চমেক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হলে সাধারণ জনগণের স্বাস্থ্য অধিকার হুমকির মুখে পড়বে

প্রকাশ:| শুক্রবার, ৪ এপ্রিল , ২০১৪ সময় ১০:৩৭ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজকে (চমেক) বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হলে রোগীদের দুর্ভোগ বাড়ার পাশাপাশি সাধারণ জনগণের স্বাস্থ্য অধিকার হুমকির মুখে পড়বে মন্তব্য করেছেন বিভিন্ন চিকিৎসক, পেশাজীবী, রাজনীতিকরা।

তারা বলেছেন, প্রস্তাবনা অনুসারে কলেজটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করা হলে হাসপাতালের বিভিন্ন সেবাসমূহের মূল্য ১৫ গুণ বৃদ্ধি পাবে। ফলে, এ বর্ধিত ব্যয়ে সাধারণ মানুষের পক্ষে চিকিৎসা সেবা নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।

বিকাল প্রেস ক্লাবের ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক মিলনায়তনে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এ মত ব্যক্ত করেন। চমেককে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করে প্রগতিশীল চিকিৎসক ফোরাম।

মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক ডা. মাহফুজুর রহমানের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে ধারণাপত্র পাঠ করেন সংগঠনের আহ্বায়ক ডা. সুশান্ত বড়ুয়া।

আলোচনায় অংশ নেন শহীদ জায়া বেগম মুশতারি শফি, নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী সুভাষ চন্দ্র বড়ুয়া, চিকিৎসক ডা. সুভাষ চন্দ্র সূত্রধর, মো. রাসেল, উদীচীর কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ডা. চন্দন দাশ, বাসদের জেলা আহ্বায়ক মানস নন্দী, সমন্বয়ক মহিউদ্দিন, রাজনীতিক সিদ্দিক ইসলাম, গণসংহতি আন্দোলন চট্টগ্রামের সমন্বয়ক হাসান মারুফ রুমি, ওয়ার্ড কাউন্সিলর জান্নাতুল ফেরদৌস পপি, অ্যাডভোকেট সালাউদ্দিন হায়দার সিদ্দিকী, প্রভাষক রিগ্যান মজুমদার, চমেক চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারী সমিতির সভাপতি রতন আলী মিয়া, ডিপ্লোমা নার্স অ্যাসোসিয়েশন চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক রতন কুমার নাথ, হাসপাতাল কর্মচারী জাহিদুল ইসলাম সবুজ প্রমুখ।

সভায় ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘চট্টগ্রামের অনেক জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ মেডিকেলটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের পক্ষে লড়ছেন। আমার বিশ্বাস তারা মেডিকেলে রূপান্তরের সরকারি পরিপত্রটি পড়েননি। সরকারি পরিপত্রটি হাতে ‍পেলে তারাও নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসবেন।’

তিনি বলেন, ‘পরিপত্র অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর হলে হাসপাতালটিতে বিভিন্ন সেবায় আর্থিক খরচ প্রায় পনর গুণ বৃদ্ধি পাবে। ফলে, প্রকারন্তরে তা উচ্চ বিত্তের হাসপাতালে পরিণত হবে।’

মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা চট্টগ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি। কিন্তু তা আলাদা জায়গায় করা হোক। একই সাথে এ কলেজটিতে গ্র্যাজুয়েশন ও পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন চালু করা হলে শিক্ষার মানও বিঘ্নিত হবে।’

তিনি বলেন, ‘মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবনা নিয়ে একটি অস্পষ্টতা কাজ করছে। এ অস্পষ্টতা দূর করার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে চট্টগ্রামের সর্বস্তরের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠকে বসতে হবে।’

ডা. সুশান্ত বড়ুয়া বলেন, ‘জাতীয় সংসদে কোন আইন পাশ হওয়ার আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রী বলে গেলেন, এই মুহুর্ত থেকে কলেটি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গণ্য হবে। এই ঘোষণার পরপরই মেডিকেল কলেজের নামফলক পরিবর্তন করে ফেলা হয়েছে। এ ধরণের কার্যক্রম কতটুকু গ্রহণযোগ্য প্রশ্নের দাবি রাখে।’

তিনি বলেন, ‘মেডিকেল কলেজটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের প্রস্তাবনায় বিভিন্ন টেস্টের ফি বাড়ানো, বিনামূল্যে প্রাপ্ত আইসিইউ সেবা বন্ধ, ক্যান্সারের জন্য রেডিওথেরাপী সেবা বন্ধ, বিনামূল্যে অপারেশন বন্ধ সহ বিদ্যমান বিনামূল্যের বা স্বল্পমূল্যের সব সেবা বন্ধ করে দেয়ার প্রস্তাব বৃহত্তর চট্টগ্রামবাসীকে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত করবে।’

মুশতারি শফি বলেন, ‘হাসপাতালটিতে ঠিক মতো রোগীরা সিট পায় না। অনেক জটিলতার মধ্যে চিকিৎসা সেবা দিতে হচ্ছে। এ অবস্থায় সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় করলে জনদুর্ভোগ আরো বাড়বে। আলাদা কোন জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হোক।

ডা. সুভাষ চন্দ্র সুত্রধর বলেন, ‘কয়েকটি মেডিকেল কলেজ থাকলে তখন একটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত মানা যেতো। কিন্তু কুমিল্লা থেকে টেকনাফ পর্যন্ত চারকোটি মানুষের নির্ভরতার জায়গা এ হাসপাতাল। কারো পেটে লাথি মেরে একে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করা যাবে না।’

তিনি বলেন, ‘সাধারণ হাসপাতালকে রূপান্তর করে পিজি হাসপাতাল করার কোন যৌক্তিকতা নেই। পিজি হাসপাতাল ও জেনারেল হাসপাতালের রোগীদের খরচের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলেই এ বিষয়টি বোঝা যাবে।’

ডা. চন্দন দাশ বলেন, ‘জনস্বাস্থ্য এখন হুমকির সম্মুখীন। স্বাস্থ্য আমাদের মৌলিক অধিকার হওয়া স্বত্ত্বেও চিকিৎসা সেবার নামে ইচ্ছেমতো ফি আদায় চলছেই। আমাদের সকলকে একত্রিত হয়ে এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।’

ডা. মো. রাসেল বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিকার জনগণের মৌলিক অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের কিন্তু বর্তমানে সেবামূলক খাতসমূহকে বেসরকারীকরণ-বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে সরকার বিভিন্ন পুজিবাদী গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে।’

সভায় ডা. মাহফুজুর রহমানকে আহবায়ক ও ডা. সুশান্ত বড়ুয়াকে সদস্য সচিব করে ২১ সদস্য বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা কমিটি গঠিত হয়।