জহুর-আজিজ’রা ছিলেন বলেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন

প্রকাশ:| বুধবার, ১ জুলাই , ২০১৫ সময় ০৯:২৬ অপরাহ্ণ

মহি আওয়অমীলীগ

চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক সিটি মেয়র আলহাজ্ব এ.বি.এম. মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেছেন, মরহুম জহুর আহমদ চৌধুরী গণমুখী রাজনীতির আদর্শিক মডেল। একজন শীর্ষ রাজনীতিক ও প্রভাবশালী মন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর জীবনাচরণ ছিল নিরাভরণ ও অতি সাধারণ। অর্থ-বিত্তের প্রতি নির্মোহ এই মানুষটি আমৃত্যু মাটি ও মানুষের প্রতি একাকার হয়ে মিলে-মিশে ছিলেন।
আজ বিকেলে উপমহাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের অগ্রদূত, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, চট্টগ্রাম শহর আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, মুক্তিযুদ্ধকালীন বিএলএফ’র পূর্বাঞ্চলীয় চেয়ারম্যান, সাবেক স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও শ্রমমন্ত্রী মরহুম জহুর আহমদ চৌধুরীর ৪১তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় তিনি একথা বলেন। তিনি আরো বলেন, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট সহচরদের মধ্যে অন্যতম জহুর আহমদ চৌধুরী জাতির ক্রান্তিকালে সংগঠনকে গোছাতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জহুর ভাইয়ের পরামর্শ নিতেন। বঙ্গবন্ধু যখন ৬ দফা কর্মসূচি উত্থাপন করেন তখন কোথাও প্রকাশ্যে জনসভা করার জন্য অনেকেই পাশে ছিলেন না। জহুর আহম্মদ চৌধুরী, এম.এ. আজিজ ও মানিক চৌধুরীকে সাথে নিয়ে এই চট্টগ্রাম থেকে লালদিঘীর ময়দানের ৬ দফার সমর্থনে প্রথম প্রকাশ্য জনসভা করার জন্য বঙ্গবন্ধুকে সর্বাত্মক প্রেরণা ও সাহস যোগান। এটা বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের ইতিহাসের একটি গৌরবদৃপ্ত অধ্যায় হয়ে আছে। তিনি বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে বলেন, বাংলাদেশে সামরিক স্বৈর শাসকরা রাজনীতিকদের জন্য রাজনীতি করার ক্ষেত্রটাকে কলুষিত করেছে। তাই রাজনীতিতে সুবিধাভোগী একটি গোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছে। এই সুবিধাভোগীরা বসন্তের কোকিল, দলের দু:সময়ে এরা থাকেন না এবং প্রাসাদ চক্রান্তের ক্রীড়নক হয়ে পড়েন। এদের চরিত্রই হচ্ছে আদর্শ বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা। তিনি আরো বলেন, জনগণের স্বার্থে ও কল্যাণে রাজনীতিকদের অবশ্যই ঝুঁকি নিতে হবে। কোন প্রলোভনে অশুভ কোন শক্তির সাথে আপোষ করা যাবে না। জহুর-আজিজের মত রাজনীতিকরা ঝুঁকি নিয়ে রাজনীতি করেছিলেন বলেই বঙ্গবন্ধু বাঙালিকে বাংলাদেশ উপহার দিতে পেরেছেন। আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তির সংগ্রামে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আমাদেরকেও একই ভাবে ঝুঁকি নিয়ে বাঙালি জাতিসত্ত্বার অস্তিত্ব রক্ষার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য, সাবেক গণপরিষদ সদস্য আলহাজ্ব ইসহাক মিয়া বলেন, জহুর আহমদ চৌধুরী একেবারে গরীব ছিলেন না। ইচ্ছে করলে টাকার উপর শুয়ে থাকতে পারতেন। যখন তাঁর কাছে টাকা এসেছে তা সহকর্মী ও মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। তাই তিনি সবচেয়ে বড় মনের অধিকারী ছিলেন। আমরা আজ অনেক কিছুই হারিয়েছি, মানুষকে ভালবাসার জন্য বড় মনটাকে যেন ছোট না করি।
চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দীন বলেন, জহুর আহম্মদ চৌধুরী’র মত রাজনীতিকরা মানুষের মন জয় করেছিলেন এবং জনগণের ভালোবাসা ও আস্থা অর্জন করেছিলেন। রাজনীতিকে তাঁরা কখনো অর্থ-বিত্তের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন নি। এই মানসিকতাই হলো একজন পরিচ্ছন্ন ও জনসম্পৃক্ত রাজনীতিকের গুণগত বৈশিষ্ট্য। আমাদেরকে সেই বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে হবে।
