জব্বারের বলিখেলাকে ঘিরে কয়েক কিলোমিটার জুড়ে মেলা

নিউজচিটাগাং২৪/ এক্স প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ২৪ এপ্রিল , ২০১৮ সময় ০৯:২৭ অপরাহ্ণ

প্রতিবেদন- মির্জা ইমতিয়াজ শাওন, ছবি-ফয়সাল হোসাইন, নিউজচিটাগাং :: বলি খেলা হবে বুধবার। লালদিঘীর মাঠে এরই মধ্যে বলিদের জন্য তৈরী করা হয়েছে বিশাল রিং। শত বছরের পুরনো জব্বারের বলী খেলাকে ঘিরে লালদীঘি ময়দানের আশপাশ এলাকায় বৈশাখী মেলা জমে উঠেছে। সাকার্স ও নাগরদোলায় মুখর মেলাপ্রাঙ্গণ ।গৃহস্থালি সামগ্রীর পাশাপাশি ঘর সাজানোর জিনিস পাওয়া যাচ্ছে বলে এই আয়োজনের অপেক্ষায় থাকা চট্টগ্রামবাসী; বিশেষ করে শিশুদেরও আনন্দের কমতি ছিলো না।

জব্বারের বলীখেলা এক বিশেষ ধরনের কুস্তি খেলা, যা চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে প্রতিবছরের ১২ই বৈশাখে অনুষ্ঠিত হয়। এই খেলায় অংশগ্রহনকারীদেরকে বলা হয় বলী। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কুস্তি বলীখেলা নামে পরিচিত। ১৯০৯ সালে চট্টগ্রামের বদরপাতি এলাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর এই প্রতিযোগিতার সূচনা করেন। তার মৃত্যুর পর এই প্রতিযোগিতা জব্বারের বলী খেলা নামে পরিচিতি লাভ করে। জব্বারের বলীখেলা একটি জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যমন্ডিত প্রতিযোগিতা হিসেবে বিবেচিত। বলীখেলাকে কেন্দ্র করে লালদিঘী ময়দানের আশে পাশে বেশ কিলোমিটার জুড়ে বৈশাখী মেলার আয়োজন হয়। এটি বৃহত্তর চট্টগ্রাম এলাকার সবচেয়ে বৃহৎ বৈশাখী মেলা। এবারো তার ব্যাতিক্রম হয়নি।

দেশে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা কোতোয়ালি থেকে লালদিঘীর চারপাশে নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন। নগরীর শহীদ মিনার হয়ে কেসি দে রোড, বকশির বিট থেকে আন্দরকিল্লা, আমানত শাহ মাজার হয়ে কোতোয়ালির মোড় পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে মেলার ব্যাপ্তি।

এবার প্রতিযোগিতার ১০৯ তম আসর। ইতিমধ্যে ৭০ থেকে ৮০ জন খেলায় অংশ গ্রহণের জন্য নাম লিপিবদ্ধ করেছে প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহণ করতে।

ঐতিহ্যবাহি জব্বারের বলি খেলার ১০৯ তম আসর:
মঞ্চে বলীদের শক্তি আর কৌশলের লড়াই। চারপাশে হাজারো দর্শকের উল্লাস। এই চিরচেনা ছবি চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলি খেলার। এবারও প্রস্তুত লালদীঘি ময়দান। যেখানে বসবে, প্রতিযোগিতার ১০৯ তম আসর। ইতিমধ্যে ৭০ থেকে ৮০ জন খেলায় অংশ গ্রহণের জন্য নাম লিপিবদ্ধ করেছে প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহণ করতে। আয়োজকরা জানিয়েছেন শতাধিক বলি এবরাও অংশগ্রহণ করবে। গেলো বছরও ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলী খেলার ১০৮ তম আসরের কক্সবাজার, টেকনাফ, রামু চকরিয়া এবং পার্বত্য অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন জেলার শতাধিক খেলোয়াড় অংশ নেন। ১০৮ তম আসরে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন রামুর দিদার বলী। প্রায় ১৭ মিনিট লড়াই করে শামছু বলীকে পরাজিত করে শিরোপা জিতেন তিনি। অবশ্য এর আগের বছর ১০৭তম আসরে জব্বারের বলী খেলার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লড়াইয়ে দিদার বলী ও টেকনাফের শামছু বলী কেউ কাউকে নির্ধারিত সময়ে হারাতে না পারায় সিলেকশন পদ্ধতিতে হেরে গিয়েছিলেন দিদার। চট্টগ্রামের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলী খেলায় ১৫ বার অংশ নিয়ে ১৩ বারই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অন্যন্য রেকর্ড গড়েছেন দিদার।

