জলবায়ু প্রকল্পের ঠিকাদারি পেয়েছে আত্মীয়স্বজনেরা

প্রকাশ:| সোমবার, ২৩ জানুয়ারি , ২০১৭ সময় ১১:২৬ অপরাহ্ণ

পৌরসভার চেয়ারম্যান-সচিব ও প্রকৌশলীরা নিজেদের আত্মীয়, বন্ধু ও পরিচিত ব্যক্তিদের জলবায়ু প্রকল্প বাস্তবায়নের ঠিকাদার নিয়োগ দিয়েছেন। প্রকল্পের মাধ্যমে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয়েছে সচ্ছল ব্যক্তিদের; যাঁদের পাকা বাড়ি পর্যন্ত আছে।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হওয়া ছয়টি প্রকল্পের ওপর করা একটি গবেষণায় এমন অনেক অভিযোগ তুলে ধরেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ (টিআইবি)। আজ সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস ভবনে টিআইবি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে গবেষণার এসব ফলাফল তুলে ধরা হয়।
গবেষণার ফলাফলে আরও বেরিয়ে এসেছে, জলাবদ্ধতার মতো মনুষ্যসৃষ্ট সমস্যাকে জলবায়ু পরিবর্তন দেখিয়ে প্রকল্পের অর্থ ব্যয় করার ঘটনা। প্রকল্পের উপকারভোগী হওয়া ও ঠিকাদার নিয়োগ পাওয়ার ব্যাপারে আর্থিক লেনদেনেরও অভিযোগ তুলেছে টিআইবি।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হওয়া ১০৮টি প্রকল্পের মধ্যে ছয়টিকে নির্বাচন করে তার সুশাসন নিয়ে টিআইবি গবেষণাটি করেছে। গত বছরের জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে মাঠপর্যায়ে সরেজমিন পর্যবেক্ষণ, একক ও দলীয় আলোচনাসহ নানা পদ্ধতি ব্যবহার করেছে টিআইবি গবেষণাটি করেছে। ছয়টি প্রকল্পের একটিতেও ই-দরপত্রের নিয়ম মানা হয়নি বলেও সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ বেরিয়ে এসেছে।
বাধ্যতামূলক থাকলেও ছয়টি প্রকল্পের কোনোটিতেই জন অংশগ্রহণ ছিল না। একটি প্রকল্পেও সম্ভাব্যতা যাচাই না করে প্রকল্পের কাজ শুরু করা হয়েছে। টিআইবি আরও বলেছে, জলবায়ু তহবিলের আওতায় যেসব প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, সেগুলোতে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের একাংশের এলাকায় বরাদ্দের প্রাধান্য পেয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কোনো ধরনের ঝুঁকিতে নেই; এমন এলাকাতেও প্রকল্প অনুমোদনের ঘটনা ঘটেছে।
প্রতিবেদনে বেশ কয়েকটি সুপারিশও তুলে ধরা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, জলবায়ু তহবিলের টাকা সুষ্ঠু ব্যবহারে দ্রুত ট্রাস্টি বোর্ড পুনর্গঠন জরুরি। যেখানে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, রাজনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব নেই, এমন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন টিআইবির রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি বিভাগের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার এ এস এম জুয়েল ও ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার নাহিদ শারমিন।
প্রকল্পগুলো নেওয়ার যৌক্তিকতা, জন অংশগ্রহণ, সংগতি, স্বচ্ছতা, ন্যায্য বণ্টন, কার্য সম্পাদন, দক্ষতা, জবাবদিহি ও শুদ্ধাচার—এই আটটি সূচকের আলোকে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়। নিজস্ব নীতিমালার কারণে প্রকল্পগুলোর নাম ও কোন কোন জেলায় বাস্তবায়িত হচ্ছে, গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদনে সেগুলো প্রকাশ করেনি টিআইবি।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির ট্রাস্ট্রি বোর্ডের চেয়ারম্যান সুলতানা কামাল বলেন, জলবায়ু তহবিলের টাকা মানুষের করের টাকা। এই টাকা ব্যবহারে যতটা স্বচ্ছতা ও সদিচ্ছার প্রতিফলন থাকার কথা ছিল, দুঃখের বিষয় তার ছিটেফোঁটাও পাওয়া যায়নি। প্রকল্পগুলো অনুমোদন ও টাকা খরচে তড়িঘড়ি করা হয়েছে। তিনি বলেন, জনগণের অর্থে পরিচালিত এই তহবিল যাতে রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যবহার করা না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন তহবিলের প্রয়োজনীয়তা এখনো ফুরিয়ে যায়নি। উন্নত বিশ্বের কাছ থেকে যতক্ষণ পর্যন্ত না প্রতিশ্রুত অর্থ পাওয়া না যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তন তহবিল রাখতে হবে এবং এই তহবিলে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। ফলে এই তহবিল নিয়ে জনমনে নানা ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার বিভাগে দক্ষ জনবল ও সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ দেন তিনি।
টিআইবি তাদের গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছে, মেয়র বিরোধী রাজনৈতিক দলের হওয়ায় একটি প্রকল্পে বরাদ্দ পাওয়ার পরও ওই মেয়রকে সে টাকা দেওয়া হয়নি। পরবর্তী সময়ে প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন করে অন্য প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কর ও মূসক ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে জলবায়ু তহবিলের একটি প্রকল্পে।
টিআইবি বলেছে, একটি প্রকল্পে জেলা পরিষদের অনুমতি না নিয়ে পরিষদের জমিতে বিদ্যালয় কাম আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। জেলা পরিষদ থেকে আপত্তি তোলার পর এখন ওই স্কুলের শিক্ষকেরা উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। অন্য একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে জমির মালিককে জানানোই হয়নি। তাঁকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত কাজ শেষ না করেই প্রকল্পের ইতি টানে স্থানীয় সরকার বিভাগ। একটি প্রকল্পে জলবায়ু তহবিলের টাকায় অন্য প্রকল্পের অসমাপ্ত কাজ শেষ করার ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া অধিক ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা উপেক্ষা করে অপেক্ষাকৃত কর্ম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা নির্বাচন করা হয়েছে শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায়।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির উপনির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া খায়ের, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি পরিচালক রফিকুল হাসানসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।