চরপল্লীর পাঠশালা

mirza imtiaz প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ৪ সেপ্টেম্বর , ২০১৮ সময় ১২:২৭ অপরাহ্ণ

 

জুয়েল বড়ুয়া বাপ্পু::

পর্ব ১

পৌষ মাসের দুপুরবেলা।সূর্যটা এখন ও ঠিক মাথার উপর আসে নি। সামান্য পূর্বদিকে হেলে আছে।পৌষের হালকা হাওয়া বাতাসে বাতাসে খেলছে। রোদ্দুরগুলো যেন স্থির হয়ে গা ছড়িয়ে দিয়েছে চর পল্লীর গাঁওজুড়ে।এই রোদ্দুরের মইধ্যে ধানক্ষেতের পাশে কচুক্ষেতের আইলের উপর দাঁড়িয়ে আছে সাত বছরের সেতু।উদোম শরীর।শরীরের হাঁড়গুলো অনেকটাই বাইর থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।শরীরের নিচের দিকে বোতামহীন একটা হাফ প্যান্ট কোমরের তাবিজ ঝুলানো সুতার সাহায্য আটকে রেখেছে।কচুক্ষেতের আইলে দাঁড়িয়ে সেতু কচুক্ষেতের দিকে তাকিয়ে আছে।কচুক্ষেতের ডোবার হাঁটু পানির মইধ্যে লুঙিখান কোমরে গুইজা কচুর লতি তুলছে হারু।হারু সেতুর বাপ।গঞ্জের হাটে বেজবার লাইগা লতিগুলান তুলছে।
:বাপজান,ও বাপজান
(লতি তুলতে তুলতে হারু উত্তর দিলো)হু-কিরে কিছু কইবি?
:বাড়িত যাইতাম।ক্ষিধা লাগছে।অহন উইটা লও?
:নারে বাপ।আর ও কিছু লতি লওন লাগবো নইলে ওজনে সমান কইরা গিঠ দেওন যাইবো না।
:তয় আমি যাইতাছি বাপজান।
:খাঁড়া। একখান কচু লইয়া যা।তর মাইয়েরে রাইন্তে কইস।
(লতিবিহীন একখান কচু কাইটা সেতুর হাতে দিলো হারু)
: তুমি কহন আইবা?
: লতিগুলান তুইলা ধুইবার পর আঁটি বাইধ্যা একবারে আসুম নে।তুই যা।
(কচুখান দুইহাতে বুকের মইধ্যে ধইরা ধান ক্ষেতের আইলের উপর দিয়া বাড়ির পথে হাঁটতে লাগলো সেতু)।
ধান ক্ষেতের আইল ভাঙগা বড় ডোবার বায়ে দিয়া আম গাছের পাশে মেঠো রাস্তায় উইটা দাঁড়ালো সেতু।উইটা দেখলো আম গাছের নিচে গাছের ছায়ায় একটা পুরনো ভ্যান গাড়িতে এক পা ভ্যানের পাঠাতনে আর এক পা মাটির দিকে ঝুলাইয়া উদোম গায়ে বইসা আছে পরিমল।হাতে একখান আধ খাওয়া বিড়ি।সেতুরে দেইখা পরিমল ডাক দিলো-
:কই থেইকা আসতাছোস?
:বাপজানের লগে কচুক্ষেতে গেছিলাম পরিমল কাকা।
বিড়িতে টান দিতে দিতে পরিমল বললো-
:তয় তোর বাপ কই?
:লতি তুলতাছে খানিক্ষন বাদ আইয়া পড়বো।
:বাড়িত যাবি বুঝি?
:হয়।তুমি এইখানটাই কি করতাছো কাকা?
