গাছ আর দীঘিকে ঘিরেই শুক্লাম্বর পৌষ সংক্রান্তিতে পূণ্যস্নান ও মেলা

প্রকাশ:| শনিবার, ১৪ জানুয়ারি , ২০১৭ সময় ১১:৫২ অপরাহ্ণ

বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে প্রতিবছর পৌষ মাসের শেষদিন অর্থাৎ পৌষ সংক্রান্তিতে লাখো মানুষের সমাগম ঘটে চট্টগ্রামের চন্দনাইশে শুক্লাম্বর দীঘির পাড়ে।  শনিবার (১৪ জানুয়ারি) বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে শুক্লাম্বর দীঘিতে বার্ষিক মেলা ও পূণ্যস্নানে লাখো নরনারীর সম্মিলনের চিত্রটি সেখানে ঘুরে তুলে আনা হয়েছে।

বিশাল দিঘীতে এক বোতল দুধ ঢেলে দিলেন বান্দরবান থেকে আসা তরুণী গৃহবধূ সীমা দাশ।  বিয়ের তিন বছরেও সন্তানের মুখ দেখেননি।  একটি সন্তানের জন্য মানত করে দীঘিতে দুধ ঢেলে দেয়ার কথা জানালেন সীমা।

বিশাল দিঘীতে এক বোতল দুধ ঢেলে দিলেন বান্দরবান থেকে আসা তরুণী গৃহবধূ সীমা দাশ।  বিয়ের তিন বছরেও সন্তানের মুখ দেখেননি।  একটি সন্তানের জন্য মানত করে দীঘিতে দুধ ঢেলে দেয়ার কথা জানালেন সীমা।

নগরীর নন্দনকানন থেকে গেছেন উজ্বল পালিত।  সঙ্গে আছে শ্যালক অনুপ।  দীঘিতে ডুব দিয়ে উঠে দুজনে কলাপাতার উপর বিভিন্ন ফল আর চাল নিয়ে ভাসিয়ে দিলেন পানিতে।  উজ্জ্বল জানালেন, তার শ্যালক মানসিকভাবে অসুস্থ।  তাকে সুস্থ করার নিয়ত নিয়ে এসেছেন তিনি।

সাতকানিয়ার সুবল চৌধুরী বিয়ের এক যুগ পর প্রথম সন্তানের মুখ দেখেছেন।  তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, প্রথম সন্তান হলে তার মুখে ভাত দেবেন দীঘির পাড়ের মন্দিরে নিয়ে এসে।  সেখানেই প্রথম সন্তান চুল কাটাবেন।  বাদ্যবাজনা বাজিয়ে প্রথম সন্তান ছেলেকে নিয়ে দীঘির পাড়ে এসেছেন সুবল।

 

শুধুমাত্র বিশ্বাসের ভিত্তিতে সনাতন ধর্মাবলম্বীরাই সেই দীঘিতে যান, এমন নয়।  উৎসব আর মেলায় আসেন হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ সব ধর্মের মানুষ।  মেলা কমিটির সভাপতি একজন অমুসলিম।  নূরুল ইসলাম নামে এই ব্যক্তি চন্দনাইশের বরমা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান।

ইউপি চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছর পৌষ সংক্রান্তিতে আমরা মেলার আয়োজন করি।  মেলায় হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ সবার সমাগম হয়।  লাখ, লাখ মানুষ আসে।  কিন্তু মেলায় কোনদিন কোন সমস্যা হয়নি।

বরমা ইউনিয়নে সবুজ ছায়াশীতল বাইনজুরী গ্রামে বিশালাকার এই দীঘি।  পাড়ে বিশাল শাখাপ্রশাখা ছড়িয়ে আছে একটি অশ্বত্থ গাছ।  সেই গাছ আর দীঘিকে ঘিরেই আনাগোণা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পূণ্যার্থীদের। ভারতের বিভিন্ন রাজ্য বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ থেকেও আসেন পূণ্যার্থীরা।

শনিবার দুপুরে শুক্লাম্বর দিঘী উন্নয়ন কমিটির সভাপতি হারাধন দেব বলেন, এবার প্রায় দেড় লাখের মতো লোকের সমাগম আশা করছি। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত বিপুল সংখ্যক মানুষ মেলায় এবং মন্দিরে আসবেন।

দীঘিটি কেন ভক্তি-বিশ্বাসের প্রতীক ?

