চট্টগ্রামের এলএ শাখায় ‘ঘুষের হাট’

প্রকাশ:| শনিবার, ১৮ অক্টোবর , ২০১৪ সময় ০৯:০৪ অপরাহ্ণ

দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী খ্যাত চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসনের ভূমি ও সম্পত্তি বা এলএ শাখায় প্রতিদিন রমরমা ঘুষের হাট বসে। এখানে ৫০০ বা ১০০০ টাকায় কাজ হয় না। প্রতিদিন লেনদেন হয় লাখ লাখ টাকার ঘুষ।

অনেকটা ওপেন সিক্রেট পন্থায় চলে আসা ঘুষের হাট খ্যাত এলএ শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সকালে টিফিন ক্যারিয়ার হাতে অফিসে আসেন। আর সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরেন বান্ডেল বান্ডেল টাকা নিয়ে।

অভিযোগ রয়েছে, সকালে বাসা থেকে আসার সময় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহনকরা টিফিন ক্যারিয়ারে দুপুরের খাবার থাকলেও ফিরতি পথে সেই টিফিন ক্যারিয়ারে থাকে টাকার বান্ডেল। এভাবেই চলছে অফিসের নিত্য কার্যক্রম।

জেলা প্রশাসনের এলএ শাখায় এক সার্ভেয়ারকে ৫৮ লাখ টাকা ঘুষ দিতে নিয়ে যাওয়ার সময় টাকার বস্তাসহ এক ব্যক্তি আটকের পর ঘুষ বাণিজ্যের রমরমা চিত্র প্রকাশ হয়ে পড়েছে। ৫৮ লাখ টাকা ঘুষ কেলেংকারিতে জড়িত থাকার দায়ে ইতিমধ্যে এলএ শাখায় শাস্তিমূলক গণবদলি শুরু করেছেন জেলা প্রশাসক। রীতিমত আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে উঠা কোটিপতি এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তির উদ্যোগ না নেওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে সৎভাবে দায়িত্বপালনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও।

৫৮ লাখ ঘুষের টাকা ধরা পড়ার পর চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যালয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ধৃত ব্যক্তিকে পুলিশ রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করায় কী তথ্য বের হয়ে আসে তা নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ভয় কাজ করছে।

আগামী রোববার ধৃত ইলিয়াছের রিমান্ড শুনানি অনুষ্ঠিত হবে বলে আদালত সূত্র জানিয়েছে। এই ভয়ের কারণে কার্যালয়ের দৈনন্দিন কার্যক্রমেও স্থবিরতা ও কর্মকর্তাদের মধ্যে নীবরতা দেখা দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসনের এলএ শাখায় সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে তদবিরবাজ চক্রের তেমন তৎপরতা নেই। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একান্ত জরুরি না হলে কারো সঙ্গে কথা বলছেন না। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী।

গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম আদালত ভবন এলাকায় ঘুষের ৫৮ লাখ টাকাসহ ইলিয়াছ (৩৩) নামের এক ব্যক্তিকে আটকের পর বুধ ও বৃহস্পতিবার দুই দিনে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের এলএ শাখা থেকে কানুনগো, সার্ভেয়ারসহ ১২ জনকে বিভিন্নস্থালে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ১২ জন বদলী হলেও রমরমা ঘুষ বাণিজ্যের মূল হোতা অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী বহাল তবিয়তে আছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মচারী জানান, এই অফিসে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা ঘুষ বাণিজ্য হয় সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু ঘুষের টাকা বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ-বাটোয়ারা হয়। তাই ঘুষবাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

কর্মচারীরা অভিযোগ করেন, এলএ শাখায় একজন সার্ভেয়ার বছরের পর বছর একই টেবিলে দায়িত্ব পালন করছেন এবং প্রতিদিন রমরমা ঘুষ বাণিজ্য চালিয়ে যান। কিন্তু এই সার্ভেয়ারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ঘুষ বাণিজ্যের বিষয়টি অবগত থাকা সত্ত্বেও। ঘুষের বড় বড় অংক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যেও বিতরণ করায় এই সার্ভেয়ার বহাল তবিয়তেই আছেন।

দুর্নীতির অভিযোগে বদলি হওয়া চেইনম্যান নজরুল ইসলাম, আবদুল করিম ও মোহাম্মদ আলী দুই মাসের মধ্যে আবার এলএ শাখায় ফিরে এসেছেন বলে জানা গেছে।

অভিযোগে জানা যায়, দীর্ঘদিন এলএ শাখা সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি। এই চক্রের সদস্যরা ঘুরে-ফিরে এলএ শাখায় চাকরি করেন। বদলি হলেও তদবির-বাণিজ্যে করে ফের একই টেবিলে ফিরে আসেন।


আরোও সংবাদ