:খাড়া শফি মাষ্টর ভাইরে লইয়া গঞ্জের বাজারে যাইমু।সামনে বাড়ির পথটাই তুই নাইমা লইস।
সূর্যটা এখন ঠিক মাথার উপরে উইটা বসছে।কিন্তু রোদের প্রখরতা তেমন নেই বললেই চলে।আকাশের খন্ড খন্ড মেঘগুলান যেন পৌষের বাতাসের সাথে হেলে দুলে ভেসে যাচ্ছে।ধুলো জড়ানো মেঠো পথের পাশে পাশে অমরন গাছের ঝোপঝাড়ের পাতাগুলো নড়ে উঠছে খানিক পর পর।রাস্তার ডানের মোর ঘেষা গলি দিয়ে আস্তে আস্তে হেঁটে আসছে শফি মাষ্টার।পঞ্চান্ন উর্ধো বয়স।মাথার চুলগুলি আধা পাকা।চোখে চশমা।নাকের নিচে গোপটা পুরোটা পেকে সাদা ।মেরুন রংয়ের হাফ শার্ট।শার্টেও বুক পকেট থেকে একটা সিগারেটের প্যাকেট খানিকটা মুখ উচিয়ে বেরিয়ে আছে। কালো রংয়ের প্যান্টের সাথে রাবারের চটি পায়ে হাতে একটা ছাতা নিয়ে ভ্যানের কাছাকাছি এগিয়ে এসে বললো-
:পরিমল চল গঞ্জের বাজারে স্কুলের লাইগা দুইটা বেঞ্চের টেবিল বানাইতে দিছিলাম।টেবিলগুলান লইয়া সন্ধের আগে ফিইরা আসন লাগবো।
কথাগুলান কইতে কইতে একটা কচু হাতে নিয়া ভ্যানের পাশে দাঁড়ানো সেতুরে দেখতে পেলো মাষ্টার।
:এইডা হারুর পোলা না পরিমল?
:হ মাষ্টার।কচুক্ষেত থেইকা আসতাছিল।বাড়িত যাইব।কইলাম আপনেরে লইয়া গঞ্জে যামু।বাড়ির পথটাতে নামাইয়া দিমু।তাই খাড়াইয়া আছে।
:কি নাম তোর?
:সেতু।
:স্কুলে যাস?
:না।
:কেন যাস না?
:মা আর বাপে যাইতে কয় না!
:স্কুলে যাবি?
:স্কুল যে মেলা দূর।আর স্কুলে গেলে ক্ষেতের কামে বাপের লগে থাকবার পারতাম না। আমার কিন্তু পড়বার মন চায়।
:তর মা বাপেরে আমি কমুনে।তোগে লাইগা এই গাঁয়ে খেয়াপাড়ে একখান ছোট স্কুল গড়তাছি।আয় ভ্যানে উইটা বস।
সেতু ভ্যানের পিছন দিকে কচুখান লইয়া পা দুলাইয়া বইসা পড়ল।শফি মাষ্টার সামনে বসতেই পরিমল ভ্যান ছাইড়া দিলো।
:মাষ্টার স্কুলখান কি হইবো?
:হইবো পরিমল।স্কুল হইবো।এই চরপল্লীর গাঁয়ে একখান স্কুল করুম আমি।দশক্রোর পথে হাওড় বাওড় ঘুইরা এই চরপল্লীর পোলাপাইনের আর দূরের স্কুলে যাওন লাগবো না।এই গাঁয়ের পোলাপাইন এই গাঁয়ে পড়ালেখা করবো।স্কুলের নামখান দিমু চরপল্লীর পাঠশালা।
:একলা একলা পারবা মাষ্টার? কেউ তো তোমারে সাথ দিতাছে না।গ্রামের মোড়ল রইজ খাঁ বেপারীর লগে ও তোমার কাটখোট্টা লাইগা আছে।আবার হুনতাছি মাষ্টার খেয়াপাড়ে যেখানটাই স্কুল করতাছো বেপারী নাকি হেইখানে আরএকখান বড় চায়ের দোকান বসাইবো।
