ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সম্পাদক দিয়াজের লাশ উদ্ধার

নিউজচিটাগাং২৪/ এক্স প্রকাশ:| রবিবার, ২০ নভেম্বর , ২০১৬ সময় ১০:১৭ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সম্পাদক দিয়াজ ইরফান চৌধুরীর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
রোববার রাত ৯টার দিকে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসম্পাদক দিয়াজ ইরফান চৌধুরীর (২৬) ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেট এলাকায় একটি ভাড়া বাসা থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। স্বজনদের অভিযোগ, হত্যার পর তাঁকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্র জানায়, চার তলা একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতেন দিয়াজ ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা।
ছাত্রলীগের কোন্দলের জের ধরে গত ২৯ অক্টোবর রাতে দিয়াজের বাসায় ভাঙচুর ও হামলার পর দিয়াজ বাসায় একাই থাকতেন।
বাসার যে কক্ষে দিয়াজ থাকতেন সেই কক্ষের জানালা দিয়ে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে তাঁর লাশ ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পেয়ে স্থানীয় লোকজন পুলিশ ও পরিবারের সদস্যদের খবর দেয়। পুলিশ এসে দিয়াজের কক্ষের দরজা ভেঙে লাশ উদ্ধার করে।

দিয়াজের মামা রাশেদ চৌধুরী বলেন, বাসায় কেউ ছিল না। এ সুযোগে দিয়াজকে হত্যা করে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রেখেছে প্রতিপক্ষের লোকজন। দিয়াজের বড় বোন জুবাইদা সরোয়ারও অভিযোগ করেন, তাঁর ভাইকে মেরে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। ছাত্রলীগের কোন্দলের জের ধরে দিয়াজকে হত্যা করা হয়েছে।

হাটহাজারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বেলাল উদ্দিন জাহাঙ্গীর বলেন, বাসায় দিয়াজ একাই ছিলেন। ঘটনার সময় পরিবারের কোনো সদস্য ছিলেন না। খবর পেয়ে দরজা ভেঙে ঘর থেকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকা দিয়াজের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ স্পষ্ট হবে।

পেছন ফিরে দেখা সেদিন ছিলো মঙ্গলবার ১২ মার্চ ২০১৩ সাল। চট্টগ্রাম শহর জুড়ে জারি করা হয় ১৪৪ ধারা। নগরীতে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় মিছিল-সমাবেশ। গণজাগরণ মঞ্চ ও হেফাজতে ইসলাম মুখোমুখি অবস্থান নেয় সমাবেশ নিয়ে। ১৪৪ ধারার প্রভাব পড়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও।

বুধবারের ১৩ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় গণজাগরণ মঞ্চের পূর্বনির্ধারিত সমাবেশ অঘোষিতভাবে বাতিল। আইনশৃঙ্কলা বাহিনীর সশস্ত্র টহল সারা ক্যাম্পাসজুড়ে সয়লাব কেউ সাহস করে বলতে পারছেনা ‘সমাবেশ হবে’।

তখন রাত ১১টা। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের এক নেতা। তাতে লেখা- ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গণজাগরণ মঞ্চের ব্যানারে সমাবেশ হবে।’

এই ঘোষণার সাথে সাথে ফেসবুকে তার পোস্টটি শেয়ার হতে থাকে। পরেরদিন সকাল ১১টার আগেই বিশ্ববিদ্যালয় শহীদ মিনারে জড়ো হয় চবির শত শত শিক্ষক, শিক্ষার্থী।

যিনি এ সাহসটি দেখিয়েছিলেন তার নাম দিয়াজ ইরফান চৌধুরী। তার নের্তৃত্বেই প্রতিকূল পরিস্থিতির মাঝেও শিক্ষার্থীরা গড়ে তুললেন প্রতিবাদের প্রাচীর।

সব হুমকি-ধমকি পেছনে ফেলে ১৩ মার্চ চবিতে প্রজ্বলিত হয়েছিল তারুণ্যের চেতনার অগ্নিশিখা। শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে ঝরেছে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির স্লোগান।

