চাকরি মানুষকে কাজ করার অধিকার দেয় না

প্রকাশ:| শনিবার, ২৮ জুন , ২০১৪ সময় ০৯:০৭ অপরাহ্ণ

:: স্টাফ করেসপন্ডেন্ট ::

younusনোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, নিজের ইচ্ছায় কেউ বেকার হয় না। সামাজিক প্রেক্ষাপটেই এটি হয়ে থাকে। একটি অদৃশ্য শক্তি মানুষকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে।

তিনি বলেন, একজন সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষ বেকার থাকবে, তা হতে পারে না। একজন মানুষের জন্ম হয়েছে আরেক জনের চাকর হতে, এটি মেনে নেওয়া যায় না।

তিনি আরো বলেন, বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতিই সারা দুনিয়ার মানুষকে বাধ্য করছে ‘চাকর’ হতে। চাকরি পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে কাউকে কাজ করার অধিকার দেয় না।

শনিবার ‘সোস্যাল বিজনেস ডে’ দিবস উপলক্ষে রাজধানীর র‌্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে আয়োজিত দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে তিনি এ সব কথা বলেন।

ড. ইউনূস বলেন, বেকারত্বের কারণে স্পেনের মতো দেশে অর্ধেকের বেশিই তরুণ বেকার। সেখানে বেকারত্বের কারণে একটি প্রজন্ম শেষ হয়ে যাচ্ছে। এটি পুঁজিবাদের খারাপ নজির। দারিদ্র্য সবখানেই রয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোতে যেমন রয়েছে, আমাদের দেশেও রয়েছে। তবে আমাদের চেয়ে উন্নত বিশ্বে হয়ত দারিদ্র্য কিছুটা কম। কিন্তু, মূল সমস্যা সব জায়গাতেই একই।

সেন্টার ফর জাস্টিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের প্রেসিডেন্ট কেরি কেনেডি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র স্বপ্ন দেখালেও আমাকে উৎসাহ দেয় বাংলাদেশ।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্য, প্রাথমিক শিক্ষায় বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রশসংনীয়। শান্তি মিশনে তারা শীর্ষে রয়েছে। আগামীতে তারা আরো উন্নতি করবে। চীনের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী এখন বাংলাদেশ।

কেরি কেনেডি বলেন, আমি যখন হাইস্কুলে পড়ি, তখন আমার দুই বন্ধু ধর্ষিত হয়েছিল। আমার এক বন্ধু এইডসে আক্রান্ত হয়েছিল। ১৭ বছর আমার ভাই রাজনৈতিক কারণে কারাবন্দি ছিল। এগুলো আমার জীবনের স্পর্শকাতর ঘটনা।

তিনি বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, সাংবাদিক বন্দি করা, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নারীর ওপর যেকোনো সহিংসতা মেনে নিতে পারি না। ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা, বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করা ও বাল্যবিবাহ রোধ করা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ।

কেরি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেন, আমাদের ১০ ভাইবোনের মধ্যে সাতজন ভাই। বাংলাদেশের মানুষের ওপর যখন পাকিস্তানিদের হত্যাযজ্ঞ চলে, তখন আমার বয়স ছিল ১০ বছর। ওই ছোট বয়সেও এই ঘটনা আমাকে নাড়া দিয়েছিল।

ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ড্যান ডাব্লিউ মজীনা বলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের দর্শনকে আমি ভালোবাসি। বাংলাদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের গ্রামীণ ব্যাংকে গিয়েছি। সেখানে গিয়ে আমি গ্রামীণ ব্যাংকের ম্যাজিক দেখেছি কীভাবে নিরক্ষর মানুষদের ড. মুহাম্মদ ইউনূস দক্ষ কর্মশক্তিতে রূপান্তরিত করেছেন। ড. ইউনূস বেকারত্ব ঘোচাতে এখন নতুন উদ্যোগ নিয়েছেন।

এ সময় ড. মুহাম্মদ ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের অধিকার আদায়ের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার যাওয়ার ঘোষণা দেন।