দেশপ্রেমের চেতনায় যুবকদের উদ্বুব্ধ করতে উনিশ শতকের গোড়ায় এ খেলার সূচনা করেন বনেদী ব্যবসায়ী আব্দুল জব্বার সওদাগর। সেই থেকে এটা লোকসংস্কৃতিরও অংশ। বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ ও বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে যুব সমাজকে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি শক্তিমত্তার লড়াইয়ে নিজেদের যোগ্য করে তুলতে ১৯০৯ সালে লালদিঘী মাঠে বলি খেলার আয়োজন করা হয়। চট্টগ্রামের বদরপাতি এলাকার ব্যবসায়ী আব্দুল জাব্বার এ বলি খেলার আয়োজন করায় তার নামেই এই বলিখেলার নামকরণ হয়ে যায়। প্রতিবছরই বাংলা বছরের ১২ বৈশাখে শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলি খেলা।
নানা প্রতিকূলতার মাঝেও চট্টগ্রামের মানুষ লোকজ এ সংস্কৃতি ধরে রাখায় ব্রিটিশ ফিল্ম বিভাগ ডকুমেন্টারি ফিল্ম হিসেবে জব্বারের বলীখেলার ছবি ধারণ করে সযত্নে সংরক্ষিত রেখেছে লন্ডনের ফিল্ম আর্কাইভে।


প্রতিবছর মেলার সময়সীমা শেষ হলেও মেলার পণ্য বিকিকিনি চলে বাড়তি দুই একদিন। জব্বারের বলি খেলাকে ঘিরে এই মেলা জড়িয়ে গেছে চট্টগ্রামের মানুষের হৃদয়ের সাথে। পুরো বছর অপেক্ষা করেন এখানকার গৃহিনীরা। ঘরের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার একটা বড় সুযোগ এ মেলা। দেশের বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকে মেলায় পণ্যের পসরা নিয়ে আসেন ব্যবাসায়ীরা। মাটির তৈরী নানা সামগ্রী, বাঁশ ও বেতের তৈরী মোড়া, হাতপাখা, শীতল পাটি, চেয়ার থেকে শুরু করে নানা আসবাবপত্র আনা হয়েছে মেলায়।

তাছাড়া কাঠের নানা আসবাবপত্র শোভা পেয়েছে মেলায়। ফলজ, ভেষজ ও ঔষধি গাছের চারার পাশাপাশি নানা বাহারি ফুলের চারাও বিক্রি হচ্ছে মেলায়। চুড়ি, শোপিস ছাড়াও শিশুদের নানা খেলনার পাশাপাশি ফুলের ঝাড়ুর বিশাল সমাহার থাকে চোখে পড়ার মতো। অতিথি আপ্যায়নে বাঙালি অন্যরকম পারদর্শী তাই মেলাজুড়ে মুড়ি মুড়কির দোকানও রয়েছে অসংখ্য। আনন্দে মেতে ওঠার বাঙালি সংস্কৃতির অনন্য উপকরণ নাগরদোলাসহ নানা ধরনের রাইড শোভা বাড়িয়ে দিয়েছে মেলার।


