জলাবদ্ধতায় হাবুডুবু খাচ্ছে নগরী

প্রকাশ:| বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই , ২০১৫ সময় ০৭:৫৭ অপরাহ্ণ

নগরীর সবচেয়ে বড় সমস্যা ‘জলাবদ্ধতা’র সমাধান হয়নি দীর্ঘদিনেও। অথচ ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে ‘উন্নয়নের মহোৎসবে চট্টগ্রাম পাল্টে যাচ্ছে’ এমন শ্লোগান তুলে যত্রতত্র লাগানো হয় ব্যানার ও বিলবোর্ড। আর সেই বিলবোর্ডের পাশ দিয়ে কোমর পানিতে হেঁটে যেতে হচ্ছে নগরবাসীকে। যেনো একদিকে ‘উন্নয়নের মহোৎসবে পাল্টে যাচ্ছে চট্টগ্রাম’, অন্যদিকে রাস্তায় কোমর সমান পানি!

বৃহস্পতিবার সকালে নগরীর মুরাদপুরসহ বিভিন্ন এলাকার সড়কে কোমর পানি জমে যাওয়ায় গন্তব্যে যেতে ভোগান্তিতে পড়তে হয় সাধারণ মানুষকে। সেই পানি পাড়ি দিয়ে গন্তব্যে যাওয়া মানুষদের পাশে তখন ঝুলছিল সিডিএ’র ব্যানার। যাতে লেখা রয়েছে- ‘উন্নয়নের মহোৎসব পাল্টে যাচ্ছে চট্টগ্রাম’। আরো লেখা- ‘শুধু প্রতিশ্রুতি নয় বাস্তবায়নেই আমরা বিশ্বাসী’। সেই বিলবোর্ডে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশাল বিশাল ছবিও শোভা পাচ্ছে।

উন্নয়নের বিবরণ দিয়ে এমন বিলবোর্ড ও ব্যানারে ছেয়ে গেছে নগরীর বিভিন্ন স্থান। পথে নেমে চোখ উপরে উঠালেই দেখা যায় উন্নয়নের বিবরণ, আর নিচে নামালেই দুর্গন্ধময় কাঁদাপানি। এ অবস্থায় সাধারণের মনে প্রশ্ন- উন্নয়নের মহোৎসব যেখানে চলছে, সেখানে মানুষ পানিবন্দি কেন?

আবার যানজট নিরসনে ফ্লাইওভার বা ওভারপাস নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিকল্পিত পরিকল্পনার অভাব রয়েছে বলেও অভিযোগ। অপরিকল্পিত এসব ফ্লাইওভারের কারণে যানজট আরো বাড়ার পাশাপাশি জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। নগর পরিকল্পনাবিদদেরও এমনটাই অভিমত।

এ বিষয়ে পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সভাপতি প্রফেসর সিকান্দার খান বলেন, ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) কিছু উন্নয়ন কাজ করলেও তাদের মধ্যে সমন্বয় না থাকায় উন্নয়নের সুফল পাচ্ছে না নগরবাসী। সিটি করপোরেশন নগরীর সার্বিক উন্নয়নের দায়িত্বে থাকলেও আরো অন্তত ডজনখানেক সরকারি সংস্থা উন্নয়ন কাজ করে থাকে। কিন্তু তাদের কাজের মধ্যে কোনো সমন্বয়ই নেই। অথচ সংশ্লিষ্ট প্রতিটি সংস্থা মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করলে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে রোধ করা যেতো।’
অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ১৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হলেও এর ব্যবহার তেমন নেই। এছাড়া নগরীতে নির্মিত ও প্রস্তাবিত ফ্লাইওভার নির্মাণেও মাস্টার প্ল্যান অনুসরণ করা হয়নি। আর সে কারণে একটু বৃষ্টি হলেই ওই ফ্লাইওভারের পাশে পানি জমে যায়।

এ বিষয়ে প্রফেসর সিকান্দার খান বলেন, ‘অপরিকল্পিত ফ্লাইওভার নির্মাণের কারণে নগরীতে যানজট বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া ফ্লাইওভারের কারণে পানি চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় জলাবদ্ধতা সমস্যাও আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে। ১৯৯৫ সালে নগরীর মাস্টার প্ল্যানের সাথে সাথে ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যানও নেয়া হয়। ২০ বছর মেয়াদী ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যানের মেয়াদ এ বছর শেষ হচ্ছে। এই মাস্টার প্ল্যানে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনের পরিকল্পনা থাকলেও কোনো সংস্থাই তা বাস্তবায়নে এগিয়ে আসেনি।’

