জলাবদ্ধতা নিরসনে একটি পাহাড়ে ‘বিন্না ঘাস’ পাইলট প্রকল্প

নিউজচিটাগাং২৪/ এক্স প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি , ২০১৮ সময় ১২:২৩ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারের বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের পাশাপাশি ‘বিন্না ঘাস’ নিয়ে পাইলট প্রকল্প করার ঘোষণা দিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। খুব শীঘ্রই নগরীর যে কোন একটি পাহাড়ে এ পাইলট প্রকল্পের কাজ শুরু করা হবে বলেও জানান তিনি।

‘চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে বিন্না ঘাসের ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ ঘোষণা দেন তিনি। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ চট্টগ্রাম কেন্দ্র এ সেমিনারের আয়োজন করে। গতকাল সন্ধ্যায় আইইবি’র সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এ সেমিনারে বিন্না ঘাসের উপর মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম। প্রবন্ধকার ‘বিন্না ঘাস’ কোন প্রক্রিয়ায় জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করবে তা তুলে ধরেন।

সেমিনারে মেয়র বলেন, ‘আমরা আশায় বুক বাঁধতে পারি। আজকে প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে আমরা ‘বিন্না ঘাস’ সম্পর্কে থিউরিটিক্যাল ধারণা পেয়েছি এবং এটা অবশ্যই কার্যকর করা যাবে। পাইলট প্রকল্প হিসেবে যে কোন একটি পাহাড়কে আমরা বেছে নিতে পারি এবং এই পাহাড়টাকে নিয়ে যদি উনি (অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম) কাজ করেন তাহলে বাস্তবসম্মত ধারণা পাব। পাইলট প্রকল্পে সাফল্য এলে আমরা অন্য পাহাড়গুলোতেও এ প্রক্রিয়া শুরু করব।’

আ জ ম নাছির আরো বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিয়ে চট্টগ্রামবাসী চিন্তাগ্রস্ত। কিভাবে জলাবদ্ধতা থেকে দীর্ঘস্থায়ী মুক্তি পেতে পারি সেটা নিয়ে সরকার চিন্তাভাবনা করেছে। সরকার বিভিন্ন প্রকল্প দিয়েছে। প্রকল্পগগুলো বাস্তবাযন করলেও সুফল আসবে।’

‘পাহাড় রক্ষা বড় চ্যালেঞ্জ’ মন্তব্য করে মেয়র বলেন, ‘আমি মনে করি আমাদের মাইন্ডসেট পরিবর্তন করতে হবে। এখন আমি একটা পাহাড়ে গাছ লাগালাম, এটার রেজাল্ট তো আসবে না। কারণ, যারা পাহাড় কাটে বা যারা ভূমিদস্যু তারা তো ‘বিন্না ঘাস’সহ পাহাড়টি কেটে নিয়ে যাবে। এটাও একটা বড় চ্যালেঞ্জ। পাহাড় কাটা রোধে সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে মেয়র বলেন, ‘পাহাড় কাটার সময় আমরা দেখি। যারা পাহাড় কাটে তাদেরকে আমরা চিনি। কিন্তু পাহাড় কাটার সময় আমরা কেউ বাধা দিচ্ছি না। কেউ তাদের প্রতিহত করছে না। কিন্তু ভাবি না, আমরাও তিগ্রস্ত হচ্ছি। গভীরে গিয়ে চিন্তা–ভাবনা করছি না যে, সামাজিকভাবে আমরা তিগ্রস্ত হচ্ছি, এমনকি অর্থনৈতিকভাবেও তিগ্রস্ত হচ্ছি। তাই আমাদের সকলকেই এগিয়ে আসতে হবে।’

তিনি বলেন, আমাদের চিন্তায় ভিন্নতা থাকতে পারে। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় জায়গা থেকে ভিন্নতা থাকতে পারে। কিন্তু দেশের কল্যাণে সকলকে এক জায়গায় আসতে হবে। এজন্য সকল ধরনের সংকীর্ণতা পরিহার করে ঐক্যবদ্ধ হতে পাবে।

