চট্টগ্রামের এলএ শাখায় লুটপাটের মহোৎসব

প্রকাশ:| শনিবার, ৩১ ডিসেম্বর , ২০১৬ সময় ১০:৫৭ অপরাহ্ণ

মামুনুল হক চৌধুরী: চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখায় জনগণের টাকা নিয়ে হরি লুট চলছে। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্তদের জিম্মি করে লুটপাটের এ মহোৎসবে মেতে উঠেছে একটি চক্র। ভূমি হুকুম দখল কর্মকর্তা, কানুনগো, সার্ভেয়ার থেকে শুরু করে কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও এই লুটপাটের অংশীদার বলে অভিযোগ আছে। অভিযোগ রয়েছে, বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসব বিষয় জেনেও রহস্যজনকভাবে নিরব ভূমিকা পালন করে আসছেন।

বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ভূমির অবকাঠামোগত অবস্থান নির্ণয়ের জরিপ, জমি অধিগ্রহণের সময় ক্ষতিগ্রস্তদের জমির মূল্য নির্ধারণ এবং চেক প্রদানের সময়ই মূলত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা লুটপাটে জড়িয়ে পড়েন।  অহেতুক হয়রানি থেকে পরিত্রাণ পেতে ও ক্ষতিপূরণের টাকা হাতে পেতে অনেকেই তাদের উৎকোচ দিতে বাধ্য হন।

জানা গেছে, চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত ‘সিটি আউটার রিং রোড়’ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ৭ শতক জমি অধিগ্রহণ করা হয় সৈয়দ আমিরুল হকের কাছ থেকে। ক্ষতিপূরণ বাবদ তার ৩৫ লাখ ৬১ হাজার ৯১১ টাকা পাওয়ার কথা ছিল। দীর্ঘ দুই বছর পার হলেও আমিরুল হক ক্ষতিপূরণ পাননি। ইতিমধ্যে মিজানুর রহমান মাসুদ নামের এক ব্যক্তিকে উক্ত জমির কথিত মালিক সাঁজিয়ে ১ কোটি ১৩ লাখ ১৪ হাজার ২৭৩ টাকা আত্মসাৎ করেছে একটি চক্র।

অভিযোগ উঠেছে, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের এলএ শাখার ৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাঁজসে চাঞ্চল্যকর এই দুর্নীতি হয়েছে। অভিযুক্তরা হলেন- এলএ শাখার তৎকালীন ভূমি হুকুম দখল কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহাদাৎ হোসেন, অতিরিক্ত ভূমি হুকুম দখল কর্মকর্তা দেবতোষ চক্রবর্তী, কানুনগো সুশীল বিকাশ চাকমা, সার্ভেয়ার সহিদুল ইসলাম, আমানাতুল মাওলা, মজিবুর রহমান, নুর চৌধুরী, আশীষ চৌধুরী।

এই অনিয়ম-দুর্নীতির প্রেক্ষিতে সুবিচার প্রাপ্তির আশায় সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে ধর্ণা দিচ্ছেন নৌ বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী সৈয়দ আমিরুল হক। কিন্তু প্রতিকার পাচ্ছেন না এই ভুক্তভোগী।

জানা গেছে, নৌ বাহিনীর কর্মকর্তা কমান্ডার মোস্তফা শহীদ সাফ কবলা মূলে উত্তর পতেঙ্গা মৌজার তিনটি দাগের কিছু জমি কিনে কয়েকজনের কাছে বিক্রি করেন। ওইসব জমির মধ্যে ২৩ শতক (৪৪১ খতিয়ানের বিএস দাগ আংশিক ৩০০৭) জমি সিটি আউটার রিং রোড়ের জন্য সরকার অধিগ্রহণ করে। উক্ত ২৩ শতক জমির ৬ মালিকের বিপরীতে সরকার বরাদ্দ দেয় ১ কোটি ১৩ লাখ ১৪ হাজার ২৭৩ টাকা। এরমধ্যে আমিরুলের জমি ছিল ৭ শতক; যার ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয় ৩৫ লাখ ৬১ হাজার ৯১১ টাকা (এলএ মামলা নম্বর ৮/২০১৩-২০১৪)। এরপর ২০১৪ সালের শুরুর দিকে আমিরুলসহ অন্য মালিকরা উপস্থিত থেকে জেলা প্রশাসনের এলএ শাখার সংশ্লিষ্টদের কাছে জমির দখল বুঝিয়ে দেয়।