তিনি বলেন, গরিব মানুষের জন্যই গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আর আজ সরকার এই ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা দরিদ্র মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। যে লক্ষ্য নিয়ে এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, সেই উদ্দেশ্য ভেস্তে যেতে দিতে পারি না।

তিনি বলেন, সরকার গ্রামীণ ব্যাংকের জন্য নতুন আইন পাস করেছে। এই আইনের মাধ্যমে পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন হলে গ্রামের নারীদের প্রতিনিধিত্বশীল যে পর্ষদ রয়েছে, তা আর থাকবে না। এর ফলে গ্রামীণ ব্যাংকে সরকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে।

এবারের সোস্যাল বিজনেস ডে’র মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর জাস্টিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের প্রেসিডেন্ট কেরি কেনেডি।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, বেকারত্ব সব জায়গাতেই রয়েছে। কিন্তু একজন মানুষও বেকার থাকবে না, এটাই আমাদের চ্যালেঞ্জ। আর এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কাজ করছে ‘সোস্যাল বিজনেস’।

তিনি বলেন, অর্থনীতি আমাদের সঙ্গে যে ব্যবহার করছে, তাতে আমরা হতাশ। তরুণরা আরো বেশি হতাশ। এই হতাশা থেকেই আমরা সোস্যাল বিজনেসের উদ্যোগ নিই।

ইউনূস বলেন, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাই ভুল। আমরা চাকরি প্রার্থী হিসেবে শিক্ষার্থীদের তৈরি করছি। মানবিক গুণাবলির অধিকারী হিসেবে এটি লজ্জার!

পঞ্চমবারের মতো পালিত ‘সোস্যাল বিজনেস ডে’র অনুষ্ঠানটি ৮৯টি দেশ সরাসরি দেখছে। অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে ইউনূস সেন্টার।

‘আমরা চাকরি প্রার্থী নই, চাকরি দাতা’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে এবারের সোস্যাল বিজনেস ডে পালিত হতে যাচ্ছে।

সোস্যাল বিজনেস ডেতে অংশ নিতে ঢাকায় এসেছেন সেন্টার ফর জাস্টিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের প্রেসিডেন্ট কেরি কেনেডি। এবারের বিজনেস ডেতে মূল প্রবন্ধকার কেরি কেনেডি।

কেরি কেনেডি ছাড়াও গ্রামীণ ব্যাংকের আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ও সিইও এন্ড্রিয়া জাং, যুক্তরাষ্ট্রের স্টোনিফিল্ড ফার্মসের সিইও গ্যারি হার্শবার্গ, চীন থেকে ৪৬ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল, ফ্রান্স থেকে ৩২ সদস্য, জাপানের ২৬ সদস্য, ভারতের ২৩ সদস্য, তাইওয়ান থেকে ৩৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৭ জন, হংকং থেকে ১৩ সদস্য, কম্বোডিয়া থেকে ১০ জন, কাজাখাস্তান থেকে ৯ জন, মেক্সিকো থেকে ৯ জন, মালয়েশিয়া থেকে ৯ জন, সুইডেন থেকে ৯ জন, ইতালি, বাহরাইন, সেনেগাল, কলম্বিয়া, ভিয়েতনাম এবং গ্রামীণ ক্রেডিট এগ্রিকোল সংস্থা থেকে ১৫ সদস্যের প্রতিনিধি দল বিজনেস ডে কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন।

দিনব্যাপী এই কর্মসূচিতে ৩১টি দেশের ২৭৫ জন অংশগ্রহণকারী যোগ দিয়েছেন। দেশি-বিদেশি মিলিয়ে কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন এক হাজারের ওপরে প্রতিনিধি।

সারাবিশ্বে সোস্যাল বিজনেস ডে সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিশেষ করে আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক তিউনিসিয়া, উগান্ডাতে ‘সোস্যাল বিজনেস মুভমেন্ট’ নামে একটি পাইলট প্রকল্প চালু করা হয়েছে। এই প্রকল্প সোস্যাল বিজনেস ডে সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করছে।

২০১০ সাল থেকে প্রতি বছর নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উদ্যোগে দিবসটি পালন করা হচ্ছে ঢাকায়।