জব্দ কোকেন কারো সম্পত্তি নয় : আদালত

প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ৭ জুলাই , ২০১৫ সময় ১১:২৫ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ভোজ্যতেলের ড্রামের ভেতর কোকেন আনার মামলায় এক দীর্ঘ আদেশের মাম্যমে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর ও তদন্ত সংস্থা ডিবির মধ্যে চলমান স্নায়ুযুদ্ধের নিষ্পত্তি করে দিয়েছেন আদালত।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ মামলার তদন্ত কাজে রাষ্ট্রের একটি সংস্থার সাথে আরেকটি সংস্থার অনাকাঙ্খিত দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্টার চেষ্টা করা হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিনিধির বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নেয়ার কথাও বলেছেন আদালত। একই সাথে বন্দর ইয়ার্ডে জব্দ করা আলামত কোন ব্যক্তি বা সংস্থার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয় বলেও জানিয়ে দেন আদালত।

মঙ্গলবার কোকেন সংক্রান্ত মামলায় দুটি আবেদনের শুনানি শেষে চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম ফরিদ আলম এসব আদেশ দেন।

সোমবার বন্দর ইয়ার্ডে জব্দকৃত কনটেইনার থেকে কোকেনের আলমত সংগ্রহ করে পুনঃপরীক্ষার জন্য ডিবিকে ‘অসহযোগিতা’র অভিযোগ করে পরবর্তী নির্দেশনা চেয়ে আদালতে একটি আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও নগর পুলিশের সিনিয়র সহকারি কমিশনার (উত্তর) কামরুজ্জামান। একই দিন রোববার ডিবিকে আলমত পুনঃপরীক্ষার সুযোগ দিয়ে করা আদেশ প্রত্যাহার চেয়ে একটি আবেদন করেন শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক হোসাইন আহমেদ।

নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (প্রসিকিউশন) কাজী মুত্তাকী ইবনু মিনান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

আদালত আদেশে আরো বলেন, মামলার একটি পক্ষ আসামী অন্য পক্ষ রাষ্ট্রপক্ষ। এখানে কাস্টমস, শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর ও বন্দর কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে কাজ করবে। এক্ষেত্রে মামলার দায়েরের আগে থেকে এসব সংস্থা এই মামলার অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জড়িত রয়েছে। কিন্তু মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে ডিবি পুলিশের কর্মকর্তাকে সব ধরণের সহযোগিতা করার নির্দেশ দেয়া হলো। পাশাপাশি কোকেনের আলামত সংগ্রহ করে পুনঃপরীক্ষার সময় উপ পুলিশ কমিশনার পদ মর্যদার একজন কর্মকর্তা ও চট্টগ্রাম বন্দর, কাস্টমস, শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ ও মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে প্রথম শ্রণীর একজন করে কর্মকর্তা উপস্থিত হয়ে নমুনা সংগ্রহ করবেন। নমুনা সংগ্রহ করে একটি ফরমে উভয়ে স্বাক্ষর করে বন্দর কর্তৃপক্ষকে কোকেন ভর্তি কনটেইনার ভর্তি কনটেইনার পুনরায় বুঝিয়ে দেবেনে। এরপর নমুনার পরীক্ষার ফলাফল উভয় সংস্থার প্রতিনিধি আদালতে উপস্থিত হয়ে আদালতকে জানাবেন।

আদেশে আরো বলেন, বিভিন্ন সংস্থা মামলার তদন্তের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকায় তারা মামলা তদন্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং মামলার নিরাপত্তা-সাক্ষ্য সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাষ্ট্রীয় স্বার্থে এবিষয়ে পুলিশ, কাস্টমস, বন্দর ও শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের সম্মিলিত সহযোগিতামূলক অংশগ্রহণ আবশ্যক। এক্ষেত্রে একটি সরকারি সংস্থা অপর সরকারি সংস্থার উপর কোন প্রকার কর্তৃত্বমূলক আচরণ করার চেষ্টা করা অগ্রহণযোগ্য।

তাই সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা রাষ্ট্রীয় স্বার্থে এ বিষয়ে পরস্পর সহযোগিতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা আবশ্যক। আদালতের নির্দেশের পর যদি কোন সরকারি সংস্থা আদালতের আদেশ পালনে অপকৌশল পালন করে; মামলা তদন্তে বিঘœ সৃষ্টি করা বা আদেশ পালনে অপরাগতা প্রকাশ করে থাকে কিংবা অসহযোগিতার মাধ্যমে অনাকাঙিখত দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলে তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননাসহ ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

একই সাথে এই মামলার বেশ কিছু আলামত ও কাগজপত্র ইতোমধ্যে কাস্টমস ও শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর জব্দ করেছে। এসব আলামত কোন ব্যক্তি বা সংস্থার ব্যক্তিগত বা নিয়ন্ত্রনাধীন আলামত বা সম্পত্তি মর্মে দাবি করার সুযোগ নেই। কোন সংস্থা জব্দকরা আলামতের ওপর কোন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারবেনা। আদালতের নির্দেশে কোকেন ভর্তি কনটেইনার বন্দর কর্তৃপক্ষের হেফাজতে থাকবে এবং বন্দরের নিরাপত্তা এর যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। মামলার সার্বিক তদন্ত কার্যক্রমে তদন্ত সংস্থা ডিবিকে সহযোগিতার জন্য সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে নির্দেশ দেন আদালত।

এই আদেশের অনুলিপি চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের কমিশনার, উপ পুলিশ কমিশনার (ডিবি), চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, বন্দরের নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক ও মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালককে পাঠানো হয়েছে।

প্রসঙ্গত গত ৬ জুন রাতে বন্দরে কোকেন সন্দেহে একটি কনটেইনার সিলগালা করে শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। এরপর ৮ জুন এটি খুলে ১০৭টি ড্রামের প্রতিটিতে ১৮৫ কেজি করে সান ফ্লাওয়ার তেল পাওয়া যায়। তেলের নমুনা প্রাথমিক পরীক্ষা করে কোকেনের অস্তিত্ব পাওয়া না গেলে উন্নত ল্যাবে একটি ড্রামে তরল কোকেনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়।
এরপর ২৮ জুন নগরীর বন্দর থানার উপ-পরিদর্শক ওসমান গনি বাদি হয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৯ এর ১(খ) ধারায় ‘আমদানিকারক’ প্রতিষ্ঠান খান জাহান আলী লিমিটেডের চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ ও সোহেলকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন।

এই মামলায় গার্মেন্ট পণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মণ্ডল গ্রুপের বাণিজ্যিক নির্বাহী আতিকুর রহমান, কসকো বাংলাদেশ শিপিং লাইনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপক (করপোরেট, বিক্রয় ও বিপণন) এ কে আজাদ, একটি ডেভেলপার কোম্পানির কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল ও খান জাহান আলী ট্রেডার্সের সহযোগি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক গোলাম মোস্তাফা সোহেলকে আটকের পর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর। এরমধ্যে প্রথম তিনজন ১০ দিন ও সোহেলকে ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে ডিবি।