চুয়েট থেকে প্রথম পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করলেন পুরকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো: মইনুল ইসলাম

প্রকাশ:| বৃহস্পতিবার, ১৭ জুলাই , ২০১৪ সময় ১১:৪০ অপরাহ্ণ

মইনুল ইসলামশফিউল আলম, রাউজানঃচট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)-এর প্রথম পিএইচডি ডিগ্রি লাভের গৌরব অর্জন করলেন পুরকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো: মইনুল ইসলাম। তাঁর গবেষণার শিরেণাম ছিল-‘অহ ঊীঢ়বৎরসবহঃধষ ঝঃঁফু ড়হ ঃযব উঁৎধনরষরঃু ড়ভ জবরহভড়ৎপবফ ইষবহফবফ ঈবসবহঃ ঈড়হপৎবঃব রহ গধৎরহব ঊহারৎড়হসবহঃ’। চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: সাইফুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে তিনি এই ডিগ্রি সম্পাদন করেন। একাডেমিক কাউন্সিলের ৮৬তম সভায় উক্ত পিএইচডি ডিগ্রি অনুমোদিত হয়।
এ উপলক্ষে গঠিত ঙৎধষ ঊীধসরহধঃরড়হ ইড়ধৎফ-এ সভাপতিত্ব করেন গবেষণা সুপারভাইজার অধ্যাপক ড. মো: সাইফুল ইসলাম। বোর্ড সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও মাননীয় ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. মো: জাহাঙ্গীর আলম, অধ্যাপক ড. মাহমুদ ওমর ইমাম, অধ্যাপক ড. স্বপন কুমার পালিত, অধ্যাপক ড. মো: রবিউল আলম। এতে বহি:সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভারতের ওওঞ, জড়ড়ৎশবব-এর সাবেক অধ্যাপক ড. সুরেন্দ্র কুমার কৌশিক এবং বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. এম. শামীম জেড. বসুনিয়া।

গবেষণার উদ্দেশ্যে:-সারা বিশ্বে নির্মাণ সামগ্রী হিসাবে কনক্রীট বহুলভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গত কয়েক দশক ধরে বিশ্বে কনক্রীট এর ব্যবহারের পরিমাণ উল্লেখজনক ভাবে বেড়ে চলেছে। কনক্রীট তৈরীর উপাদান সমূহের মধ্যে সিমেন্ট একটি মূল উপাদান। এক সমীক্ষায় দেখা যায় যে, ১৯৯৫ সালে সিমেন্টের উৎপাদন ছিল ১.৪ বিলিয়ন টন। ২০১০ সালে এ উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৩ বিলিয়ন টন। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৪০ সাল নাগাদ সিমেন্টের উৎপাদন গিয়ে দাঁড়াবে ৫ বিলিয়ন টনে। সিমেন্ট উৎপাদনের সময় প্রচুর পরিমাণে কার্বনডাই অক্সাইড (ঈঙ২) গ্যাস নির্গত হয়। প্রত্যেক টন সিমেন্ট উৎপাদনে সাধারণভাবে ০.৭২-০.৯৮ টন ঈঙ২ গ্যাস বাতাসে নির্গত হয়। সিমেন্ট তৈরির কারখানা সমূহ সারা বিশ্বের বিভিন্ন কারখানা হতে নির্গত ঈঙ২ এর ৫-৭% ঈঙ২ নিঃসরন করে থাকে। এছাড়াও প্রত্যেক টন সিমেন্ট উৎপাদনে ৪-৫ গিগাজুল শক্তি ব্যয়িত হয়ে থাকে। এসব কিছুর কারণে আমাদের চারপাশের পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বের সর্বত্রই পরিবেশ বান্ধব নির্মাণ সামগ্রী তৈরী এবং পরিবেশ সহনীয় প্রযুক্তি ব্যবহার এর উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে। ভবিষ্যত প্রজন্মের নিজস্ব চাহিদা পূরণের সক্ষমতার সাথে কোনরূপ সমঝোতা না করে, যে প্রযুক্তি ব্যবহার করে বর্তমান প্রজন্ম নিজেদের চাহিদা পুরনে সক্ষম হয়, সেই প্রযুক্তিকে পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তি বলা হয়। পরিবেশ বান্ধব নির্মাণ সামগ্রী এবং পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তি তৈরী আমাদের চারপাশের পরিবেশকে সুন্দর রাখার জন্য অতীব প্রয়োজনীয়। এই পরিবেশ বান্ধব নির্মাণ সামগ্রী তৈরীর জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উৎপাদিত উপজাত (ইু-ঢ়ৎড়ফঁপঃ) সমূহ ব্যবহার করা যেতে পারে। এ উপজাত সমূহের মধ্যে প্রজ্জলিত কয়লা থেকে উৎপাদিত ফ্লাই অ্যাশ, স্টীল কারখানা থেকে উৎপাদিত স্লাগ উল্লেখযোগ্য। এ সকল উপজাত সমূহের আর অন্য কোন ব্যবহার নেই। এগুলিকে এক জায়গায় ডাম্প করে রাখা হয়। এগুলো মূলত বর্জ্য হিসাবে পরিচিত। বর্জ্যগুলি যদি সঠিকভাবে অপসারন করা না হয়, তাহলে পরিবেশ বিপর্যস্ত হতে পারে। এই উপজাতগুলি অপসারন এর চিন্তাধারা থেকে মূলত ফ্লাই অ্যাশ ব্যবহার এর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
গবেষণালব্ধ ফল: বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বড়পুকুরিয়া-ফুলবাড়ী বেসিন হতে কয়লা সরবরাহ করা হয়। বড়পুকুরিয়া-ফুলবাড়ী বেসিন এর ৬টি দিগবলয়-এ আনুমানিক ৩০৩ মিলিয়ন টন কয়লা মজুদ অবস্থায় রয়েছে। বড়পুকুরিয়া কয়লা উচ্চতর তাপীয় ক্ষমতা সম্পন্ন। এছাড়াও এ কয়লাতে সালফার এবং এ্যাশ এর পরিমাণ অনেক কম। এ সকল গুণাবলীয় কারণে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে প্রাপ্ত কয়লা জ্বালানি হিসাবে ব্যবহারের জন্য আদর্শ বলে বিবেচিত হয়। এছাড়াও বড়পুকুরিয়া ফ্লাই এ্যাশ ঢ-জধু ঋষঁড়ৎবংপবহপব (ঢজঋ) পরীক্ষার মাধ্যমে রাসায়নিক বিশ্লেষণ করা হয়। বিশ্লেষণের পরে দেখা যায় বড়পুকুরিয়া ফ্লাই এ্যাশ অঝঞগ ঈষধংং ঋ গ্র“পের অন্তর্ভুক্ত। বড়পুকুরিয়া ফ্লাই এ্যাশ এর চযুংরপধষ গুণাবলী দেখা যায় যে, প্রজ্জ্বলনের ফলে হারানো ভর এর পরিমাণ <৫% যাহা, অঝঞগ কর্তৃক নির্ধারিত ৬% অপেক্ষা কম। ঢজঋ বিশ্লেষণে ক্লোরাইড এর উপস্থিতির কোন তথ্য পাওয়া যায় নি। সেক্ষেত্রে এই ফ্লাই এ্যাশ ব্যবহারে প্রস্তুত কৃত সিমেন্ট কনক্রীট তৈরীতে ব্যবহার করলে উক্ত কনক্রীট বিরূপ পরিবেশে টিকে থাকার জন্য উপযোগী হবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে গবেষণার প্রায়োগিকতা:-২০০৬ সালে বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলার বড় পুকুরিয়ায় ১২৫ গড করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম ২টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হয়। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি কয়লা চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র। বর্তমানে বাংলাদেশে মোট বিদ্যুতের প্রায় ৪% এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে আসে। আমেরিকাতে অবস্থিত কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত ফ্লাই এ্যাশ এর প্রায় ৩০% সিমেন্ট উৎপাদনের কাজে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভুক্ত দেশ সমূহে উৎপাদিত ফ্লাই এ্যাশ এর প্রায় ৪০% সিমেন্ট তৈরীতে ব্যবহার। বাংলাদেশে উৎপাদিত ফ্লাই এ্যাশ এর এ ধরনের কোন ব্যবহার নাই। বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনার ভবিষ্যতে আরো অধিক