তিনি বলেন, ‘ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী কয়েকটি প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি খাল খননের কথা বলা হয়েছে। একইভাবে নগরীতে পানি ধরে রাখার জন্য জলাধার তৈরি এবং ১৪৪ কিলোমিটার নালা-নর্দমা ও খালের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সে পরিকল্পনাই অনুযায়ী কোনো কাজই করা হয়নি। সে কারণেই ১০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হলে করপোরেশনের বর্তমান ড্রেনেজ সিস্টেমে কোনোভাবেই জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব হয় না।’

বৃহস্পতিবার প্রবল বর্ষণে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের অধিকাংশ এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। টানা বৃষ্টিতে অনেক এলাকায় বাসা-বাড়ির নিচতলা ও দোকানে পানি ঢুকে গেছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী। বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাওয়া এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে- নগরীর অক্সিজেন, হামজার বাগ, মুরাদপুর, আতুরার ডিপো, বহদ্দারহাট, শুলকবহর, কাতালগঞ্জ, নাসিরাবাদ, বায়োজিদ, ২ নম্বর গেট, ষোলশহর, চকবাজার, পাঁচলাইশ, ডিসি রোড, খাজা রোড, চান্দগাঁও, মোহরা, বাকলিয়া, চাক্তাই, রাজাখালি, দেওয়ানবাজার, ডবলমুরিং, আগ্রাবাদ, ছোটপুল, বড়পুল, সিডিএ, হালিশহর, পাহাড়তলী, সরাইপাড়া, সাগরিকা, কাঁচারাস্তার মাথা ও পতেঙ্গার নিম্নাঞ্চল।এদিকে জলাবদ্ধতার কাছে সিংহভাগ মানুষ জিম্মি হয়ে পড়লেও এটি নগরীর বড় কোনো সমস্যা নয় বলে মন্তব্য করেছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন। গত ১৭ মে একটি অনুষ্ঠানে মেয়র বলেছিলেন, ‘জলাবদ্ধতা চট্টগ্রাম নগরীর বড় কোনো সমস্যা নয়। সাংবাদিকরাই এখানকার জলাবদ্ধতাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বড় সমস্যা হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। বিদেশেও বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। রাজধানী ঢাকায়ও বর্ষায় জলাবদ্ধতা হয়। এসব নিয়ে তেমন খবর প্রকাশ হয় না। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিয়েই মিডিয়া অতিরঞ্জিত খবর প্রকাশ করে, যা ঠিক নয়।’

অথচ নির্বাচনের আগে জলাবদ্ধতাকেই নগরীর প্রধান ও বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন আ জ ম নাছির উদ্দিন। তাই তার নির্বাচনী ইশতেহারের এক নম্বরে রাখা এ সমস্যার সমাধান অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। এছাড়া আ জ ম নাছির নির্বাচনী বিভিন্ন সভা-সমাবেশে জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ২০১০ সালের নির্বাচনে ২ বছরের মধ্যে জলাবদ্ধতামুক্ত চট্টগ্রাম নগরী গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী এম মনজুর আলম ক্ষমতায় এলেও তিনি গত পাঁচ বছরেও নগরীকে জলাবদ্ধতামুক্ত করতে পারেননি। বরং জলাবদ্ধতা আরো বেড়েছে। মনজুর আলম জলাবদ্ধতামুক্ত নগরী গড়াসহ সর্বক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন।

হঠাৎ করেই জলাবদ্ধতা মিডিয়ার অতিরঞ্জন কিংবা এটা নগরীর কোনো বড় সমস্যা নয়, আ জ ম নাছিরের এমন বক্তব্যে অনেকেই অবাক হয়েছিলেন। এরপর গত ৩১ মে এক অনুষ্ঠানে মেয়র আ জ ম নাছির বলেন, ‘জলাবদ্ধতা একটি সমাধানযোগ্য সমস্যা। নগরবাসী সচেতন হলে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।’

তবে উদাসীন মেয়রসহ দায়িত্বশীল সংশ্লিষ্টরা যখন যা খুশি বলুন না কেন, এ পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগী নগরবাসী জলাবদ্ধতাকে তাদের নিয়তি হিসেবেই মেনে নিয়েছেন।