:পরিমল আমার জায়গায় আমি স্কুল বানামু বুঝি না বেপারীর কি ক্ষতিটান হইতাছে!।আর তোমরা আছ না।চরপল্লীর বেবাগে কি আর বেপারীর মতো।স্কুল উঠবো পরিমল।চরপল্লীর গাঁয়ে একখান চরপল্লীর পাঠশালা।
:বেপারী মানুষখান ভালা না মাষ্টার।
:ভালা খারাপ মিইলা মানুষ পরিমল মনে হয় না বেপারী ঝামেলা করবো।
ভ্যানের পিছনে বইসা সেতু এতক্ষন মাষ্টার আর পরিমলের কথা শুনতাছিলো।দুইজনের কথা বেশিদূর বুঝবার না পারলে ও এটা বুঝবার পারছিলো মাষ্টার এই গাঁয়ে একখান স্কুল গড়তাছে।সেতু ভাবতাছে স্কুল হইলে মা আর বাপেরে কইয়া সে স্কুলে যাইবো।
পৌষের এই মধ্যাহ্নে ও রোদের গরম হাওয়া তেমন তাদের তিনজনের শরীরে লাগছে না।মেঠো পথের ধুলোর আবরন মেখে ভ্যানটা এগিয়ে যাচ্ছে সামনের পথের দিকে।হালকা ফুরফুর বাতাস তাদের শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে।এর মাঝে শফি মাষ্টার গুনগুন করে একটা গান ধরলো-”যদি তোর ডাক শুনে কেউ নাই আসে তবে একলা চলো রে..।”সেতু পা দোলাতে দোলাতে গানটা শুনছে।কেন জানি গানের কথাগুলা শুনতে তার ভালো লাগছে।
কিছুক্ষন ভ্যানটা চলার পর একটা কচুরিপানার ডোবা পার হতেই সেতু বলে উঠলো-
:পরিমল কাকা আমারে নামাইয়া দেন।
পরিমল ভ্যানটা থামালো।সেতু কচুটা দুইহাতে লইয়া ডোবার বায়ের রাস্তার দিকে হালকা দৌড়ে ডুকে গেল। পরিমল ভ্যানটা চালিয়ে মাষ্টার সহিত গঞ্জের দিতে চলতে লাগলো।

পর্ব ২
পেয়ারা গাছের নিচে মাটির চুলাতে কুড়ানো পাতা দিয়ে ভাতের ফেনে জ্বাল দিতাছে ময়না।কিছুক্ষন পর পর বাঁশের চোঙায় ফু দিইয়া চুলার আগুনটা তাতিয়ে দিছে।আর বিড়বিড় কইরা কইতাছে-
:মাথার উপর থেইকা সূর্যখান হেইলা পড়তাছে।অহন ও বাপ পোলা কারো ও কোন খবর নাই।কোন কিছুই পাঠাইবার হইবো হেইডা ও পুরুষমানুষটার মাথায় নাই। আমি কি করুম! হে কি করুম আমি! কি রাইন্ধা রাখুম।খালি ভাতের ফেন খাওয়ামু।মরন আমার।ভগবানরে ডাকলে ভগবান ও আমারে মরন দেয় না।
:ও মা,ও মা,মারে কই?
সেতুর আওয়াজ শুইনা বিরবির করা থামাইয়া কইলো-
:চুলার পাশে বাপ।তোর বাপে কিছু পাঠাইছে?
সেতু কচুটা লইয়া চুলার পাশে আইসা দাঁড়ালো।
:ও মা ধর কচুখান।বাপজান রানবার কইছে।
:তোর বাপে কই?
:আসবার লাগছে।একটু পরে আইবো।ও মা,ও মা,মারে ভাত খামু? ক্ষিধা লাগছে।ভাত দাও?