‘বিন্না ঘাস’ প্রযুক্তির উদ্ভাবক অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফুল ইসলামকে উদ্দেশ্যে করে মেয়র বলেন, ‘আপনি লেগে থাকুন, সাফল্য আসবে। এসময় মেয়র বলেন, বিন্না ঘাস নিয়ে উনি আর্ন্তজাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছেন, অথচ আসরা প্রাথমিক পর্যায়ে আছি। এটা দুর্ভাগ্যের।

‘বিন্না ঘাস’ যেভাবে কাজ করবে : ‘বায়ো–ইঞ্জিনিয়ারিং প্রটেকশন অব হিল হ্মোপ’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম ‘বিন্না ঘাস’ নিয়ে তথ্য তুলে ধরেন। সেখানে বিন্না কিভাবে পাহাড়ের ক্ষয় রোধ করে জলাবদ্ধতা নিরসন করবে তার সায়েন্টিফিক ব্যাখ্যা দেন।

অধ্যাপক শরীফুল ইসলাম তার প্রবন্ধে বলেন, ‘সবধনের পরিবেশে ‘বিন্না ঘাস’ জন্মাতে পারে এবং বেঁচে থাকতে পারে। যে কোন ধরনের মাটি অর্থাৎ বেলে বা কাঁদা মাটিতে জন্মায়। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা, তীব্র গরমেও এই ঘাস বেঁচে থাকে। মাইনাস ৪০ ডিগ্রি থেকে ৫৫ ডিগ্রিতেও বিন্না ঘাস বেঁচে থাকে। পানিতে ডুবে থাকলে পচে না এবং লবণাক্ত পানিতেও এই ঘাস বেঁচে থাকে। এই ঘাসের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, বিন্না ঘাসের একটি শেকড়ের সহনশক্তি ইস্পাতের ছয় ভাগের এক ভাগ। অর্থাৎ ছয়টি শিকড় একসঙ্গে জোড়া দিলে তা ইস্পাতের মতোই শক্তিশালী হবে। তাছাড়া ঘাসটির শেকড় মাটিকে শক্তভাবে আকড়ে ধরে এবং শেকড় খুব দ্রুত মাটির গভীরে ঢুকে যায়। মাত্র ৪ থেকে ৬ মাসেই ঘাসের শিকড় মাটির ৬ থেকে ১০ ফুট গভীরে চলে যায় এবং আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ে। সবধরনের পরিবেশে ‘বিন্না ঘাস’ জন্মাতে পারে বলে অধ্যাপক শরীফুল তার নাম দিয়েছেন জাদুর ঘাস। যার ইংরেজি নাম ‘ভেটিভার’। স্থানীয় ভাষায় এটাকে ‘খসখস’ও বলা হয়।

অধ্যাপক শরীফুল বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পাহাড় ধস রোধ, নদী ভাঙ্গন প্রতিহতকরণ, নদী দূষণ কমানো, ভেষজ ঔষধি ও কনজ্যুমার পণ্য প্রস্তুত, স্বল্প খরচে বাড়ি নির্মাণে বিন্না ঘাসের বিভিন্ন ব্যবহারের বিষয় তুলে ধরেন তার প্রবন্ধে।

অধ্যাপক শরীফুল ইসলাম বলেন, বিন্না ঘাস পানির দূষণ রোধ করে। আর্সেনিকযুক্ত পানিতে বিন্না ঘাস লাগানো হলে আসের্নিকমুক্ত করে এই ঘাস। তিনি বলেন, ব্রাজিলের সিটি কর্পোরেশন এই প্রযুক্তি গ্রহণ করেছে, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নয় কেন? এই বিন্না ঘাস লাগানোতে ব্যয়ও কম হবে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, পাহাড় থেকে বালি আসে। বিন্না ঘাস’ লাগানো হলে পাহাড়ের মাটিকে শক্ত করবে। ফলে ক্ষয়রোধও কম হবে। এতে বালি আসাও রোধ হবে। চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোতেও ‘বিন্না ঘাস’ লাগানো হলে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়ার ব্যাপারে আমি আশাবাদী ।