কথিত আছে, প্রায় ৮০০ বছর আগে শ্রী শুক্লাম্বর ভট্টাচার্য্য নামে এক সাধক ভারতের নদীয়া থেকে শঙ্খ নদীতে জলপথে চন্দনাইশের বাইনজুরী গ্রামে আসেন।  তিনি নিজে শঙ্খের প্রবাহমূলে একটি অশ্বত্থের চারা রোপণ করে সেখানে শক্তির আরাধনা শুরু করেন।  কঠোর আরাধনায় তিনি ত্রিপুরা দেবীর কৃপা লাভ করে সেই অশ্বত্থমূলেই সিদ্ধি লাভ করেন।  তিনি নিজেই সেখানে খনন করেন দীঘি, কালক্রমে যা শুক্লাম্বর দীঘি নামে পরিচিতি পেয়েছে।

দীঘিকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত বিশ্বাস, যে মনোবাসনা নিয়ে ভক্ত সেই দীঘিতে গিয়ে স্নান করেন কিংবা দুধ-নৈবৈদ্য নিবেদন করেন তার মনকামনা পূর্ণ হয়।  পূণ্যের আশায় সারা বছর মানত নিয়ে পৌষ সংক্রান্তির দিকে দীঘিতে দুধ, ছাগল ও কবুতর, ফল উৎসর্গ করেন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ।  মনোবাসনা পূরণের জন্য দূর-দূরান্ত থেকে নারীপুরুষ এসে অশ্বত্থের ঢালে সুতার গিঁট দেয়।  মনোবাসনা পূর্ণ হলে তারা এসে আবার গিট খুলেও দেয়।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত শুক্লাম্বর দীঘি

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে বাইনজুরী গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের অসংখ্য বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী।  ঘরহীন, নিরন্ন, অসহায় মানুষ তখন আশ্রয় নেয় দীঘির পাড়ে এবং অশ্বত্থের তলায় সেই মন্দিরে।  তবে পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধারা সেই দীঘির পাড়ে ঘাঁটি গড়ে তুলে।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও গবেষক কালাম চৌধুরী বলেন, ৭১ সালে কয়েক’শ মুসলিম তরুণ-যুবক পাহারা দিয়ে এই মন্দির রক্ষা করেছে।  পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, রাজাকার-আলবদররা গ্রামে এলেও মন্দিরে ঢুকতে পারেনি।  পরে আমরা মুক্তিযোদ্ধারা এই দীঘির পাড়ে অবস্থান নিয়েছিলাম।  এখান থেকেই আমরা বিভিন্ন অপারেশনে যেতাম।

‘মা বলল, পরীক্ষা দিবি, স্নান করে আয়’

সাতকানিয়া উপজেলার বাজালিয়া থেকে রানা ধর ও রানা চৌধুরী নামে দুই কিশোর গেছেন শুক্লাম্বর দীঘিতে স্নান করতে।  তারা এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী।  স্নান শেষে দুজন দীঘিতে ভাসিয়ে দিয়ে চাল আর ফলফলাদি।

জানতে চাইলে রানা চৌধুরী বলেন, আগে কোনদিন আসিনি।  এবার প্রথম এসেছি।  মা বলল, ‘পরীক্ষা দিবি, শুক্লাম্বর দীঘিতে স্নান করে আয়। ’ যেন ভালোভাবে পাস করতে পারি….।

৮০ বছর বয়সী তেজেন্দ্র লাল দে শীতের সকালে দীঘিতে স্নান শেষে ঘাটে দাঁড়িয়ে কাঁপছেন।  বাঁশখালীর সরল ইউনিয়নের ফইরাং গ্রাম থেকে এসেছেন তিনি।

তেজেন্দ্র লাল দে বলেন, ছোটবেলা থেকে আসছি।  প্রতিবছর না এসে থাকতে পারি না।  গ্রামের কয়েকজনকে নিয়ে চলে আসি।

স্বামী হার্টের অসুখ ধরা পড়েছে।  সুস্থ করার আশায় স্বামীকে নিয়ে দীঘিতে স্নান সেরেছেন ফরিদপুরের মধ্যবয়সী গৃহবধূ দীপ্তি সিকদার।  তিনি বাংলানিউজকে বলেন, শুনেছি এখানে স্নান করলে মনোবাসনা পূর্ণ হয়।  তাই এসেছি।

আনোয়ারা সদর থেকে গেছেন প্রবীর মল্লিক।  সাথে নিয়ে গেছেন স্ত্রী আর ছয় মাস বয়সী ছেলেকে।  এই ছেলে তার প্রথম সন্তান।  প্রবীর বাংলানিউজকে বলেন, বিয়ের আগে এসে মানত করে গিয়েছিলাম, আমার সন্তান যেন সুখের হয়।  প্রথম সন্তান যেন ছেলে হয়।  আমার মনোকামনা পূরণ হয়েছে।

শুক্লাম্বর দীঘি উন্নয়ন কমিটির সহ সভাপতি অরুপ রতন চক্রবর্তী বাংলানিউজকে জানিয়েছেন, তার বড় ভাইয়ের শৈশবে চোখে ছানি পড়ে।  মানত করে দীঘিতে স্নান করার পর তিনি সুস্থ হন।  অন্ধ হওয়ার হাত থেকে বেঁচে গিয়ে তিনি পরে সরকারী কর্মকর্তা হয়েছিলেন।