সংখ্যায় কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের চিন্তা ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এ সকল বিদ্যুৎ কেন্দ্র হতে উপজাত হিসাবে প্রাপ্ত ফ্লাই এ্যাশ এর সুষ্ঠ ব্যবহার এর কোন নীতিমালা নাই। সেক্ষেত্রে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ ফ্লাই এ্যাশ পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ ডেকে আনতে পারে। বর্তমান বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি থেকে উত্তোলিত কয়লার পরিমাণ ১ মিলিয়ন টন। এর মধ্যে ৬৫% কয়লা বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহৃত হয়। কয়লা প্রজ্জ্বলনের ফলে প্রায় ১০% ফ্লাই এ্যাশ উৎপাদিত হয়। এ হিসাবে বছরে প্রায় ৬৫ হাজার টন ফ্লাই এ্যাশ এখান থেকে উৎপাদিত হয়ে থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশে উৎপাদিত বেশীর ভাগ সিমেন্টে ২০-৩০% পরিমাণ ফ্লাই এ্যাশ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এই হিসাব অনুযায়ী বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎ কেন্দ্র হতে প্রাপ্ত ফ্লাই এ্যাশ দ্বারা বৎসরে প্রায় ৬০ লক্ষ বস্তা সিমেন্ট তৈরীতে ক্লিংকার এর সাথে মিশ্রণ করা সম্ভব। বর্তমানে এই বিপুল পরিমাণে উৎপাদিত ফ্লাই এ্যাশ ফেলে রাখার ফলে অদুর ভবিষ্যতে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। সাধারণভাবে ফ্লাই এ্যাশ জমা করার জন্য ফাঁকা জায়গাগুলি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এর ফলে ফাকা জায়গাগুলি ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এতে করে বর্ষা মৌসুমে পানি ধরে রাখার জায়গার সংকট দেখা দিতে পারে। ফলশ্র“তিতে প্রবল বন্যায় এলাকা প্লাবিত হবার সম্ভাবনা তৈরী হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থিত বেশিরভাগ সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সমূহ বিদেশ হতে ফ্লাই এ্যাশ আমদানী করে ক্লিংকার এর সাথে মিশ্রিত করে সিমেন্ট তৈরী করে থাকে। এই ফ্লাই এ্যাশ আমদানীতে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবহার হয়। বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদিত ফ্লাই এ্যাশ ব্যবহার করলে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে। এছাড়াও পরিবেশ এর উন্নয়ন তরান্বিত হবে। বাংলাদেশ সরকার খুব শীঘ্রই দেশের অভ্যন্তরে আরো কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সকল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পর বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণে ফ্লাই এ্যাশ উৎপাদিত হবে। সুষ্ঠ পরিকল্পনার অভাবে এ সকল ফ্লাই এ্যাশ বাংলাদেশের পরিবেশে মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এজন্য অতি দ্রুত সরকার এবং সিমেন্ট তৈরীর প্রতিষ্ঠান সমূহকে যৌথভাবে এগিয়ে এসে বাংলাদেশে উৎপাদিত ফ্লাই এ্যাশ ব্যবহারের সুষ্ঠ নীতিমালা তৈরী করতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা এবং ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশী ফ্লাই এ্যাশ ব্যবহার করতে পারলে দেশ আর্থিকভাবে লাভবান হবে এবং পরিবেশ উন্নয়ন সম্ভবপর হবে।