:একটু অপেক্ষা কর বাপ।কচুটা কাইটা একটু লবন দিয়া সিদ্ব কইরা লয়।হেরপর ভাতের লগে খাইস।ধর একটু ভাতের ফেন গরম করছি এগুলান এখন খা।গায়ে পানি দিয়া কচু সেদ্ব হইলে ভাত খাইস।
:আইচ্ছা দাও।
ময়না একটা মাটির বাটির মইধ্যে ভাতের ফেনটুকু দিইয়া সেতুর হাতে দিলো।
মায়ের সামনেই হাটু ভাইঙ্গা বইসা ভাতের ফেনটুকু খাচ্ছে সেতু।ময়না পোলার মুখের দিকে চাইয়া আছে।আহ! না খাইতে পাইয়া পোলাটার শরীর বলতে আর কিছুই নাই।একবেলা ও এক টুকরো মাছ আর মাছের ঝোল পোলারে রাইন্ধা দিতে পারে না।অভাব।এই অভাব জিনিসটা এই বয়সেই পোলা তার বুইঝা নিছে।কোনদিন কোন কিছুর লাইগা বাইনা ধরে না।ভগবান নাকি সব জায়গাই থাকে।এই কথা ময়না আর বিশ্বাস করে না।ময়না বাস্তবতার সাথে হারতে হারতে বুঝবার পারছে-গরীবের বাড়িতে ভগবান থাকে না!!!।
ভাতের ফেন খাইয়া সেতু মায়ের মুখের দিকে চাইয়া কইলো-
:মারে আমাগো গাঁয়ের খেয়া পাড়ের ঘাঠে নাকি একখান স্কুল হইবো।আমারে স্কুলে পাঠাইবা মা?
:আমাগো গরীবগো আবার পড়ালেখা বাপ।ঠিক আছে তর বাপেরে কমু নে।
মাথার উপর পোটলার ছোট একটা বোঝা লাইয়া ঘরে ডুকলো হারু।ঘরের মেঝেতে লতির পোটলাটা নামাইয়া রাখলো।
:বউ সেতু আইছে নি?
:হ আইছে।পুকুরে গেছে গায়ে পানি দেওনের লাইগা।
:কচুখান চুলাই দিছস নি?
:সিদ্ব হইবার লাগতাছে।
:সিদ্ব হইয়া গেলে তুই ভাত লইস।বাজারে যাওন লাগবো লতিগুলান বেচতে হইবো।
:সন্ধে বেলায় বাজার আনতে হইবো।বাড়ির মইধ্যে কিছু নাই।যদি পারা যায় পোলাটার লাইগা খানিকটা মলা মাছ লইয়েন।পোলাটার মুখে কতবেলা একটু মাছের ঝোল দিতে পারি না!।
:আচ্ছা দেহুম নে।
:আপনেরে বেপারীর লোক খুঁইজা গেছে।
:কি লাইগ্যা?
:কিছু কই নাই।কইছে সন্ধেবেলাতে বেপারীর বাড়ি যাইতে।
:ঠিক আছে যামু নে।বউ ভাত ল।গায়ে পানি দিয়া আইতাছি।

পর্ব ৩

চরপল্লীর পাড়াগায়ে আঁধার নেমে এসেছে।এই চরগাঁয়ে সন্ধে নামতে নামতে মনে হয় যেন গভীর রাত। বাড়িতে বাড়িতে ঘন্টাখানেক কুপি জ্বলার পর বেশিভাগ বাড়িতে সেটা নিভে যায়।ঝি ঝি পোকারা তাদের শব্দ দিয়ে ক্রমাগত রাতের পরিবেশটা ভারী করে।বেপারীর বাড়ির সামনের বারান্দার চাতালে একটা হারিকেন জ্বলছে।হারিকেনের আলোটা উঠোনের সামনে সামান্য কতদূর গিয়ে পড়েছে।সেখানে দুই হাতলের একটা চেয়ারে বসে আছে বেপারী রইজ খাঁ।পাশে একটা ছোট টেবিলের উপর হোক্কা রাখা তার পাশে একটা মিনি রেডি ও বাজছে।।হোক্কার পাইপের নলটা বা হাতে ধরা।পা দুটো ক্রমাগত নেড়ে যাচ্ছে।
:বেপারী বাড়িত আছেন?
:কেডা হারু নি?
:হয় হারু।আমারে নাকি দেখা করতে কইছিলেন?
