চট্টগ্রামের লোকালয়ে অতিথি পাখি ও কিছু কথা

নিউজচিটাগাং২৪/ এক্স প্রকাশ:| সোমবার, ২৫ ডিসেম্বর , ২০১৭ সময় ১১:৫০ পূর্বাহ্ণ

প্রতিবছরের মতো এবারও শীত জেঁকে বসতে শুরু করেছে চট্টগ্রামের বিভিন্ন লোকালয়ে । তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের কর্ণফূলী নদী, ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিল, হাওড়, পুকুরে ভরে যাচ্ছে রংবেরঙের নাম না জানা নানা প্রজাতির অতিথি পাখিতে।কিছুদিন ধরে নগরীর কর্ণফূলী নদীতে ঝাঁকে ঝাঁকে অতিথি পাখির কলোরব দেখা যাচ্ছে। ভোরের আলো ফোটার আগে খাবারের খোঁজে নদী-হ্রদে দল বেঁধে নামে অসংখ্য অতিথি পাখি। সন্ধ্যা নামলে বন ও বাঁশ ঝোপঝাড় আর শহরের পরিত্যক্ত ভবন বা অদূরে পাহাড়ি এলাকায় পাখির কলতান আর কিচিরমিচির ধ্বনি অদ্ভুত এক আবহ সৃষ্টি করে। নদীর তীরে ভ্রমনে আসা মুমতাজ কবির ফিজা ও শাকিলা বলেন, আমরা বিভিন্ন সময়ে এখানে ঘুরতে আসি। তবে শীতকালের এই সময়টাতে একটু বেশি আনন্দ পায়। কারণ এই সময় নদী-লেক এ বিভিন্ন অতিথি পাখি দেখা যায়। যা দেখে যেকোন মানুষ সহজে মুগ্ধ হবে। বিশেষ করে পাখিগুলোর রঙ-বেরঙের পাখা আর কিচিরমিচির শব্দ খুব দারুণ লাগে।

চট্টগ্রাম জেলা সাবেক পশুসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুল হাই জানান, শীতের প্রকোপ বাড়লে বিভিন্নদেশ থেকে কর্ণফূলী, কাপ্তাই লেকসহ বিভিন্ন জলাশয়ে অথিতি পাখি আসতে শুরু করে।এরা বিশেষ করে কোলাহলমুক্ত পরিবেশ যেখানে মানুষের বিচরণ কম থাকে এমন স্থানে বসতি করে। নির্মমভাবে অথিতি পাখি শিকার ও নিধনের বিষয়ে তিনি বলেন, যে কোন উপায়ে অতিথি পাখি শিকার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ।আইনে সাজা দেওয়ার বিধান রয়েছে।পখি রক্ষার ক্ষেত্রে শুধু আইনে নয় বরং মানবিক দিক থেকে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার্থে । এরা শুধু প্রকৃতিক সৌন্দর্য বাড়ায় না, ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে আমাদের উপকার করে যা ফসল উৎপাদনে সাহায্য করে।

প্রতিবছর শীতকাল এলেই জলাশয়, বিল, হাওড়, পুকুর ভরে যায় নানা রংবেরঙের নাম না জানা পাখিতে। আদর করে আমরা সেগুলোকে বলি অতিথি পাখি। নাম অতিথি হলেও এই পাখিরা ঝাঁকে ঝাঁকে আমাদের দেশে হাজির হয় নিজেদের জীবন বাঁচাতে। এসব অতিথি পাখিদের কিছু মজার বিষয় নিয়ে লিখছি

পৃথিবীতে প্রায় ৫ লাখ প্রজাতির পাখি আছে। এসব পাখিদের মধ্যে অনেক প্রজাতিই বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় অন্য দেশে চলে যায়। শুধু ইউরোপ আর এশিয়ায় আছে প্রায় ৬০০ প্রজাতির পাখি। কিছু কিছু পাখি তাই প্রতিবছর ২২ হাজার মাইল পথ অনায়াসে পাড়ি দিয়ে চলে যায় দূরদেশে। উত্তর মেরু অঞ্চলের এক জাতীয় সামুদ্রিক শঙ্খচিল প্রতিবছর এই দূরত্ব অতিক্রম করে দক্ষিণ দিকে চলে আসে। আমাদের দেশে অতিথি পাখিরা অতটা পথ পাড়ি না দিলেও তারাও অনেক দূর থেকেই আসে। বরফ শুভ্র হিমালয় এবং হিমালয়ের ওপাশ থেকেই বেশির ভাগ অতিথি পাখির আগমন ঘটে। এসব পাখিরা হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত তিব্বতের লাদাখ থেকে সেন্ট্রাল এশিয়ান ইন্ডিয়ান ফ্লাইওয়ে দিয়ে প্রবেশ করে। এ ছাড়া ইউরোপ, দূরপ্রাচ্য (যেমন সাইবেরিয়া) থেকেও এসব পাখি আসে। এরা কিছু সময় পর আবার ফিরে যায় নিজ দেশে।

