ছন্দে আর নূপুরের ধ্বনিতে… ফাগুন

নিউজচিটাগাং২৪/ এক্স প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি , ২০১৮ সময় ০৮:০১ অপরাহ্ণ

না ধিন তা না তা না না না, আজ নাচেরে নাচে মন শোনে না মানা’, সিআরবির শিরিষতলায় একটি গানের সঙ্গে নাচছিলেন একদল শিল্পী। ছন্দে আর নূপুরের ধ্বনিতে সেই সুর দোলা খায় সেই ছায়া সুনিবিড় অঙ্গনটিকে ঘিরে থাকা রক্তপলাশ গাছটির শাখায়, শীর্ষে ফুটে থাকা ফুলে। পুষ্পের মধু আহরণে ব্যস্ত পাখিটিও যেন সেই সুরে সিক্ত।

বাতাসেও সুরের ঢেউ। ঢেউয়ের দোলা উৎসব অঙ্গনে সমবেতদের মধ্যেও। বছর ঘুরে আসা বসন্তকে বরণে এমনই উন্মাতাল বাঙালি আর বাংলার প্রকৃতি। বসন্ত ফুলের পাপড়িতে, গাছের শাখায়, পাখির ঠোঁটে। বসন্ত আকাশের নীল মেঘে। বসন্ত বাঙালির মনে আর বাংলার প্রকৃতিতে।

মুগ্ধ কন্ঠে বলেন নজরুলসঙ্গীত শিল্পী করবী দাশ, ‘এটাই ফাগুন। এটাই বসন্ত। এটাই বাঙালির উৎসব। ’

মঙ্গলবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) ভোর থেকেই সিআরবি এলাকায় শুরু হয় বসন্তপ্রিয় বাঙালির পদচারণা। চট্টগ্রামের প্রতিশ্রুতিশীল আবৃত্তি সংগঠন প্রমা সিআরবির শিরিষতলায় দিনব্যাপী বসন্ত বরণের এই আয়োজন করেছে।

সকালে নৃত্যশিল্পী প্রমা অবন্তীর দলের নাচের মধ্য দিয়ে শুরু হয় প্রমা’র বসন্ত বরণের আয়োজন। গান, আবৃত্তি, নাচ আর কথামালায় চলতে থাকে এই আয়োজন। ভায়োলিনিস্ট, চট্টগ্রাম নামে একটি সংগঠনের বেহালা বাদন মুগ্ধ করে সবাইকে।

প্রমা’র শিল্পী লিটন নন্দী যখন দরাজ কণ্ঠে গেয়ে উঠেন ‘গ্রামের নওজোয়ান, হিন্দু মুসলমান…’ তখন মঞ্চের সামনের দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে উৎসবের মুখরতা। বসন্ত বাতাসের নতুন ফুলের গন্ধ যেন ছড়িয়ে পড়ে সেখানে জড়ো হওয়া তরুণ-তরুণীদের মধ্যে। হাতে হাতে ধরে নেচে, গেয়ে মেতে উঠেন সবাই। কোলাহলমুখর শিরিষতলায় তখন উৎসবের রঙ।

কথামালা পর্বে সিএমপি কমিশনার মো.ইকবাল বাহার বলেন, বসন্ত উৎসব বঙালির প্রাণের উৎসব। শহুরে সভ্যতার চর্চা করতে গিয়ে আমরা বাঙালির অনেক চিরায়ত উৎসব হারিয়েছি। এই উৎসব মনে করিয়ে দেয় আমরা বাঙালি। অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক বাঙালি।

চিটাগং কমিউনিকেশন লিমিটেড (সিসিএল) এর পরিচালক শ্যামল কুমার পালিত বলেন, বাঙালি সংস্কৃতিই বাঙালির প্রাণ। এই সংস্কৃতি যদি হারিয়ে যায় বাঙালি জাতিস্বত্তা আর টিকবে না।

প্রমাআবৃত্তি সংগঠনের সভাপতি রাশেদ হাসান বলেন, দেশীয় সংস্কৃতি, দেশীয় ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টায় আমরা বসন্ত উৎসবের আয়োজন করেছি। বাঙালীর আবহমান সংস্কৃতিকে জাগ্রত করে আমরা অন্ধকারের অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে চাই।

কথামালা সঞ্চালনা করেন প্রমা আবৃত্তি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ পাল।

কথামালা শেষ হতে হতে শান্ত, সুনিবিড় শিরিষতলা যেন হয়ে উঠে বাঙালির সম্মিলনস্থল। মাথায় লাল, হলুদ ফুল। হলুদ শাড়ি পরে বাসন্তী সাজে সেজে নারী, হলুদ পাঞ্জাবি গায়ে জড়িয়ে পুরুষ। কারও গায়ে আবার পলাশ রঙে রাঙা পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবি অথবা শাড়ি জড়িয়ে শিশুরা শামিল হয়েছেন বসন্ত বরণে।

বসন্ত বরণে আসা বিভিন্ন বয়সীদের মধ্যে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীই ছিল বেশি। কেউ গলায় ঢোল ঝুলিয়ে আর কেউ হাতে, মুখে রঙ মেখে মিলিত হয়েছেন বসন্ত বরণের আনন্দে। সবার মুখে বসন্তের জয়গান।

কলেজ শিক্ষিকা দীপা ঘোষ বাংলানিউজকে বলেন, আমরা রক্তে রাঙা ফাগুন বলি। রক্তে দ্রোহের জন্ম দেয় যে ফাগুন, সেই বসন্ত আবার সৃষ্টিরও সূচনা। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে উৎসবের মধ্য দিয়ে মননের সংস্কৃতির উন্নয়ন। মননের সংস্কৃতির পরিচর্যা। অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়ার প্রত্যয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী রুহিয়া ইসলাম মাহী বলেন, আমরা নগর সংস্কৃতির মধ্যে ভালো যেগুলো আছে সেগুলো গ্রহণ করব। তবে কোনোভাবেই আমাদের ‍চিরায়ত সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিয়ে নয়। আমাদের আবহমান সংস্কৃতি যদি হারিয়ে যায়, জাতি হিসেবে আমাদের অস্তিত্বই তো থাকে


আরোও সংবাদ