মেলায় আসা সুমি নিউজচট্টগ্রামকে জানান, এ মেলায় ঘরের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাওয়া যায়।চট্টগ্রামের বাসিন্দা হওয়ায় ছোট বেলা থেকে এ মেলায় আসি। এই মেলায় আসার স্মৃতি অনেক মধুর। তাই প্রতিবছর নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার পাশাপাশি মেলায় ঘোরাঘুরি করতে বেশ মজা লাগে।
ডাক্তার শুব্রত কন্যা পিংকিকে এনেছেন মেলা দেখাতে। তিনি জানান, কাল থেকে মেলায় ভিড় বাড়বে। মেয়ের বায়না মেটাতেই মেলায় নিয়ে এসেছি। কিছু ফুলের ঝাড়ু তার হাতে দেখিয়ে বললেন প্রতিবছর এ মেলা থেকে ফুলের ঝাড়ু কিনে বছর পার করে দেন। এই মেলার ঝাড়ু বেশ মজবুত ও টেকসই বলে জানালেন তিনি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ রাফসান জানান, এই মেলার খবর শুনি প্রতি বছর। এবার প্রথম বন্ধুদের সঙ্গে আসলাম। মেলা ঘুরে নানা সামগ্রীর সমাহার দেখে বেশ আনন্দিত। ড্রয়িং রুমের কোণে রাখার জন্য একটি বাশের শো কেশ নিলাম। মেলা ছাড়া এগুলো অনেক বেশি দামে কিনতে হয়। এখানে অনেক কম টাকায় কিনতে পেরেছি।
সিলেট থেকে বেতের তৈরী সামগ্রী নিয়ে এসেছেন ব্যবসায় রইস উদ্দীন। তিনি নিউজচট্টগ্রামকে জানান, বিগত ১৫ বছর ধরে এই মেলায় আসছি। মেলার একটি ঐতিহ্য আছে জানিয়ে তিনি বলেন, বছরজুড়ে এ মেলার জন্য বেতের তৈরী মোড়া, চেয়ারসহ অন্যান্য আসবাবপত্র তৈরী করি। প্রতিবছর বিকিকিনি করে বেশ ভালই লাভ হয়।

বিচিত্র রং আর ডিজাইনের চুরি আর নানা পদের খেলনার পসরা নিয়ে বসেছেন আলতারা বেগম। মেলা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দীর্ঘ ১০ বছর ধরে এ মেলায় ব্যবসা করে আসছি। মেলায় লাভও ভাল হয়। বছরের অন্য সময় শাড়ী ও থান কাপড় ফেরি করি। তবে এ বছর আগাম বর্ষার কারণে ব্যবসায় ক্ষতি হবে।
জব্বারের বলি খেলার আয়োজক কমিটির সভাপতি কাউন্সিলর জহরলাল হাজারী নিউজচট্টগ্রামকে জানান, বলি খেলার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। বলি খেলার মূল আয়োজন রিং পুরোপুরি তৈরী হয়ে গেছে। এ পর্যন্ত একশর কাছাকাছি বলি প্রতিযোগিতার খাতায় নাম লিখিয়েছেন। মঙ্গলবারের সন্ধ্যার মধ্যে তা দেড়শ’ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছি। বৃষ্টি হলেও বলি খেলা চলবে বলে জানান তিনি।
আয়োজক কমিটির সচিব শওকত আনোয়ার বাদল জানান, খেলা ও মেলার নিরাপত্তার জন্য বিপুল পরিমাণ আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছে। সাদা পোশাক ও ইউনিফরম পরা অসংখ্য পুলিশের পাশাপশি র‌্যাব সদস্য মোতায়েন আছে বলে জানান তিনি।

