শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জসমূহ: শীর্ষক মত বিনিময় সভা

প্রকাশ:| শনিবার, ২৫ নভেম্বর , ২০১৭ সময় ১০:৩০ অপরাহ্ণ

শিক্ষা পৃথিবী জুড়ে মানুষের মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃত। শিক্ষা মানুষের ব্যক্তিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত উন্নয়নের সাথে সংযুক্ত, তাই বর্তমান বিশ্বে শিক্ষা মানবিক ও বস্তুগত উন্নয়নের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত।
‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’-এর পূর্বে স্বাধীন বাংলাদেশে আরো ছয়টি কমিশন/কমিটি রিপোর্ট ঘোষিত হয়েছিল। এগুলো হলো: বাংলাদেশ শিক্ষা কমিশন (ড. কুদরত-ই-খুদা) রিপোর্ট ১৯৭৪, অন্তবর্তীকালীন শিক্ষানীতি (কাজী জাফর-আবদুল বাতেন প্রণীত) ১৯৭৯, মজিদখান কমিশন রিপোর্ট ১৯৮৩, মফিজউদ্দিন শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট ১৯৮৭, জাতীয় শিক্ষানীতি ২০০০ ও জাতীয় শিক্ষা কমিশন (মনিরুজ্জামান মিয়া) প্রতিবেদন ২০০৩। জাতির দীর্ঘদিনের আন্দোলন, সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে যেমনি সাংবিধানের চার মূলনীতির উদ্ভব ঘটেছিল তেমনি স্বধীনতাউত্তর বাংলাদেশে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকার গঠিত কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্টেও জাতীয় উন্নয়নের মূলমন্ত্র হিসেবে প্রণীত সুপারিশেও জাতির প্রত্যাশা প্রতিফলিত হয়েছিল। কিন্তু ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ পরবর্তী সামরিক স্বৈরাচারী সরকারসমূহ তা বাস্তবায়ন না করে, সকলেই বিতর্কিত, খন্ডিত কিছু প্রতিবেদন, সুপারিশমালা প্রণয়ন করেছে শিক্ষাঙ্গন ও সুশীল সমাজের বৈধতা পাওয়ার এক ব্যর্থ প্রয়াস হিসেবে। স্পষ্টত: বাংলাদেশে ‘জাতীয় শিক্ষানীতি’ হয়েছে দু’টো । দু’টোই হয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ তথা বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে ২০০০ ও ২০১০ -এ।
জাতীয় শিক্ষানীতির কয়েকটি মৌলিক বেশিষ্ট্য থাকে: এর শিক্ষা-দর্শন থাকবে, এতে জাতির আশা আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটবে; জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে তা প্রণীত ও গৃহীত হবে। জাতির পূর্ব অভিজ্ঞতাসমূহ এখানে ব্যবহৃত হবে, উপেক্ষিত হবে না। এসকল মানদন্ডে ৬ এপ্রিল ২০০৯ তারিখে গঠিত জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী (চেয়ারম্যান) ও ড. কাজী খলীকুজ্জামান আহমদ (কো-চেয়ারম্যান) নেতৃত্বাধীন কমিটি প্রণীত ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’ যথার্থ অর্থেই জাতীয় শিক্ষানীতির মর্যাদা লাভ করেছে। এটি প্রণয়নে আমাদের মহান সংবিধানের সংশ্লিষ্ট নির্দেশনাবলি, জাতিসংঘ শিশু অধিকার কনভেনশনের সুপারিশ এবং পূর্বে প্রণীত বিভিন্ন কমিটি/কমিশন প্রতিবেদন বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। সর্বোপরি, শিক্ষাবিদসহ সকল শ্রেণি পেশার মানুষের মন্তব্য ও পরামর্শ সংগ্রহ করে তার প্রতিফলন ঘটানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এম পি শিক্ষানীতির ‘প্রাক্-কথন’-এ বলেন, ‘‘২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে জয় লাভের মাধ্যমে আমরা সরকারের দায়িত্ব নেবার পর নির্ধারিত লক্ষ্যকে সামনে রেখে পূর্বে প্রণীত শিক্ষানীতিকে যুগোপযোগী করার জন্য বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের দায়িত্ব প্রদান করা হয় এবং সকল শ্রেণি পেশার মানুষের মতামত গ্রহণ করা হয়। সকলের মতামতকে গুরুত্ব দেয়ার কারণে এই শিক্ষানীতি সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতা পায়।’’ একইভাবে, শিক্ষানীতির ‘মুখবন্ধ’ -এ শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ, এমপি -র বক্তব্যও শিক্ষানীতির গণমুখীতা ও যুগের সাথে এর বহমান ক্ষমতার বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। তিনি বলেন- ‘‘(১) এটা কোন দলীয় শিক্ষানীতি নয় – জনগণ তথা জাতির আকাঙ্খা ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটিয়ে তৈরি করা হয়েছে জাতীয় শিক্ষানীতি। (২) শিক্ষানীতি কোন অপরিবর্তনীয় বিষয় নয়, এর পরিবর্তন ও উন্নয়নের পথ সব সময় উন্মুক্ত থাকবে। কোন ভুল-ত্র“টি হলে তা সংশোধন করা যাবে।’’ বর্তমান শিক্ষানীতির সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা, যথার্থতা ও জাতীয় মর্যাদা লাভের আরেকটি পরিমাপক হলো এর বিরুদ্ধে রাস্তায় আন্দোলন-সংগ্রাম পরিলক্ষিত না-হওয়া।
অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার ন্যায় শিক্ষাও একটি প্রধান মৌলিক অধিকার হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। রাষ্ট্র ও সরকার এ বিষয়ে কি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বাংলাদেশের সংবিধানে এ-নিরিখে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এ বিষয়ে সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: ‘‘(ক) একই পদ্ধতির গণমুখী ও সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য; (খ) সমাজের প্রয়োজনের সাথে শিক্ষাকে সঙ্গতিপূর্ণ করিবার জন্য এবং সেই প্রয়োজন সিদ্ধ করিবার উদ্দেশ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছাপ্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টির জন্য; (গ) আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।’’ এ-ছাড়াও ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদ বা জন্মস্থানের কারণে শিক্ষালাভে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে বৈষম্য না করার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার জন্যও সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে মহান সংবিধানের ২৮ ও ৪১ অনুচ্ছেদে। প্রাক্ কথন মুখবন্ধ, আঠাশটি অধ্যায় ও দু’টো সংযোজনী নিয়ে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর কলেবর।
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রবর্তন পরবর্তী বাস্তবায়ন নির্দেশনার লক্ষ্যে একটি ‘শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন কমিটি’ গঠন করা হয়, যার অধীনে ২৬টি উপ-কমিটি ও অনেকগুলো সাব-কমিটি গঠন করা হয়। জাতীয় শিক্ষানীতির সুপারিশের মধ্যে অন্যতম ছিল প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত উন্নীতকরণ, ‘শিক্ষা আইন’ প্রণয়ন, একীভূত শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন, পৃথক শিক্ষা কমিশন গঠন ইত্যাদি।
বিগত বছরগুলোতে সরকারের বহুবিধ কর্মসূচির ফলে এদেশে শিক্ষায় বিশেষ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় শতভাগ ভর্তি (৯৭.৭%) ও ছেলেমেয়ে সমতা অর্জন (৯৬.২% ছেলে ও ৯৮.৪% মেয়ে)। প্রাথমিক শিক্ষার প্রসারের জন্য ২০১৪ সালে জাতীয়করণ করা হয়েছে ২৬,০০০ এর বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়, প্রতিনিয়ত নতুন শিক্ষক নির্দেশিকা আইন ২০১৩’, ইসিসিই পলিসি ও ফ্রেমওয়ার্ক, ঝশরষষ উবাবষড়ঢ়সবহঃ চড়ষরপু ২০১১ প্রনয়ন, ব্যাপক হারে ঞঠঊঞ কার্যক্রম গ্রহণ, গঁষঃর খরহমঁধষ ঊফঁপধঃরড়হ ব্যবস্থা প্রবর্তন, আদিবাসিদের জন্য মাতৃভাষায় পাঠ্যবই প্রর্বতনের উদ্যোগ ইত্যাদি।
সংশপ্তক ও গণসাক্ষরতা অভিযান দীর্ঘ দিন ধরে শিক্ষা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় আজ ২৫ নভেম্বর সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত- চট্টগ্রাম জেলা শিশু একাডেমি অডিটোরিয়ামে এক মতরিনিময় সভার আয়োজন করেছে। সভাপতির বক্তব্য রাখেন ঘাসফুলের চেয়ারম্যান ড. মনজুর উল আমিন চৌধুরী, প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান, বিশেষ অতিথি ছিলেন যথাক্রমে চট্টগ্রাম পলিটেকনিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ নুরুল কবির, শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন আফরোজা নাহার চৌধুরী, সঞ্চালনায় ছিলেন এস এম নাজের হোসাইন, মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন ড. শমসের আলম, প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্য বর্ণনা করেন রাজশ্রী গায়েন, স্বগত বক্তব্য রাখেন সংশপ্তকের প্রধান নির্বাহী লিটন চৌধুরী।