চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানে তৈরি করেছিলেন নতুন জাগরণ

প্রকাশ:| বুধবার, ৪ ডিসেম্বর , ২০১৩ সময় ১১:২৫ অপরাহ্ণ

মোশাররফ রুমী |শ্যামসুন্দর বৈঞ্চব
চট্টগ্রামের কথ্য ভাষায় রচিত আঞ্চলিক গানের প্রসঙ্গ উঠলেই এখনও যার নামটি দ্বিধাহীন কণ্ঠে সবাই একবাক্যে সবার শীর্ষে বলে উল্লেখ করেন তিনি হলেন শ্যামসুন্দর বৈঞ্চব। তার জাদুকরী কণ্ঠ, সেসঙ্গে নান্দনিক গায়কী চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানে তৈরি করেছিল নতুন জাগরণ। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের মুকুটহীন সম্রাট তিনি। তার গাওয়া সব গান তাই মুখে মুখে ফেরে গানপ্রিয়দের। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানে তিনি তৈরি করেছিলেন এক স্বতন্ত্র ধারা। এই গুণী কণ্ঠশিল্পীর ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০০০ সালের এ দিনে তিনি অসুস্থাবস্থায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন বরেণ্য এই শিল্পী। ও জেডা ফইরার বাপ/ ভানুরে ও ভানু আঁই যাইয়ুঁম চাঁটগা শরত/ ও ভাই বাস কন্ডাকটার/ চল আঁরা ধাই/ আঁর বাইক্যা টেয়াঁ দে/ আঁর বউঅরে আঁই কিলাইউম/ আঙ্গো বাইত/ দেশে গেলে কইয়েনগো/ ভাইজান চাটিগাঁয়ে চাকরি একখান হাইছি… এ রকম অসংখ্য জনপ্রিয় গানের শিল্পী শ্যামসুন্দর বৈঞ্চব ১৯২৭ সালে চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানার ফতেয়াবাদ নন্দীর হাট গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। একের পর এক গানে সুর আর গায়কীতে জয় করে নেন লক্ষ কোটি শ্রোতার হৃদয়। জীবদ্দশায় তিনি একাধারে বেতার, টেলিভিশন ও মঞ্চে আঞ্চলিক গানকে সুললিত কণ্ঠে ধারণ করে দর্শকশ্রোতাদের আনন্দ দিয়ে হৃদয়জুড়ে যে আসন পেতেছিলেন, মৃত্যুর একযুগ পরেও তার সে আসনের দাবিদার আর কেউ হতে পারেনি। দেশ বিদেশে সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে নিজে যেমন প্রশংসিত হয়েছেন ঠিক তেমনি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংস্কৃতিকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন বিশ্ববাসীর সঙ্গে। তার এই কীর্তিময় কর্মের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে তিনি মানুষের মনে যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকবেন-এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। আধ্যাত্মিক গানের একনিষ্ঠ সাধক পিতা জয়দাশ বৈঞ্চবের হাত ধরে সংগীত অঙ্গনে প্রবেশ করেন শিশু শ্যাম। শুধু গানই নয়, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক মঞ্চে সাবলীল ভঙ্গিতে কৌতুক পরিবেশনও করতেন এই শিশু শ্যাম। গান আর কৌতুক নিয়ে শিশুকালে এলাকায় সাড়া ফেলে দিয়ে আগাম জানিয়েছিলেন, তিনি হবেন সাংস্কৃতিক জগতের উজ্জ্বল এক নক্ষত্র। ওস্তাদ সুধীর শীলের সান্নিধ্যে শুরু করেন সংগীত সাধনা। ১৯৬৩ সালে তৎকালীন পাকিস্তান বেতার এবং ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন তিনি। শুধু চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় নয়, তিনি নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায়ও অনেক গান গেয়েছেন। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত প্রথম মাইজভান্ডারী গান ‘আঁরে কন কামত বাঝাই রাখিলা মাইজভান্ডারী’ পরিবেশনা দিয়ে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও বসে থাকেননি এই শিল্পী। আগরতলা বেতার কেন্দ্র থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহমূলক বহু গণসংগীতে অংশগ্রহণ করেছেন। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের আরেক বরেণ্য শিল্পী শেফালী ঘোষের সঙ্গে দর্শকপ্রিয় একটি জুটি গড়ে উঠেছিল তার। জীবদ্দশায় বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বহু পুরস্কার পেলেও রাষ্ট্রীয় কোন পদক জোটেনি গুণী এই শিল্পীর কপালে। মরণোত্তর হলেও এই গুণী শিল্পীকে রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত করার দাবি আজ সবার।
মানবজমিন