এসময় এলএ শাখার সংশ্লিষ্ট রেজিস্ট্রারে আমিরুলসহ সব মালিকের তথ্য লিপিবদ্ধ করে পাশে সাক্ষরও নেয়া হয়। পরে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সময় লেবাননে শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত থাকায় স্ত্রীকে না-দাবি নামা দিয়ে ক্ষতিপূরণ গ্রহণের অধিকার দেন তিনি। এরপর এলএ শাখায় বার বার যোগাযোগ করেও তার স্ত্রী টাকা পাননি। এরপর দেশে ফিরে আমিরুল হক ভূমি অফিসে যোগাযোগ করে জানতে পারেন, ক্ষতিপূরণের ৩৫ লাখ ৬১ হাজার ৯১১ টাকা সহ মোট ১ কোটি ১৩ লাখ ১৪ হাজার ২৭৩ টাকা (রূপালী ব্যাংকের লাভলেইন লেডিস ব্রাঞ্চের চেক নম্বর ০১৫৬১৯২) মিজানুর রহমান মাসুদ নামের এক ব্যক্তির নামে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

এদিকে ভূমি ম্যানুয়েল অধ্যাদেশ ১৯৯৭ এর ৪৯(ক) ধারায় জমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্তদের যথাসম্ভব প্রকল্প এলাকায় এলএ চেক বিতরণ করতে বলা হয়েছে। কিন্তু চট্টগ্রামে প্রকল্প এলাকার পরিবর্তে এলএ শাখার টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণ করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে সৈয়দ আমিরুল হক বলেন, পুরো ২৩ শতক জমির জন্য সরকার বরাদ্দ দিয়েছিল এক কোটি ১৩ লাখ ১৪ হাজার ২৭৩ টাকা; সেখানে এক কথিত মালিককে পুরো টাকাটাই দেয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্ত শামসুল হককে ৪৪ লাখ ৭৫ হাজর ৮৮১ টাকা, ইকবাল হোসেনকে প্রায় ৫ লাখ ৮৩ হাজার ও হারুন-উর-রশীদকে ৬ লাখ ৬৮ হাজার ৯২০ টাকার চেক দেয়া হয়। অর্থাৎ ২৩ শতক জমির জন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ৫৭ লাখ ২৭ হাজার ৮০২ টাকা অতিরিক্ত দেয়া হয়েছে। অথচ আমি নায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত।

তিনি আরও বলেন, ভূমি অধিগ্রহণ অফিসের কর্মীরা মাঠপর্যায়ে মেপে জমি বুঝে নেয়ায় তারা জানে, এই জমির মালিক কারা, এরপরও ক্ষতিপূরণ অন্যকে দিয়েছে। ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির না-দাবী নামায় স্থানীয় ৪০ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলরের পরিবর্তে ২ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলরের প্রতিসাক্ষরে টাকা পরিশোধ হয়েছে; যা স্বাভাবিক অবস্থায় কোনক্রমেই সম্ভব না। আমার বাউন্ডারীর সামান্য টাকা রোয়েদাদ বইতে পড়ে আছে; অথচ মূল জমির টাকা নেই। এছাড়া জমি বুঝিয়ে দেওয়ার সময় তাদের রেজিস্ট্রারে আমি সাক্ষর করেছি, সেটাও আমাকে দেখাচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক শামসুল আরেফিন বলেন, ‘এসব অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করা হবে। এ বিষয়ে এতদিন আমি  অবগত ছিলাম না। ’