জমে উঠছে জব্বারের বলীখেলার মেলা

প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ২৫ এপ্রিল , ২০১৭ সময় ০৯:৫৫ অপরাহ্ণ

মির্জা ইমতিয়াজ শাওন, নিউজচিটাগাং২৪:: কোন সন্দেহ নাই এটিই আমাদের দেশের সবচেয়ে বর্নিল ও ঐতিহ্যবাহী মেলা চট্টগ্রামের বৃহত্তম বৈশাখী মেলা জব্বারের বলীখেলা। চট্টগ্রামের ঐতিহ্য জব্বারের বলীখেলা ও মেলাকে ঘিরে জমে উঠছে শুরু করেছে লালদীঘির আশপাশ এলাকা। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কুটির শিল্পে তৈরি পণ্য নিয়ে মেলায় হাজির হয়েছে বনেদী ব্যবসায়ীরা। কুটির শিল্পের এসব পণ্য কিনতে এক বছর ধরে অপেক্ষার পালা গুনছে গৃহিণীরা। জব্বারের বলী খেলাকে ঘিরে লালদীঘি ময়দান ও আশপাশের প্রায় এক বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বসেছে গ্রামীণ লোকজ মেলা। লালদীঘি মাঠ ছাপিয়ে তার চারপাশ, আন্দরকিল্লা, কোতোয়ালি, আছদগঞ্জের আনসার ক্লাব, নন্দনকাননের বোস ব্রাদার্স মোড়সহ প্রায় আড়াই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মূল সড়ক ও ফুটপাতে বসেছে এই মেলা। এসব এলাকার সড়কে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে যান চলাচল। লালদীঘি ময়দান, জেল রোড এলাকা, টেরিবাজার, হাজারী লেইন, আনন্দকিল্লা, কেসি দে রোড, সিনেমা প্যালেস মোড়, কোতোয়ালী মোড়সহ আশপাশের এলাকায় বসেছে ঢাক-ঢোল, মণ্ডামিঠাই, শীতল পাটি, হাতপাখা, ফুলের ঝাড়ু, মাটির তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী, রেশমী চুড়িসহ বিভিন্ন পণ্যের সারি সারি দোকান। ময়দানের আরেক পাশে আছে সার্কাস ও নাগরদোলা। দা, ছুরি, বঁটি থেকে শুরু করে শীতলপাটি, হাতপাখা, রান্নার সামগ্রী, আসবাবপত্র, মাটির কলসি, গৃহসজ্জার সামগ্রী, খেলনা, গাছের চারা—কী নেই মেলায়। লালদীঘি পাড়ে ও সংলগ্ন পূর্ব দিকের রাস্তা জুড়ে নানা প্রকার ফুল ও ফলের চারার পসরা সাজিয়ে বসেছে দোকানিরা। এবারের মেলায় ফল সমেত চারা নিয়ে আসা ফতেয়াবাদ নার্সারির মালিক মোঃ জসিম জানান ক্রেতাদের অাগ্রহ ফল সমেত আম, পেয়ারা, আনার, জামরুল মরিচের চারার প্রতি।

চট্টগ্রামের এ মেলাটিই সাড়া জাগানো। রবিবার থেকে শুরু হয়েছে তিনদিনের মেলা। তবে সপ্তাহ গড়াবে শেষ পর্যন্ত আয়োজন। কক্সবাজারের রামুর দিদার বলি চট্টগ্রামে জব্বারের বলি খেলার ১০৮তম আসরে সামসু বলীকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। ১৯০৯ সালে বনেদী ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার চট্টগ্রামে এই খেলার সূচনা করেন। বর্তমানে বলীখেলায় বিজয়ীকে নগদ ১৫ হাজার টাকা সম্মাননা দেয়ার পাশাপাশি ক্রেস্ট এবং রানারআপকে ১০ হাজার টাকা ও ক্রেস্ট দেয়া হয়। এছাড়া খেলায় অংশগ্রহণকারী প্রত্যেককে একটি করে ক্রেস্ট দেন আয়োজকরা।

আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে জানা গেছে, জব্বারের বলীখেলা এখন আর লালদীঘির মাঠে নেই। বিশ্বজুড়ে যেখানে বাঙালীর অবস্থান সেখানেই আলোচনা চলছে। দেখতে দেখতে ১০৮ বছরে পদার্পণ করেছে এই আয়োজন। জব্বারের এ বলী খেলাকে ঘিরে গ্রামীণ কুটির শিল্পে তৈরি পণ্য ও তৈজসপত্র নিয়ে ইতোমধ্যে ৩ দিন ধরে মেলায় বেচাকেনা চলছে। এ মেলাকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উদ্যোক্তারাও ইতোমধ্যে পসরা সাজিয়েছেন। এদিকে, মেলা ও বলী খেলার আয়োজনকে সুশৃঙ্খল রাখতে সিএমপির পক্ষ থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। নিয়মিত টহলের পাশাপাশি বুধবার লালদীঘি ও আশপাশের সাত পয়েন্টে দেড় শতাধিক এবং বৃহস্পতি ও শুক্রবার দুই শতাধিক অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হবে। পাশাপাশি থাকবে পর্যাপ্ত সাদা পোশাকধারী পুলিশ ও গোয়েন্দা ।
এ ব্যাপারে নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) তারেক আহমেদ বলেন, জব্বারের বলীখেলা উপলক্ষে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করছে, ইতিমধ্যেই মাঠে নেমে গেছেন গোয়েন্দারা। পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) এবং গোয়েন্দা বিভাগ বৈশাখী মেলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত মাঠে সক্রিয় থাকবে বলে জানান তিনি।