তার দাবি, মানত করে গাভীর দুধ দীঘিতে দিলে সেই গাভী দুধ বেশি দেয়।  দুধ পানিতে ফেললে তা পানির সঙ্গে মেশেনা।  নিচের দিকে গভীরে চলে যায়।

সেজন্য হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধসহ বিভিন্ন মতের লোকজন এই দীঘিতে এসে দুধ ঢালে বলে জানিয়েছেন অরুপ রতন চক্রবর্তী।

উপলক্ষ হিন্দুদের, মেলা সকলের

পৌষ সংক্রান্তিতে পূণ্যস্নান উপলক্ষে দীঘির পাড়ে খালি জমিতে কয়েক কিলোমিটার জুড়ে বসেছে নানা ধরনের পণ্যের মেলা।  সুঁই-সূতা থেকে শুরু করে তরিতরকারি-মাছ পর্যন্ত নিয়ে এসেছেন বিক্রেতারা।

মন্দিরে যাওয়া প্রায় সকলেই হিন্দু ধর্মাবলম্বী হলেও মেলায় এসেছেন সব ধর্মের মানুষ।  বিক্রেতাদের মধ্যে অধিকাংশই আশপাশের গ্রাম থেকে আসা সাধারণ লোকজন।  ক্রেতাদের মধ্যে মাদ্রাসার ছাত্রী থেকে শুরু করে একেবারে নিতান্ত সাধারণ গৃহবধূও আছেন।

মেলায় এক সারিতে শিশুদের খেলনা নিয়ে বসেছে ১৩টি দোকান।  বিক্রেতাদের মধ্যে একজন রমজান জানালেন, চন্দনাইশের সাতবাড়িয়া থেকে তারা ১৩ জন এসেছেন মেলায়।  প্রতিবারই তারা মেলায় আসেন।

সাতবাড়িয়া থেকে মজিদ এসেছেন শার্ট-প্যান্টসহ বিভিন্ন ছেলে এবং শিশুদের বিভিন্ন পোশাক নিয়ে।  মজিদ বাংলানিউজকে বলেন, ৫০০ টাকা দিয়ে মেলা কমিটির কাছ থেকে দোকান ভাড়া নিয়েছি।  সোয়েটার-মাফলার বেশি চলছে।

শিশুদের খেলনা নিয়ে নগরীর কালুরঘাট থেকে মেলায় গেছেন প্রদীপ বড়ুয়া।  তিনি বাংলানিউজকে বলেন, দিনে মেলায় লোকজন কম কিনে।  বিকেল থেকে লোকজন কিনতে শুরু করবে।  তখন আশপাশের গ্রামের লোকজনও মেলায় আসবে

মায়ের দোয়া নামে একটি জুতার দোকান থেকে তিন জোড়া জুতা কিনেছেন চন্দনাইশের বরকল কাদেরিয়া মাদ্রাসার দশম শ্রেণীর তিন ছাত্রী।  এক ছাত্রী বললেন, এই মেলা খুব বিখ্যাত।  কয়েক বছর ধরে মেলার কথা শুনছি।  এবার এসেছি।  খুব ভাল লাগছে।

নাগরদোলায় বান্ধবীদের চড়েছেন স্থানীয় একটি কলেজের ছাত্রী জান্নাতুল নিপা।  তিনি বাংলানিউজকে বলেন, গ্রামগঞ্জে তো এখন নাগরদোলা দেখা যায় না।  মেলায় দেখে লোভ সামলাতে পারলাম না।  সেজন্য উঠে পড়েছি।

বেতের তৈরি টুকরি, বড় ঝুড়ি, চালুনি, কুলা, মোড়া, দা-বটি-ছোরা, যাঁতা, মাটির ঘটি-বাটি, শীতের সবজি, মানকচু, শাপলা মাছ, ইলিশ, দেশি পুকুরের মাছ, চটপটি, বিনি ধানের খই, যব ধানের খই, বাতাসা, গস্যার টফি, বাদামের টফি, নিমকি বিস্কুট, নকুল দানা, কদমা, গজা, নারকেলের চিড়া, রংবেরংয়ের ঘুড়ি নিয়ে মেলায় এসেছেন দূর-দূরান্তের বিক্রেতারা।

মুক্তিযোদ্ধা কালাম চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, এই উৎসব হিন্দু ধর্মের হলেও এটা ধর্মের আবরণে সীমাবদ্ধ নেই।  এটা সব ধর্মের মানুষের অসাম্প্রদায়িক একটা উৎসবে পরিণত হয়েছে।  এই জনপদ যাত্রা মোহন সেন, যতীন্দ্র মোহন সেন আর মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীদের জনপদ।  এখানে সাম্প্রদায়িকতার কোন ঠাঁই নেই।  সেজন্য পৌষ সংক্রান্তির এই মেলা সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে।