‘চট্টগ্রামের’ নাম রহস্য

প্রকাশ:| রবিবার, ১৯ অক্টোবর , ২০১৪ সময় ১১:৫৬ অপরাহ্ণ

কাজী আবুল মনসুর
চট্টগ্রামকে নিয়ে কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছিলেন “সিন্ধু মেখলা ভূধরস্তনী, রম্যানগরী চট্টলা, অয়ি বরাঙ্গি, শ্যামলা-শোভন নিবিড় কাননকুন্তলা, বাড়ব ঘোড়াবে বাঁধিয়া রেখেছ দুয়ারে তোমার
‘চট্টগ্রামের’ নাম রহস্য
চট্টগ্রামকে নিয়ে কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছিলেন “সিন্ধু মেখলা ভূধরস্তনী, রম্যানগরী চট্টলা, অয়ি বরাঙ্গি, শ্যামলা-শোভন নিবিড় কাননকুন্তলা, বাড়ব ঘোড়াবে বাঁধিয়া রেখেছ দুয়ারে তোমার সুন্দরী বক্ষে পুষিছ দিব্য অনল করাল শিখাঠি সংবরি।”
অসম্পূর্ণ ও প্রহেলিকাপূর্ণ চট্টগ্রামের নামকরণের ইতিহাস। ভূতত্ত্ববিদদের মতে চট্টগ্রাম অঞ্চলটি অতি প্রাচীন। পৌরণিক যুগ থেকে আবাসভূমির অযোগ্য এই চট্টগ্রামে অনেক স্বাধীন রাজবংশ রাজত্ব করেছে, তারা আবার কালের গর্ভে বিলীনও হয়ে গিয়েছে। এখানে মনুষ্য বসতির পত্তনও হয়েছে একাধিক বার। তাই এর আদি নাম কি বা চট্টগ্রামের নামকরণের ইতিহাসটিই গভীর অন্ধকার ও রহস্যজালে আবৃত্ত।
প্রতœতত্ত্ববিদ নন্দলাল দে তাঁর বিখ্যাত জিওগ্রাফিক্যাল ডিকশনারি অব এনসেন্ট ইন্ডিয়া গ্রন্থে চট্টগামের আদি নাম চট্টলা এবং ফুল্লগ্রাম বা পুষ্পগ্রাম বলে উল্লেখ করেন। পুরনো অনেক গ্রন্থে উল্লেখিত চট্টল, শব্দ থেকে এই অঞ্চলের নাম ‘চট্টলা’ হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। যেমনঃ চূড়ামনি তন্ত্রে আছে, “চট্টলে দক্ষ বাহুর্যে ভৈরব চন্দ্রশেখর। ব্যক্তরূপা ভগবতী ভবানীতন্ত্র দেবতা তেমনি “বরাহতন্ত্রে” উল্লেখ আছে” চট্টলে দক্ষিণে বাহু ভৈরব চন্দ্রশেখর। সর্য্যরে কটিদেশস্থো বিরূপাক্ষা মহেশ্বর। অনেক ইতিহাসবিদ একমত যে, অতি পৌরাণিক যুগ থেকে চট্টগ্রামের এক নাম ‘চট্টলা’ ছিল। সেই প্রাচীনকালে চট্টভট্ট নামের এক জাতি এই অঞ্চলে বসতি পত্তন করলে তারা এলাকাটিকে চট্টলা নাম দেন বলেও, কেউ কেউ মনে করেন। ১৩৪৫ বঙ্গাব্দে সত্যবার্ত্তা নামের পুরনো ম্যাগাজিনে এক লেখক বাংলায় ভ্রমণ শীর্ষক এক কাহিনীতে এই অঞ্চলের নাম সপ্তগ্রাম থেকে চট্টগ্রাম হয়েছে বলে উল্লেখ করেন। তিনি তার লেখায় ঐতিহাসিক সূত্র টেনে বলেন, “কারও কারও মতে সপ্তগ্রাম হতে লোক এসে এখানে উপনিবেশ স্থাপন করাতে তারা এ স্থানের নাম রাখেন সপ্তগ্রাম এবং পরে রূপান্তরিত হয়ে সপটগ্রাম, স্পড্গ্রাম বা চট্টগ্রামে পরিণত হয়েছে।
বৌদ্ধরা এই অঞ্চলের নাম চট্টগ্রাম রেখেছে বলে অনেক ইতিহাসবিদ মতপ্রকাশ করেন। তাদের যুক্তি হলো এখানে পূর্বে অনেক চৈত্য বা বৌদ্ধমঠ ছিল বলে এই অঞ্চলের নামকরণ চৈত্যগ্রাম বা চট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রাম শব্দটি চৈত্যগ্রামের রূপান্তর। আরাকানরাজ ষোলসিংহ চন্দ্র নিজ রাজ্যের উপকণ্ঠে থুর থুনকে পরাজিত করে ৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম অধিকার করেন। দিগি¦জয়ের স্মৃতি চিহ্ন স্বরূপ চট্টগ্রামে তিনি একটি প্রস্তর বিজয়স্তম্ভ নির্মাণ করেন বলে প্রকাশ। যাতে লেখা ছিল ‘চিৎ-ত-গৌং’। আরাকানের ভাষায় এর শাব্দিক অর্থ ‘যুদ্ধলব্ধ স্থান’ পন্ডিত ও বৌদ্ধরা এখনও মনে করেন এই ‘চিৎ-ত-গৌং’ হতে চট্টগ্রাম নামের উদ্ভব। এ সময় চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য চৈত্যগ্রাম নির্মিত হয়েছিল। চীন পরিব্রাজক ‘হিউয়েন সাঙ’ যখন সিল্ক রোড ধরে চট্টগ্রাম আসেন তখন তাঁর অনেক স্মৃতি তাঁরই গ্রন্থে স্থান পায়। চট্টগ্রাম সম্পর্কে তেমন কিছু না থাকলেও তিনি চৈত্য শব্দের অর্থ বৌদ্ধ বিহার এবং গ্রাম শব্দের অর্থ ‘সমূহ’ বলে উল্লেখ করেন। চট্টগ্রামের নাম এক সময়ে কর্ণফুলী ছিল বলে অনেক ইতিহাসবিদ মতপ্রকাশ করেন। প্রাক ইসলামী যুগে আরব বণিকরা বাণিজ্য করার লক্ষ্যে ভারতীয় দ্বীপাঞ্চলে আসতে শুরু করলে এই অঞ্চলটি তাদের নজরে পড়ে, তখন থেকে আবর সংস্কৃতির সাথে এ অঞ্চলের অধিবাসীদের সংযোগ ঘটে। বিখ্যাত এক আরব কবি তাঁর একটি লেখায় এই অঞ্চলকে এভাবে রূপায়িত করেন, যার অর্থ লংয়ের সুগন্ধি ভারাক্রান্ত প্রবাহিত প্রাচ্য মলয়সম।
আরব লেখক ‘ইদ্রিসী’ ১২০০ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামের নাম ‘কর্ণফুলী’ বলে উল্লেখ করেন। তবে প্রাচীন কালের মুসলমানরা চট্টগ্রামকে জিনপরীর আবাসভূমি বলে উল্লেখ করতেন। এখনও চট্টগ্রামচট্টগ্রামের মুসলিম সমাজ মনে করে এ অঞ্চল বনে জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল এবং ঘন ঘন জঙ্গল জিনপরীতে ভরা ছিল। এটি আসলে পরীর দেশ। কথিত আছে ১৪০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে পশ্চিম দেশীয় পীর হযরত বদরে আলম ভেলায় চড়ে চট্টগ্রামে আসেন। তিনি বনে জঙ্গলে ঘেরা চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লার নিকটবর্তী বর্তমান চেরাগী পাহাড় বলে পরিচিত স্থানে এসে সাধনা করার জন্য জিনপরীদের কাছ থেকে ‘এক চাটি’ পরিমাণ জায়গা খুঁজে নেন। পরীরা বদরে আলমকে এক চাটি জায়গা দেন। বদর পীর তখন ঐটুকু চাটি বা প্রদীপ রাখবার স্থানে প্রদীপ জ্বালায়। সেই চাটি বা প্রদীপের তেজ সহ্য করতে না পেরে জিনপরীরা দূরে সরে যেতে বাধ্য হয়। পরে এই আলোর তেজ এত বেশি দূর ব্যপ্ত হয় যে, তা বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে আলোয় আলোকময় করে তোলে। শেষ পর্যন্ত জিনপরীরা টিকতে না পেরে এ দেশ ছেড়ে চলে যায়! এই চাটি থেকে চাটিগাঁ নামের উৎপত্তি বলে মনে করা হয়। ঐতিহাসিক যারা এই নামকরণে বিশ্বাসী তাঁরা বর্তমান আদালত ভবনের পাহাড় পরীর পাহাড় এবং দক্ষিণে পরীর দ্বীপের অস্তিত্বের কথা বলেন, আরাকানরাও এই চট্টগ্রামকে পুরাকালে রম্যভূমি বা পরীর দেশ বলত। আর একটি ঐতিহাসিক সূত্র মতে, দশম শতাব্দীতে এই অঞ্চলে একটি ক্ষুদ্র ‘মুসলিম রাজ্য’ স্থাপিত হয় যার অধিপতি ছিলেন ‘সুলতান’। এই সুলতানকেই রোসাঙ্গ রাজ সুলতইঙ্গ চেন্দয় অপরাজিত করে এর নামকরণ চেও গৌং করেন।
মুসলমান আমলে এর নাম ইসলামাবাদ করা হয় এবং নবাব ফতে খাঁ এক সময় চট্টগ্রামকে ফতেয়াবাদ নগর বলে আখ্যায়িত করেন। তবে ফখরুদ্দীন মোবারক শাহ এর চট্টগ্রাম বিজয়ের পূর্ব থেকেই চট্টগ্রাম-চাটিগাঁও বা চাটগাঁও নামে পরিচিত ছিল। ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে মোগলরা আরাকানদের হটিয়ে এ অঞ্চল দখল করে ইসলামাবাদ নাম দিলেও বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ৯৪ বছর পর্যন্ত এ অঞ্চল মোগলদের শাসনে ছিল। পরবর্তীতে ব্রিটিশরা যখন ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে মীর কাসিম আলী খানের কাছ থেকে এই জেলাটি অধিগ্রহণ করে তখন তারাই এর নামকরণ করেন চিটাগাং। তবে আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, ইংরেজীতে এই নাম চিটাগাং হলেও বাংলায় এর প্রতি শব্দ ব্যবহৃত হয়ে আসছে ‘চট্টগ্রাম’ হিসাবে।
সাহিত্যিক মাহবুব উল আলম চট্টগ্রাম সর্ম্পকে তার চট্টগ্রামের ইতিহাস (কোম্পানি আমল) বইতে যেভাবে লিখে গেছেন তা হচ্ছে, আরাকানী অধিকারে চট্টগ্রাম ছিল একটা দুর্গ। চাটগাঁও চর-চাটগাঁ উভয় নামেই আমরা ইহার উল্লেখ দেখিতে পাই। মোগলের ‘আন্দরকিল্লা’ই ছিল মূল চাটগাঁ দুর্গ আর নদীর দক্ষিণ তীরের কেল্লাটি ছিল চর-চাটগাঁ দুর্গ। আরাকান হইতে উত্তরে ফেণী নদী পর্যন্ত ভূভাগ চাটগাঁর কর্ত্ত্বত্বাধীন ছিল। ১৯৬৬ খৃষ্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি মোগলেরা উহা অধিকার করিয়া লয়। তাহারা প্রথম হইতেই উহাকে একটা থানার (থানা ইসলামাবাদ) মর্যাদা দিয়া রাখে। কিন্তু, জাহাঙ্গীরনগরের অধীন হইলেও থানা ইসলামাবাদ একটা আলাদা সরকার বা প্রদেশ (সরকার ইসলাম বাদ) রূপে গড়িয়া উঠে। ইহার যেমন নিজস্ব থানাদার, ফৌজাদার ও নবাব ছিল, তদ্রƒপ নবাবের দেওয়ান এবং মীর বখশীও ছিল। ১৭০০ খৃষ্টাব্দ নাগাদ ইহাকে জাহাঙ্গীরনগরের অধীনে আরও নিয়ন্ত্রিত করা হয়। তখন হইতে সরকার ইসলামাবাদের নবাব জাহাঙ্গীর নগরে থাকিয়াই কাজ চালাইতেন। ইসলামাবাদে তাহার এক নায়েব থাকিতেন। কোন কোন সময় নায়েব ও দেওয়ান একই ব্যক্তি হইতেন। ১৭১২ খৃষ্টাব্দের পর চট্টগ্রামের নবাবী একেবারেই তুলিয়া দেওয়া হয়। বাঙ্গালার সুবেদারের প্রত্যক্ষ অধীনে একজন নায়েব ইহার শাসন-কার্য চালাইতে থাকেন। ১৭২৮ খৃষ্টাব্দে ‘চাকলে ইসলামাবাদ’কে আমরা সুবে বাঙ্গালার ত্রয়োদশ চাকলার অন্যতম রূপে দেখিতে পাই। ১৭৬০ খৃষ্টাব্দের ১৫ অক্টোবরে যে সনদ দ্বারা নবাব মীল কাসিম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীকে চট্টগ্রাম সমর্পন করেন উহাতে চট্টগ্রামের উল্লেখ ছিল ‘থানা ইসলামাবাদ বা চট্টগ্রাম’ রূপে দক্ষিণ দিকে আরাকানের সীমা পর্যন্ত উহা বিস্তৃত ছিল। ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানী স-কাউন্সিল একজন চীফের অধীন এলেকা রূপে ইসলামাবাদকে গড়িয়া তুলিতে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রাম নামও ক্রমে অধিকতর সুস্পষ্ট রূপে চালু হইয়া যায়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম দিকের কাগজ-পত্রে ইসলামাবাদ বা চট্টগ্রামকে দেশ বা প্রদেশ রূপে উল্লেখ করা হইয়াছে।
এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা ইংরেজ স্যার উইলিয়াম জোনস্-এর কাছে আমরা যা পাই-তা হলো, এই অঞ্চলের সুন্দর ক্ষুদে পাখি ‘চট্গা’ থেকেই চট্টগ্রাম নামের উৎপত্তি। তাই বলা চলে চট্টগ্রামের নামকরণের বিষয়টি এখনও প্রহেলিকাপূর্ণ।