এসব পাখিদের মধ্যে বাংলাদেশের অতি পরিচিতি অতিথি পাখি নর্দান পিনটেইল। এছাড়া স্বচ্ছ পানির বালি হাঁস, খয়রা চকাচকি, কার্লিউ, বুনো হাঁস, ছোট সারস পাখি, বড় সারস পাখি, হেরন, নিশাচর হেরন, ডুবুরি পাখি, কাদাখোঁচা, গায়ক রেন পাখি, রাজসরালি, পাতিকুট, গ্যাডওয়াল, পিনটেইল, নরদাম সুবেলার, কমন পোচার্ড, বিলুপ্ত প্রায় প্যালাস ফিস ঈগল (বুলুয়া) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও নানা রং আর কণ্ঠ বৈচিত্র্যের পাখিদের মধ্যে রয়েছে ধূসর ও গোলাপি রাজহাঁস, বালি হাঁস, লেঞ্জা, চিতি, সরালি, পাতিহাঁস, বুটিহাঁস, বৈকাল, নীলশীর পিয়াং, চীনা, পান্তামুখি, রাঙামুড়ি, কালোহাঁস, রাজহাঁস, পেড়িভুতি, চখাচখি, গিরিয়া, খঞ্জনা, পাতারি, জলপিপি, পানি মুরগি, নর্থ গিরিয়া, পাতিবাটান, কমনচিল, কটনচিল প্রভৃতি।

অতিথি পাখি কেন আসে কেন যায়:
এর উত্তর খুব সহজেই দেওয়া যায়, শীত এলে এরা সহ্য করতে না পেরে অন্য দেশে যেখানে শীত অপেক্ষাকৃত কম সেখানে চলে যায়। তাছাড়া এ সময়টাতে শীতপ্রধান এলাকায় খাবারেও দেখা যায় প্রচণ্ড অভাব। কারণ শীতপ্রধান এলাকায় এ সময় তাপমাত্রা থাকে অধিকাংশ সময় শূন্যেরও বেশ নিচে। সেই সাথে রয়েছে তুষারপাত। তাই কোনো গাছপালা জন্মাতেও পারে না। তাই শীত এলেই উত্তর মেরু, সাইবেরিয়া, ইউরোপ, এশিয়ার কিছু অঞ্চল, হিমালয়ের আশপাশের কিছু অঞ্চলের পাখিরা ঝাঁকে ঝাঁকে চলে আসে কম ঠাণ্ডা অঞ্চলের দিকে।

বসন্তের সময় মানে মার্চ-এপ্রিলের দিকে শীতপ্রধান অঞ্চলের বরফ গলতে শুরু করে, কিছু কিছু গাছপালা জন্মাতে শুরু করে। ঘুম ভাঙতে শুরু করে পুরো শীতকালে ঘুমিয়ে থাকা অনেক প্রাণীদের। ঠিক এ রকম এক সময়ে অতিথি পাখিরা নিজ বাড়িতে ফিরে যায় দলবলসহ। আবার এখানে বেশ মজার একটা ব্যাপার আছে। তারা ফিরে গিয়ে ঠিক তাদের বাড়ি চিনে নেয়। অদ্ভুত এক ব্যাপার। গবেষকরা বলছেন, সমুদ্রের নাবিক যেমন কম্পাস ব্যবহার করে পথ চলে এই পাখিদের দেহে সেরকম কিছু একটা জন্মগতভাবেই আছে। যা তাদের পথ চলার সময় দিক চিনতে সাহায্য করে। তাছাড়া তারা সূর্য ও তারার অবস্থানের উপরই নির্ভর করে। পরিষ্কার মেঘমুক্ত রাতে যখন আকাশে নক্ষত্র দেখা যায় তখন পাখিরা নির্বিঘ্নে পথ চলতে পারে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। কিন্তু আকাশ মেঘলা থাকলে নক্ষত্র ঢাকা পড়ে। এ সময় এসব পাখিরা আকাশ থেকে নিচে কোনো নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়। কিন্তু সমুদ্রের উপর দিয়ে উড়ে চলা পাখিরা এক্ষেত্রে দিকভ্রান্ত হয়। তাই এ সময় অনেক দূরের কোনো লাইটহাউসের শক্তিশালী আলোর দিকে তারা পথ ভুল করে চলে আসে দলে দলে। মেঘলা কুয়াশাচ্ছন রাতে লাইটহাউজের গ্লাসে আঘাত পেয়ে হাজার হাজার পাখি মারা পড়ে।

বিশ্ব অতিথি পাখি দিবস: অতিথি পাখিরা শুধু বাংলাদেশে নয়, সারাবিশ্বেই প্রতিবছর ভ্রমণ করছে। প্রতিবছরই তারা শীতপ্রধান অঞ্চলের তীব্র শীত থেকে বাঁচতে উড়ে যাচ্ছে হাজার হাজার মাইল দূরের অপেক্ষাকৃত কোনো উষ্ণ অঞ্চলের দিকে। সাদা চোখে কিছু না বোঝা গেলেও পাখিদের এই ভ্রমণের একটা আন্তর্জাতিক গুরুত্ব আছে। ২০০৬ থেকে এই দিবসটি পালিত হচ্ছে।