প্রকৌশলীদের উদ্দেশ্যে এ বিজ্ঞানী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে আমরা অধিক ঝুঁকিতে। তাই এমন উপাদান ব্যবহার করতে হবে যাতে পরিবেশের ক্ষতি না হয়। ‘অনেক সময় প্রকৌশলীরা সরেজমিন দুর্যোগপ্রবণ এলাকা দেখে ডিজাইন করেন না’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, ঢাকায় বসে ডিজাইন করলে হবে না। শুধু পুঁথিগত শিক্ষায় হবে না।’ তিনি বলেন, অনেক সময় ‘লো কস্ট’ উপাদান প্রকৌশলীরা গ্রহণ করেন না। দেশকে ভালবাসলে লো–কস্ট উপাদানকে গ্রহণ করতে হবে যদি সেটি কার্যকর হয়। লক্ষ্য মহৎ ও সৎ থাকলে অল্প দিয়ে শুরু করেও সাফল্য পাওয়া যায়। ক্ষয় ও অবক্ষয় দুটো রোধ করতে পারলে এগিয়ে যাব আমরা।

ড্রেনেজ ব্যবস্থায় ৯টি সমস্যা চিহ্নিত
সেমিনারে বক্তা ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহমদ। তিনি তার প্রবন্ধে চট্টগ্রাম শহরের ৪২ শতাংশ খাল পানি নিষ্কাশনের ক্যাপাসিটি হারিয়েছে বলে তথ্য দেন সেখানে। তিনি শহরের ২৬০ কিলোমিটার এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা আছে উল্লেখ করে সেখানে অবকাঠামোগত ৯টি সমস্যা চিহ্নিত করে বলেন, সমস্যাগুলোর কারণে ওভার ফ্লো হচ্ছে।

তিনি বলেন, সিডিএ ভবনের অনুমোদন দেয়। কিন্তু ড্রেনেজ সিস্টেম কী হবে সেটা ‘নেগলেক্ট’ থাকে। তিনি বলেন, ১৫টি সিল্ট ট্রাপ কার্যকারিতা হারিয়েছে। খালের রক্ষণাবেক্ষণ করতে গেলে গেলে বাৎসরিক সাড়ে ৫ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন বলেও উলেহ্মখ করেন তিনি।

তিনি বলেন, পাহাড় থেকে যে সব খালের উৎপত্তি সেইসব খাল এবং পাহাড়ের পাশ দিয়ে যেসব খাল, নালা–নর্দমা গেছে সেগুলো খনন করার সময় দেখি, পাহাড়ি বালি–মাটিতে সেগুলো ভরাট হয়ে থাকে। বালি এসে সিল্ট ট্র্যাপে পড়ে এবং সেখান থেকে অন্য খালগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। এই সমস্যার সমাধানে তিনি বিন্না ঘাস প্রযুক্তি ব্যবহারে মত দেন।

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন আইইবি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সভাপতি প্রকৌশলী সাদেক মোহাম্মদ চৌধুরী। প্যানেল আলোচক ছিলেন প্রকৌশলী আলী আশরাফ ও প্রকৌশলী হযরত আলী। আলী আশরাফ বলেন, জলাবদ্ধতাসহ আমাদের সমস্যাগুলো আমাদেরকেই সমাধান করতে হবে। প্রকৌশলী হযরত আলী বিন্না ঘাস নিয়ে কাজ করার সময় প্রফেসর শরীফুলের গবেষণায় অর্থ সংকট হলে আইইবি, সিডিএ বা চসিককে অর্থায়ন করার সুপারিশ করেন।

সেমিনারে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, প্রকৌশলী এম এ রশীদ, প্রকৌশলী উদয় শেখর দত্ত। উপস্থিত ছিলেন চুয়েটের ভিসি ড. মো. রফিকুল ইসলাম, চসিকের প্রধান নির্বহিী কর্মকর্তা সামসুদ্দোহা।


আরোও সংবাদ