মাথার উপর একটা পোটলা নিয়া বেপারীর সামনে এসে দাঁড়ালো হারু।
:পোটলাটা রাইখা বয়।গঞ্জের বাজারে গেছিলি নাকি?
:কয়বোঁধা লতি লইয়া গেছিলাম বেইচা চাল আর কয়টা আলু লইয়া আসলাম।
হোক্কার পাইপে লম্বা একটা টান দিয়া হারুর দিকে তাকাইলো বেপারী
:একটু মাছ মাংস খাইবার পারোস না?
:কন কি বেপারী এইগুলান যোগার করতে কয়বেলা উপোস দেওন লাগে(একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো হারু)।পোলাটারে তো জন্মের পর থেইকা ও পাতে একবেলা মাছের ঝোল তুইলা দিতে পারি নাই।আর আপনে আমার লগে মশকরা করেন?
:ধূর মিয়া।কি কস মশকরা করুম কেন।
:মাথার পোটলাটা নামাইয়া একটু কাছে আইসা বয়।তোর লগে কিছু কথা আছে।
হারু মাথার পোটলাটা মাটিতে নামাইয়া রাইখা হাঁটু ভাইঙ্গা বেপারীর কাছে আইসা বসলো।
:হারু আমি তোরে কাজ দিমু।করবি? নগদ কিছু টাকা ও পাবি।
কাজ আর টাকার কথা শুইনা হারু আনন্দে উচ্ছল হইয়া নিজের হাত দুটো একটার সাথে একটা ঘষতে লাগলো।
:হাছা কইতাছেন বেপারী।কাজ দিবেন?
হোক্কাতে আরেকখান টান দিয়া চারিপাশে তাকাইয়া বেপারী কন্ঠস্বরটা নিচে নামাইয়া কইলো-
:হুনছোস নি শফি মাষ্টর নাকি খেয়াঘাটে একখান স্কুল করবার চায়।আইচ্ছা হারু তুই কয় তো এই চরপাঁড়া গাঁয়ে স্কুল দিয়া কি হইবো!এই গাঁয়ে মানুষ এক বেলা খাওন জোগাড় করতেই দিন শেষ হইয়া যায়।পোলা পাইনগুলা যদি স্কুলে যাই তাইলে মা-বাপগো কাজে কামে দাঁড়াইবো কেমনে!আর তোর বাপ দাদা আমাগো বাপ দাদা কেডা ও স্কুলে গেছিলো!
:হ বেপারী এইখানটা স্কুল দিইয়া কি হইবো।
:বেটা মাষ্টার শফি ”বেঠা গাজাখোর,ভাবছে আমরা ও গাজা খাই”স্কুল বানাইবো!আমি কই কি খেয়াপাড়ে মাষ্টর যেখানে স্কুল করবার চাইতেছে হেইখানে আমি একখান বড় চায়ের দোকান দিমু।পারাপারের মানুষজন ও একটু বইলো।আর দোকানে কাজকর্ম কইরা কয়েকটা পরিবার দুবেলা পেটপুইরা খাওনের ব্যাবস্থা হইলো।স্কুল হইলে তো কিছু মানুষের কাজ ও জুটবো না।চায়ের দোকান হইলে তো কিছু মাইনষের পেট ভরবো।স্কুলে কি পেট ভরাইবো!!!।
:হ বেপারী কথাগুলান খারাপ কও নাই।তয় আমার কি করন লাগবো?
বোপারী খুব নিচুস্বরে কইলো-
:একখান খুন করতে হইবো হারু!
হারুর উচ্ছল মুখখান একার ফ্যাকাশে হইয়া গেলো
:কি কন বেপারী!খুন!!এইডা কি কন!!!আমি পারুম না বেপারী।
:হাজার টাকা নগদ পাবি।আর চায়ের দোকান হইলে তোরে আর তোর পোলারে কাজে রাখুম।আর এই গাঁও গেরামের চরদ্বীপে খুনটা কে করলো কেউ জানতেই পারবো না।কয়টা দিন ভাইবা ক হারু।ভাইবা ল!
