমুক্ত করা দরকার। তারা আমাদের কথায় কান দেয়নি। ভূমিকম্প মানুষ মারে না, অপরিকল্পিত নির্মাণের ফলেই মানুষ মারা যায়।’

চট্টগ্রাম বন্দর ও ইপিজেড এলাকা ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘৮দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হলে চট্টগ্রাম বন্দর ও ইপিজেডের মারাত্নক ক্ষতি হবে। বন্দরের সিসমিক সমীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কর্তৃপক্ষকে বার বার চিঠি দিয়েছি কিন্তু তারা কোন ব্যবস্থা নেয়নি। ভ’মিকম্পে চট্টগ্রাম বন্দরের ক্ষতি হলে অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে আসবে।’

চট্টগ্রামের ঝুঁকিপূর্ণ স্কুল ভবন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘৮দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্পে চট্টগ্রামের এক হাজার ৩৩টি স্কুল ভবনের মধ্যে ৭৩৯টি ধ্বংস হয়ে যাবে। নেপালে ভ’মিকম্পে স্কুল ভবনগুলোর তেমন ক্ষতি হয়নি। স্কুলে কোন শিক্ষার্থীই মারা যায়নি। কারণ তারা স্কুল ভবনগুলোকে ভূমিকম্পের ঝুঁকিমুক্ত করে তোলেছে। এজন্য আমাদের স্কুলগুলোকে আমরা ঝুঁকিমুক্ত করে তোলতে পারি।’

চুয়েট ভিসি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘ভূমিকম্পে ঘর ভেঙে যাতে মানুষ মারা না যায় সেজন্য সচেতন হতে হবে। স্থাপনা নির্মাণে অধিক সচেতন হতে হবে। ভূমিকম্পের ঝুঁকিমুক্ত করতে সব ধরনের প্রযুক্তিই আমাদের আছে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রিপেয়ার করা যায়।’

তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভবনটি মোটামুটি ভাল থাকলেও নগরীর অনেক হসপিটাল করা হয়েছে পুরনো ভবন ভাড়া নিয়ে। এছাড়া অনেক নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান খরচ কমানোর জন্য সঠিকভাবে ভবন নির্মাণ করে না। মানুষের জীবন নিয়ে যেন ব্যবসা না হয়, এটা অন্যায় হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘নেপাল একটি সুসজ্জিত দেশ। ভূমিকম্পে সব লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। ভূমিকম্পে তাদের লাইফলাইন ভেঙে গেছে। একটি দুর্গত মুহুর্তে লাইফলাইন ভেঙে গেলে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়ে। তাই যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ লাইন, গ্যাস লাইন ও পানির লাইনসহ পুরো লাইফলাইন যাতে সচল থাকে সেদিকে সবার নজর দিতে হবে। চট্টগ্রামে ১৩টি বৈদ্যুতিক সাব স্টেশন আছে। এগুলোর কোনটার কিছু হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে।’

তিনি বলেন, ‘নেপালে ভূমিকম্পের পর দেখা গেছে হেলে পড়া ভবনের পাশে সোজা হয়ে একটি ভবন দাঁড়িয়ে আছে। কারণ সোজা দাঁড়িয়ে থাকা ভবনটি ভূমিকম্প প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিয়েছিল। তেমন আমাদেরও প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে হবে। সবাইকে আওয়াজ তোলতে হবে। শুধু নিজের ভবনটি ঠিক থাকলে হবে না। আশপাশের ভবনগুলো ঠিক আছে কিনা সেটাও দেখতে হবে।’

বিল্ডিং কোড মেনে সঠিকভাবে ভবন নির্মাণ করা হলে প্রাণহানি হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নগরীর পাথরঘাট, আন্দরকিল্লা, ফিরিঙ্গিবাজার, আলকরণ এলাকায় অনেক পুরনো ভবন আছে। এসব ভবন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। যথাযথভাবে ভবন নির্মাণ করা হলে ভূমিকম্পে ভবনের কিছুটা ক্ষতি হবে। তবে প্রাণহানি হবে না। ভবনের যে ক্ষতি হবে তা সহজেই ঠিক করা যাবে।’

তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার যাওয়ার পথে অনেক মাটির বাড়ি দেখা যায়। শক্তিশালী ভূমিকম্পে এসব বাড়ি ধ্বংস হয়ে যাবে। শহরে ভবন বানাতে অনেকে ইঞ্জিনিয়ারের কাছে গেলেও গ্রামের ভবনগুলো এমনিতেই গড়ে উঠে। ভূমিকম্প হলে এতে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটবে। সবাইকে এ বিষয়ে সচেতন করতে আমাকে বললে আমি যেকোন জায়গায় যাব।’

চুয়েট ভিসি বলেন, ‘৮দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হলে চট্টগ্রামের ১ লক্ষ ৬৮ হাজার ভবন ধ্বংস হয়ে যাবে। রাত ২টার দিকে ভূকম্পন হলে ১লাখ ৩৭ হাজার লোক মারা পড়বে। দিনের বেলা হলে ৭৩ হাজার লোক মারা যাবে। ১৭ মিলিয়ন টন আবর্জনা হবে। যা সরাতে ৬লাখ ৮০ হাজার ট্রাকের প্রয়োজন পড়বে। পুরো দেশেই বিপর্যয় নেমে আসবে। তাই ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতি রোধে সমন্বিত পরিকল্পনা গড়ে তোলা প্রয়োজন।’

ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন, বাংলাদেশ চট্টগ্রাম কেন্দ্রের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মানজারে খুরশীদ আলমের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন- আইইবির ভাইস চেয়ারম্যান এম এ রশীদ, সাদেক মো. চৌধুরী।

আইইবি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী উদয় শেখর দত্তের সঞ্চালনায় সেমিনারে চুয়েটের প্রো-ভিসি প্রফেসর মো. রফিকুল আলম ও প্রকৌশলী মো. দেলোয়ার হোসেন মজুমদারসহ চুয়েটের শিক্ষক ও প্রকৌশলীরা উপস্থিত ছিলেন।