গাজীপুরে মর্যাদার লড়াই

প্রকাশ:| শনিবার, ৬ জুলাই , ২০১৩ সময় ১১:৪১ পূর্বাহ্ণ

আসিফুর রহমান সাগর, মুজিবুর রহমান ও এম. আসাদুজ্জামান সাদ গাজীপুর থেকে ।।নবগঠিত গাজীপুর সিটি করপোরেশনের gccপ্রথম নির্বাচন আজ। উত্সবমুখর বর্ণিল প্রচার-প্রচারণা শেষে মর্যাদার লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত গাজীপুর। প্রথম নগরপিতা নির্বাচনে গাজীপুর পরিণত হয়েছে উত্সবের নগরীতে।

সকাল ৮টা থেকে শুরু হয়ে একটানা বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলবে ভোট গ্রহণ। তবে যারা লাইনে থাকবেন সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও তাদের ভোটগ্রহণ করা হবে। জাতীয় রাজনীতিতে জোট ও মহাজোটের মর্যাদার লড়াইয়ে পরিণত হওয়া টান টান উত্তেজনা নিয়ে মেয়র নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে সারাদেশের জনগণ। নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। নেয়া হয়েছে সর্বাত্মক প্রস্তুতি।

তীব্র উত্তেজনার মধ্য দিয়ে গেছে নির্বাচনের প্রচারণা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াসহ মন্ত্রী, এমপি ও দুই জোটের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ নির্বাচন প্রসঙ্গে কথা বলেছেন। সারাদেশেই এ নির্বাচনকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে উত্তেজনা। সবাই এ নির্বাচনকে দেখছেন আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের টার্নিং পয়েন্ট হিসাবে। আওয়ামী লীগ কী পারবে তাদের ‘ঘাঁটি’ জয়ের ধারা অব্যাহত রাখতে, নাকি বিএনপি সেই দুর্গে হানা দিয়ে দখল নেবে। নির্বাচনের জয় পরাজয়ের দোলাচলে দুলছে এখন গাজীপুরবাসী।

নির্বাচনের রায় কার পক্ষে যাচ্ছে তা নিয়ে উত্কণ্ঠায় আছেন দুই প্রধান দলের কেন্দ্রীয় কমান্ডসহ নেতাকর্মীরা। নির্বাচনের রায় নিজেদের পক্ষে পাওয়ার জন্য দুই দলই উদগ্রীব। বৃহস্পতিবার রাত ১২টা পর্যন্ত দুই প্রধান দলের মেয়র প্রার্থীর পক্ষ থেকে ভোটারদের মন জয়ের সর্বশেষ চেষ্টা চালানো হয়েছে।

নির্বাচন উপলক্ষে মহানগরীতে আজ শনিবার সাধারণ ছুটি। তাই সরকারি অফিস-আদালত, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিল্প-কল-কারখানা বন্ধ থাকবে। নির্বাচন উপলক্ষে আজ রাত ১২ পর্যন্ত নির্বাচনী এলাকায় যান চলাচল সীমিত রাখা হয়েছে। তবে ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচলে কোন নিষেধাজ্ঞা রাখা হয়নি।

১৪ দল সমর্থিত প্রার্থী টঙ্গী পৌরসভার সাবেক মেয়র এডভোকেট আজমত উল্লাহ খান গতকাল শুক্রবার সকাল পর্যন্ত টঙ্গী বাজারে নিজ বাসায় অবস্থান করেন। এসময় তার বাসার সামনে বিপুল সংখ্যক কর্মী সমর্থকের ভিড় দেখা গেছে। তিনি সাবেক টঙ্গী পৌরসভা সংলগ্ন পৌর জামে মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন। জুমার নামাজের পূর্বে তিনি নতুন বাজার দলীয় কার্যালয়ে গিয়ে কর্মী সমর্থকদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাত্ করেন। পরে তিনি টঙ্গী মিল বাজার এলাকায় তার কর্মী সমর্থকদের সাথে সাক্ষাত্ করেন।

১৮ দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থী অধ্যাপক এম এ মান্নান টঙ্গী বাজার কেন্দ্রীয় বড় মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন। পরে তিনি টঙ্গী নির্বাচনী কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিং করেন। এ সময় বিপুল সংখ্যক কর্মী সমর্থক উপস্থিত ছিলেন। জুমার নামাযের আগে তিনি তার নিজ বাড়ী নগরীর দক্ষিণ সালনায় অবস্থান করেন। সেখানে তিনি বাসার ভেতরে ও বাইরে প্রচুর সংখ্যক কর্মী সমর্থকের ভিড়। এর আগে তিনি নির্বাচনের বিভিন্ন ওয়ার্ডের কেন্দ্রের জন্য নিয়োগকৃত এজেন্ট ও দলীয় লোকজনের সাথে সাক্ষাত্ করেন।

এদিকে, এম এ মান্নান বারবার ভোট কারচুপির আশংকা প্রকাশ করেছেন। তবে কারচুপির আশংকা উড়িয়ে দিয়েছেন রিটার্নিং অফিসার ও আইন-শৃংখলা বাহিনীর তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশের উপ মহাপুলিশ পরিদর্শক।