তিনি আরো বলেন, আদর্শের প্রতি অবিচল আনুগত্য, সততা, নিষ্ঠা, আন্দোলন-সংগ্রামে সাহসী ভূমিকাই একজন রাজনীতিক নেতৃত্বের আসনে বসতে পারেন। এই গুণাবলী যাদের নেই তাঁরা যদি যে কোন ভাবে নেতা হয়ে বসেন তাহলে রাজনীতি ও দলের জন্য অশনি সংকেত বয়ে আনবে। তিনি আরো উল্লেখ করেন, বঙ্গবন্ধু যখন কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা নিতেন তখন জহুর-আজিজের মতামত নিতেন এবং পরামর্শ গ্রহণ করতেন। কারণ এঁরা দু’জন ছিলেন মাটি ও মানুষের প্রতি নিবেদিত প্রাণ। তাই তাঁরা বঙ্গবন্ধুর আশা-আকাক্সক্ষার পরিপূরক। আজ আমরা যারা রাজনীতি করি তাদের অনেকেই আখের গোছানোর প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ি। মানুষের প্রতি কোন দায়বদ্ধতা নেই। তারা নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্যই রাজনীতি করেন। এই মানসিকতার পরিবর্তন না হলে জাতির ভাগ্য পরিবর্তন হবে না। মানুষের যে পাঁচটি মৌলিক অধিকার রয়েছেÑÑ অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-স্বাস্থ্য তা নিশ্চিত করতে আমাদের ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করে ব্যক্তির চেয়ে দল, দলের চেয়ে দেশ বড় মনোভাব নিয়ে রাজনীতি করতে হবে। তাহলেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রূপকল্প ২১ ও ৪১ অনুযায়ী বাংলাদেশ প্রথম মধ্য আয় এবং পরে উন্নত দেশে পরিণত হবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাস যতদিন থাকবে ততদিন জহুর আহমদ চৌধুরী ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবেন। তিনি শুধু চট্টগ্রামের নেতা নন, শ্রম আন্দোলনের সিংহ পুরুষ হিসেবে উপমহাদেশের খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব। জহুর আহমদ চৌধুরী-এম.এ. আজিজ রাজনীতির বাতিঘর।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য আমিনুল ইসলাম আমিন বলেন, আমি জহুর আহমদ চৌধুরীকে দেখিনি। কিন্তু তাঁর রাজনীতিক জীবনাদর্শ অনুধাবন করেছি। আজ আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হিসেবে দাবী করি। কিন্তু তাঁর আদর্শকে কতভাগ ধারণ করি তা আমরা নিজেরাও জানি না।
জহুর আহমদ চৌধুরীর সন্তান ও চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী বলেন, জহুর আহমেদ চৌধুরীকে পিতা হিসেবে খুব কম সময় পেয়েছি। তিনি শুধু আমার জন্মদাতা নন, রাজনীতিক হিসেবে আদর্শিক পিতা। চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আলহাজ্ব শফিকুল ইসলাম ফারুকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত স্মরণসভায় অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আলহাজ্ব নঈম উদ্দিন চৌধুরী, আলতাফ হোসেন চৌধুরী বাচ্চু, ১৪ দলের শরীক দল জাসদের নগর সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন বাবুল, মহানগর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা আলহাজ্ব সফর আলী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব বদিউল আলম, সাংগঠনিক সম্পাদক শফিক আদনান, আইন বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট শেখ ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী, বন ও পরিবেশ সম্পাদক মশিউর রহমান চৌধুরী, নির্বাহী সদস্য অমল মিত্র, জহুর আহমদ চৌধুরীর সুযোগ্য সন্তান হেলাল উদ্দিন চৌধুরী তুফান, ই.পি.জেড থানা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক হারুনুর রশিদ, কাউন্সিলরদের পক্ষে মো: গিয়াস উদ্দিন, মহিলা কাউন্সিলর ফারহানা জাবেদ, মহানগর ছাত্র লীগের সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমু।
সভার শুরুতে মরহুম জহুর আহমদ চৌধুরী’র রাজনীতি, জীবন ও কর্মকান্ড নিয়ে সাংবাদিক নাসির উদ্দিন চৌধুরী সম্পাদিত স্মারকগ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করেন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ্ব এ.বি.এম. মহিউদ্দিন চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দীন। দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনোপলক্ষে সকালে মরহুমের দামপাড়াস্থ কবরে পুষ্পমাল্য অর্পণ, বাদ যোহর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনষ্টিটিউশন হলে খতমে কোরআন, দোয়া মিলাদ মাহফিল এবং আলোচনা সভা শেষে ইফতার ও ভোজের আয়োজন করা হয়।