ইতিহাস
ভারতবর্ষের স্বাধীন নবাব টিপু সুলতানের পতনের পর এই দেশে বৃটিশ শাসন শুরু হয়। বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ এবং একই সঙ্গে বাঙালি যুবসম্প্রদায়ের মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব গড়ে তোলা এবং শক্তিমত্তা প্রদর্শনের মাধ্যমে তাদের মনোবল বাড়ানোর উদ্দেশ্যে চট্টগ্রামের বদরপতি এলাকার ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর বলী খেলা বা কুস্তি প্রতিযোগিতার প্রবর্তন করেন। ১৯০৯ সালের ১২ বৈশাখ নিজ নামে লালদীঘির মাঠে এই বলীখেলার সূচনা করেন তিনি। ব্যতিক্রমধর্মী ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজনের জন্য ব্রিটিশ সরকার আবদুল জব্বার মিয়াকে খান বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত করলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলে বৃহত্তর চট্টগ্রাম ছাড়াও বার্মার আরাকান অঞ্চল থেকেও নামী-দামি বলীরা এ খেলায় অংশ নিতেন।

মল্ল পরিবার ও বলীখেলা

চট্টগ্রাম বলির দেশ। কর্ণফুলী ও শঙ্খ নদীর মধ্যবর্তী স্থানের উনিশটি গ্রামে মল্ল উপাধিধারী মানুষের বসবাস ছিল। প্রচণ্ড দৈহিক শক্তির অধিকারী মল্লরা সুঠামদেহী সাহসী পুরুষ এবং তাদের বংশানুক্রমিক পেশা হচ্ছে শারীরিক কসরৎ প্রদর্শন। এই মল্লবীরেরাই ছিলেন বলিখেলার প্রধান আকর্ষণ ও বলিখেলা আয়োজনের মূল প্রেরণা। চট্টগ্রামের বাইশটি মল্ল পরিবার ইতিহাস প্রসিদ্ধ। আশিয়া গ্রামের আমান শাহ মল্ল, চাতরি গ্রামের চিকন মল্ল, কাতারিয়া গ্রামের চান্দ মল্ল, জিরি গ্রামের ঈদ মল্ল ও নওয়াব মল্ল, পারি গ্রামের হরি মল্ল, পেরলা গ্রামের নানু মল্ল, পটিয়ার হিলাল মল্ল ও গোরাহিত মল্ল, হাইদগাঁওর অলি মল্ল ও মোজাহিদ মল্ল, শোভনদন্ডীর তোরপাচ মল্ল, কাঞ্চননগরের আদম মল্ল, ঈশ্বরখাইনের গনি মল্ল, সৈয়দপুরের কাসিম মল্ল, পোপাদিয়ার যুগী মল্ল, খিতাপচরের খিতাপ মল্ল, ইমামচরের ইমাম মল্ল, নাইখাইনের বোতাত মল্ল, মাহাতার এয়াছিন মল্ল, হুলাইনের হিম মল্ল, গৈরলার চুয়ান মল্ল।

বর্তমানে
এখন পেশাদার বলির (কুস্তিগীর) অভাবে বলিখেলার তেমন আকর্ষণ না থাকলেও জব্বারের বলীখেলার মূল উপজীব্য হয়ে উঠেছে মেলা। তাই অনেকে বলীখেলার পরিবর্তে একে বৈশাখী মেলা হিসেবেই চিনে। জব্বার মিয়ার বলী খেলা ও বৈশাখী মেলা চট্টগ্রামের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অহংকারে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় লোকজ উৎসব হিসেবে এটিকে চিহ্নিত করা হয়। খেলাকে কেন্দ্র করে তিন দিনের আনুষ্ঠানিক মেলা বসার কথা থাকলেও কার্যত পাঁচ-ছয় দিনের মেলা বসে লালদীঘির ময়দানের চারপাশের এলাকা ঘিরে।

জব্বারের বলী খেলার পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন স্থানে যেমন কক্সবাজারে ডিসি সাহেবের বলী খেলা, সাতকানিয়ায় মক্কার বলী খেলা, আনোয়ারায় সরকারের বলী খেলা, রাউজানে দোস্ত মোহাম্মদের বলী খেলা, হাটহাজারীতে চুরখাঁর বলী খেলা, চান্দগাঁওতে মৌলভীর বলী খেলা এখনও কোনরকমে বিদ্যমান।


আরোও সংবাদ