‘কারচুপির সম্ভাবনা নেই’

১৮ দল সমর্থিত প্রার্থীদের ফলাফল কারচুপির আশংকা প্রসঙ্গে রিটার্নিং অফিসার মতিয়ার রহমান বললেন, কোন অবস্থাতেই নির্বাচনের ফলাফল আগে পরে দেয়ার সুযোগ নেই। একটি কেন্দ্রের ফলাফল গণনার আগে বা পরে করার সুযোগ নেই। কেন্দ্রের সকল ভোট গণনার পর পোলিং এজেন্টরা স্বাক্ষর করার পর সেই কেন্দ্রের ফলাফল রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে ঘোষণা করা হয়। এখানে কারচুপির কোন সুযোগ নেই। প্রতিটি কেন্দ্রের ফলাফল গণনা হয় প্রার্থীদের মনোনীত পোলিং এজেন্টদের সামনে।

তিনি বলেন, ৩৯২টি কেন্দ্র রয়েছে। তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ বলতে যেসব কেন্দ্রের সীমানা প্রাচীর নেই, লোকালয় থেকে খানিকটা দূরে, কেন্দ্র সংলগ্ন রাস্তা নেই- সেসব কেন্দ্রকে আমরা চিহ্নিত করে আইন-শৃংখলা বাহিনীর নজরদারি জোরদার করেছি। তিনি আরো বলেন, নির্বাচনের সকল ব্যবস্থা চূড়ান্ত করা হয়েছে। একটি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চত করতে সকল ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

নির্বাচনী সরঞ্জাম ব্যালট বাক্স, ব্যালট পেপার, কালী, প্রভৃতি গতকাল শুক্রবার রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়, নগর ভবন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নিকট বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। এগুলো পুলিশ প্রহরায় প্রিসাইডিং অফিসারের নেতৃত্বে নিজ নিজ কেন্দ্রে পৌঁছে গেছেন।

চারগুণ বেশি সদস্য

আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের তদারকি করছেন উপ মহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান। তিনি বলেন, অন্যান্য নির্বাচনের তুলনায় গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে চারগুণ বেশি আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্য রাখা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতেও বাড়তি নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। যে কোন অপ্রীতিকর ঘটনায় আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবো। তিনি জানান, আইন-শৃংখলা বাহিনীর নিয়মিত প্রহরার পাশাপাশি র্যাবের ২৮টি টিম কাজ করবে। এছাড়া ১৯টি স্ট্রাইকিং আর্মড পুলিশ, বিজিবির ১২টি স্ট্রাইকিং ফোর্স ও পুলিশের ৫৭টি টিম টহলে থাকবে। সুতরাং ভোটের দিনে ভোটারদের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সকল ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ৫৭টি ওয়ার্ডে জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ৫০ টি ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং নির্বাচনী অপরাধের তাত্ক্ষণিক সংক্ষিপ্ত বিচার কাজের জন্য ১০ জন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবেন।

দ্বিতীয় বৃহত্তম সিটি করপোরেশন

জনসংখ্যার দিক থেকে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের আয়তন ৩২৯ বর্গকিলোমিটার। পূর্বের গাজীপুর ও টঙ্গী পৌরসভা এবং পূবাইল, বাসন, গাছা, কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, কাউলতিয়া ইউনিয়ন নিয়ে সিটি কর্পোরেশন গঠিত। সিটি কর্পোরেশনে সাধারণ ওয়ার্ড ৫৭টি, সংরক্ষিত ওয়ার্ড ১৯টি। মোট ভোটার সংখ্যা ১০ লাখ ২৬ হাজার ৯৩৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৫ লাখ ২৭ হাজার ৭৭৭ জন এবং মহিলা ৪ লাখ ৯৯ হাজার ১৬১ জন। নির্বাচনে মেয়র পদে ৭ জন, সাধারণ কাউন্সিলর পদে ৪৫৫ জন ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে ১২৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ভোট কেন্দ্র ৩৯৪টি এবং ভোট কক্ষ ২ হাজার ২৩৩টি। অস্থায়ী ভোট কক্ষ ৪২টি। নির্বাচনে একজন মহিলাসহ মেয়র পদে প্রার্থী ৭ জন।

যারা মেয়র প্রার্থী

১৪ দল সমর্থিত জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও টঙ্গী পৌরসভার সাবেক মেয়র এডভোকেট আজমত উল্লাহ খান (দোয়াত কলম), ১৮ দল ও গাজীপুর সম্মিলিত নাগরিক কমিটি সমর্থিত প্রার্থী সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা অধ্যাপক এম. এ মান্নান (টেলিভিশন), আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও গাজীপুর সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মোঃ জাহাঙ্গীর আলম (আনারস), মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম দলের জেলা আহবায়ক মেজবাহ উদ্দিন সরকার রুবেল (হাঁস), স্বতন্ত্র প্রার্থী আমান উল্লাহ (তালা), ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদ ঘোড়া ও রিনা সুলতানা (প্রজাপতি) প্রতীক নিয়ে ভোট যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ভোট গ্রহণ চলছে ।