মেয়র আজম নাছিরের সঙ্গে দিয়াজ

মেয়র আজম নাছিরের সঙ্গে দিয়াজ ইরফান চৌধুরী

চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিনের অনুসারী এই দিয়াজ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা। প্রগতিশীল আন্দোলনের কারিগর দিয়াজকে তার কর্মকান্ডের পুরস্কার হিসেবে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ মনোনীত করেছে কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সম্পাদক। সর্বশেষ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মনোনীত হয়েছিলেন তিনি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের বিগত কমিটিতে তিনি ছিলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। শিক্ষা জীবনে মেধাবী এ ছাত্র নেতা রাজনীতিতে ছিলেন তুখোড়। পড়ালেখায় হাতেখড়ি তার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলে। প্রথম শ্রেণী থেকেই ছিলেন সামনের সারির ছাত্র। ভর্তি পরীক্ষায় মেধা তালিকায় তার অবস্থান ছিল চতুর্থ। স্কুল জীবন থেকেই নের্তৃত্বের স্বভাবে ধরা পড়ে যান। জড়িয়ে পড়েন তিনি স্কাউটিংয়ের সাথে।
%e0%a7%aa%e0%a7%aa%e0%a7%aa%e0%a7%aa%e0%a7%aa%e0%a7%aa
ছোট বেলা থেকেই দিয়াজের পরিচিতি ঘটে বিতার্কিক হিসেবে। ২০০২ সালে হাটহাজারী উপজেলায় চিটাগং ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটি আয়োজিত Promotional Debate Program -এ অংশ নিয়ে চবি স্কুল চ্যাম্পিয়ন হয়। এ আয়োজনে দিয়াজ নির্বাচিত হন শ্রেষ্ঠ বিতার্কিক।

২০০৩ সালে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়া কর্মসূচীতে চট্টগ্রাম জোনে দখল করেন প্রথম স্থান। ২০০৪ সালে এসএসসিতে সারা দেশের বাণিজ্য বিভাগ হতে জিপিএ-৫ অর্জন করে মাত্র ৯২১ জন। এই তালিকায় ঠাঁই হয় দিয়াজ ইরফানের নাম।

এইচএসসি’র পাঠ চুকাতে তিনি ভর্তি হন ঢাকার নটরডেম কলেজে। কিন্তু ঘরের বড় ছেলে হওয়ায় মায়ের ইচ্ছার কারণে ৬ মাস নটরডেম কলেজে পড়ে ফিরে আসেন চবি কলেজে।

বিতার্কিক থেকে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেতা দিয়াজ

বিতার্কিক দিয়াজ

২০০৫ সালে তিনি পুনরায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রীয় পুরস্কার লাভ করেন। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ইতিহাসে যে অল্প ক’জন দুইবার এই পুরস্কার পেয়েছেন তাদের মধ্যে দিয়াজ একজন।

২০০৬ সালে বাণিজ্য বিভাগ হতে জিপিএ ৪.৭০ পেয়ে এইচএসসি পাশ করে। উচ্চশিক্ষার পাঠ চুকাতে তিনি ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইনান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগে। প্রথম শ্রেণীতে বিবিএ ও এমবিএ ডিগ্রী সম্পন্ন করে তিনি ভর্তি হন এমফিলে।

মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি বিসিএস পরীক্ষায়ও। ৩৪তম বিসিএস পরীক্ষার মৌখিক পরীক্ষার আসরে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয় তার।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে দিয়াজ ছিলেন চিটাগং ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটির (সিইউডিএস) সদস্য। সিইউডিএস’র পক্ষ থেকে একাধিকবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, চুয়েট, চাঁদপুর, সিলেটে বিতর্ক প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহণ করেন তিনি। একাধিকবার রেডিও বিতর্ক ও দুই বার টিভি বিতর্কেও অংশ নেন দিয়াজ। ২০০৯ সালে চবির শাহজালাল হলের পক্ষ হয়ে টিভি বিতর্কে অংশ নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-বেরুনী হলকে হারিয়ে সেমিফাইনালে উঠেছিল দিয়াজের দল।

ক্যাম্পাসে নিজের সম্পাদনায় প্রকাশ করেছেন একাধিক ম্যাগাজিন। জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিকে কলাম লিখে হাত পাকিয়েছেন তিনি।

বিতর্ক থেকে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেতা দিয়াজ

নেতৃবৃন্দের সামনে বক্তব্য রাখছেন দিয়াজ

তার একান্ত চেষ্টায় চবিতে গড়ে উঠে সামাজিক সংগঠন ‘বাংলার মুখ’। বাংলার মুখ থেকে তিনি আয়োজন করেন ক্যাম্পাসে শীতকালীন পিঠা উৎসব। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শহীদদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন, দেয়ালিকা প্রকাশসহ নানা কর্মসুচি পালন করতে থাকে বাংলার মুখ।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে উঠা আন্দোলনে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব ও চবিতে নেতৃত্বে দিয়েছিলেন তিনি। ছিলেন জামায়াত ও শিবিরের বিরুদ্ধে সোচ্চার এক ছাত্র নেতা। এ কারণে ২০১০ ও ২০১৩ সালে শিবিরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় একাধিক মামলায় তাকে আসামী করা হয়।

দিয়াজের বাবা মোহাম্মদ ছরওয়ার কামাল চৌধুরী একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। দিয়াজ ইরফান ছিলেন আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, চবি শাখার সাবেক যুগ্ম সদস্য সচিব। তার মা জাহেদা আমিন চৌধুরী চট্টগ্রাম উত্তর জেলা পেশাজীবী লীগের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

বিতর্ক থেকে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেতা দিয়াজ

কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর সংবর্ধিত দিয়াজ ইরফান চৌধুরী

ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় অবদানের কারণে সম্প্রতি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সম্পাদক মনোনীত হন দিয়াজ ইরফান চৌধুরী।