বেপারী এবার চেয়াল হেলান দিয়া পা একখান পায়ের উপর তুইলা হোক্কার পাইখান মুখে লইয়া টানতে লাগলো।বেপারীর পাইপ টানা মুখের দিকে চাইয়া রইলো হারু।রাতের আঁধারের মাঝে হারিকেনের হালকা আলোয় বেপারী রইজ খাঁ মুখখান খুব কুৎসিত দেখাচ্ছিল।

পর্ব ৪
:হারু ও হারু বাড়িত আছস নি?
:বাপজান তো বাড়িত নাই পরিমল কাকা
:এই সাঝ বেলায় কই গেলো?
:কইবার পারতাম না কাকা।
:পরিমল দাদা বসেন মনে হয় একটুপর আইয়া পড়বো।
:না বৌমা বসতাম না।শফি মাষ্টার সেতুর লাইগা সকালবেলায় আমারে দিয়া একখান বই দিছিলে।আমি সকালে আসবার পারি নাই।তাই বইখান দিতে আসলাম।
:দাদা এই চরপল্লীতে নাকি স্কুল হইতাছে?
:হ বৌমা।মাষ্টার স্কুলখান করবার লাইগা দৌড়তাছে।ভাবলেই মন ভইরা যাচ্ছে এই চরপল্লীর পোলাপাইন স্কুলে যাইবো।পড়ালেখা করবো।সেতু ধর তোর বইখান।মাষ্টার তোরে দেখা করবার কইছে।
:মা ও মা দেখ মাষ্টার দাদা আমারে কি সুন্দর একখান বই দিছে।বইয়ের ভিতর কতগুলান লেখা আর ছবি আছে।আর বইয়ের ঘ্রানখান কি সুন্দর।আমি পড়ালেখা করুম মা।আমি ওস্কুলে যামু।
:বাপজান নতুন বই পাইছস তোর পরিমল কাকারে পায়ে ধইরা প্রনাম কর।
:আমারে প্রনাম করতে হইবো না সেতু।যা শফি মাষ্টাররে প্রনাম কইরা আয়।মাষ্টার বড় ভালা মানুষ।
সেতু বইখান বুকের মইধ্যে জড়াইয়া ধইরা শফি মাষ্টারের বাড়ির দিকে দৌড়াইয়া গেলো।
শেষ বিকেলের আকাশটা অনেক পরি¯কার।গোধুলির কিছু আলোকচ্ছটা নীল আকাশের গায়ে মেখে লালচে আবরনে যেন চরপল্লীর গাঁয়ে নেমেছে।কেমন যেন রঙিন হয়ে উঠেছে ধুলো জড়ানো মেঠো পথগুলো।মেঠোপথে ধুলোর উপর দিয়ে উদোম গায়ে বুকে বইখান জড়িয়ে দৌড়ে যাচ্ছে সেতু।
শফি মাষ্টরের বাড়ির সামনে এসে সেতু দেখলো বাড়ির দরজাখান সামান্য ভেজানো।ভেতরে কিছুটা ধস্তাধস্তির শব্দ হচ্ছে।একটু পর একটা আর্তনাদের শব্দ শুইনা বাড়ির ভিতর দৌড়ে ডুইকা সেতু দেখলো শফি মাষ্টারের শরীরখান মাটিতে লুইটা পইড়া আছে।পাশে রক্তমাখা ছুড়ি হাতে দাঁড়িয়ে আছে তার বাপ হারু।রক্ত দেইখা সেতুর হাত থেইকা বইখান মাটিতে পইড়া গেলো।
:বাপজান তুমি মাষ্টার দাদারে মাইরা ফেললা।
:চুপ হারামির বাচ্চা।চুপ থাক।একদম চুপ।
এক হাতে ছুড়ি আর এক হাতে সেতুরে টান দিয়া শফি মাষ্টারের ঘর থেকে বের হয়ে গেলো হারু। ঘরের মধ্যে শফি মাষ্টরের নিথর শরীরের রক্তে সেতুর বইটা আস্তে আস্তে ভিজে গেলো।