মেলার পরিধি লালদীঘি ময়দানের সীমা ছাড়িয়ে আন্দরকিল্লা, সিনেমা প্যালেস ও কোতোয়ালি মোড় পর্যন্ত বিস্তৃতি ঘটেছে। নিজের পছন্দমতো জায়গায় দোকানিরা নিজের তৈরি ও সংগৃহীত হাতপাখা, শীতলপাটি, মাটির কলস, চুড়ি, ফিতা, হাতের কাঁকন, মাটির ব্যাংক, খেলনা, কুড়াল, পিঁড়ি, হাঁড়ি-পাতিল, মোড়া, মাছ ধরার চাঁই, ঢোল, বাঁশি, বাঁশ ও বেতের নানা আসবাব এবং গৃহ উপকরণ, মাটির তৈরি তৈজসপত্র, শিশুদের জন্য কাঠের পুতুল, মাটির তৈরি নানা ধরনের খেলনা, ঘর সাজানোর উপকরণ ইত্যাদি বিক্রি করেন। এছাড়া গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মুড়ি-মুড়কি, লাড্ডুর মতো রসনাতৃপ্তির নানা উপকরণ হাজির হয় মেলায়। ঘর সাজানোর আধুনিক অনুষঙ্গ বর্তমানে বড় বড় বিপণীতে ভরপুর থাকলেও এখনো মেলার বিক্রেতা ও মৃিশল্পী ও কারুশিল্পীরা প্রতি বছর নতুন নতুন উদ্ভাবনী পণ্য নিয়ে আসেন। লালদীঘির ময়দানে নাগরদোলা, সার্কাস ও বিচিত্রানুষ্ঠানের আয়োজন ছিল চোখে পড়ার মতো।

সারা দিন মেলার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ঘুরে পছন্দের মাটির পুতুল, ঢাক-ঢোল কেনার জন্য মা-বাবার কাছে ছেলেমেয়েদের আদুরে আবদার, মণ্ডা-মিঠাই নিয়ে ভাইবোনদের কাড়াকাড়ি, নাগরদোলায় চড়ে ছোটদের সঙ্গে বড়দের একাকার হয়ে যাওয়া, গরমে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে তালপাতার পাখায় গা জুড়ানো,বিক্রেতা জানান, কেবল জব্বারের বলীখেলাকে কেন্দ্র করে চন্দাইশের বিভিন্ন গ্রামে প্রায় সাত আট মাস আগে থেকে হাতপাখা বানানো শুরু হয়। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও হাতপাখা তৈরির কাজ করেন। কেউ ৫০০, কেউ ১ হাজার, কেউবা আরও বেশি হাতপাখা নিয়ে জব্বারের বলীখেলায় হাজির হন।
প্রতি জোড়া হাতপাখার দাম হাঁকা হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। হাতপাখার বাতাস কেমন তা পরখ করে নিচ্ছেন ক্রেতারা। সিদ্দিক নামে এক ব্যক্তি ৩০০ টাকা দিয়ে একজোড়া পাখা কিনেছেন। চকবাজার এলাকার এই বাসিন্দা বলেন, ‘বিদ্যুৎ ঠিকমতো থাকে না। পাখা ছাড়া উপায় নেই।’ তরুণ-তরুণীদের চুপি চুপি হাত ধরে ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া, সকালের সোনালি রোদে বন্ধুর জন্য রেশমি চুড়ি কিনতে বিক্রেতার সঙ্গে দর কষাকষি, বিকেলের সোনালি রোদে স্বামীর কাছ থেকে পছন্দের কিছু পেয়ে গৃহবধূর চাঁদমাখা হাসি- এমন দৃশ্য এক ফ্রেমে শুধু দেখা মেলে গ্রামবাংলার বৈশাখী মেলায়। শহরে এমন দৃশ্যের দেখা মেলা ভার। আন্দরকিল্লাহ থেকে বকশির হাট পুলিশ বিট পর্যন্ত রাস্তার দুপাশে সারি সারি ঝাড়ুর দোকান। বিক্রেতাদের কেউ বাঁশখালী, কেউবা এসেছেন রাঙামাটি থেকে। মো. সেলিম নামে এক ঝাড়ু বিক্রেতা জানান, ‘তিন পার্বত্য জেলা থেকে ঝাড়ুর ফুলগুলো আসে। এরপর জেলা ও নগরের বিভিন্ন স্থানে এসব ঝাড়ু বেত দিয়ে বাঁধা হয়।’ বেশি মজার সব দেশি ফল উঠেছে আবদুল জব্বারের বলী খেলা উপলক্ষে আয়োজিত বৈশাখী মেলায়। অড়বড়ই সহ দেশি ফলের মেলা জব্বারের বলী খেলায়। তিন পার্বত্যজেলার অনেক বুনো ফল, ওষুধি ফল, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা দেশি ফলে ভরপুর থাকে মেলা। টুকরি, পলো, বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা, মুড়ি, ঘর সাজানোর উপকরণ রকমারি ফুলদানি, সরাই, ফুল, পাখি ইত্যাদি মাটির জিনিসের দাম আকার অনুসারে ১৫ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে বিক্রি করছি। কিন্তু শত বছর ধরে বৈশাখের ১১, ১২, ১৩ তারিখ- এ তিন দিন গ্রামবাংলার ঐতিহ্যে ভরপুর বৈশাখী মেলার এমন দৃশ্য দেখা যায় বন্দরনগরী চট্টগ্রামের লালদীঘির পারে।
ছবি- নুরুল ইসলাম সবুজ


আরোও সংবাদ