গমের বিকল্প কাসাভা

প্রকাশ:| বুধবার, ২৮ জুন , ২০১৭ সময় ০৯:৪৩ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশে এখনো কাসাভা ফসলটি নিতান্তই অপরিচিত হলেও আফ্রিকা মহাদেশের বেশির ভাগ মানুষ কাসাভা খেয়ে জীবন ধারণ করে। এটি গমের বিকল্প হিসেবে সমাদৃত। গুল্মজাতীয় এ উদ্ভিদটি বাংলাদেশে চাষ না হলেও পাহাড়ে-জঙ্গলে দীর্ঘদিন থেকে এ গাছ জন্মায়। স্থানীয়ভাবে কাসাভার ব্যবহার আছে অনেক আগে থেকেই। গ্রামের মানুষ কাসাভার কন্দকে শিমুল আলু বলেই চিনে। গাছটির পাতা অনেকটা শিমুল গাছের মতো দেখতে বলেই হয়তো এরকম নামকরণ।

কাসাভা পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম শর্করা উৎপাদনকারী ফসল এবং আফ্রিকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় ৫০ কোটি মানুষের প্রধান খাদ্য। এ কারণে আফ্রিকায় খাদ্য হিসেবেও জনপ্রিয়। তবে বর্তমানে সারা পৃথিবীর উষ্ণ ও উপ-উষ্ণ অঞ্চলে ব্যাপকভাবে কাসাভার চাষ হচ্ছে। কাসাভা উৎপাদনে প্রথম স্থানে রয়েছে নাইজেরিয়া। এই কাসাভার জন্ম দক্ষিণ আমেরিকায়। সেখান থেকে সপ্তদশ শতাব্দীতে পর্তুগিজরা এটি আফ্রিকায় নিয়ে আসেন। পরে এটি ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ১৬০ মিলিয়ন টন কাসাভা উৎপাদিত হয়।

আমাদের দেশে বিচ্ছিন্নভাবে বৃহত্তর ময়মনসিংহের গারো পাহাড়, হালুয়াঘাট, মধুপুর, নেত্রকোনা, সিলেট, কুমিল্লার লালমাই পাহাড় ও পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা স্থানীয়ভাবে স্বল্প পরিমাণে কাসাভার চাষ করে। দেশের কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা এসব কাসাভা সংগ্রহ করে বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে সরবরাহ করছে। মূলত খ্রিস্টান মিশনারিদের মাধ্যমে ১৯৪০ সালের দিকে কাসাভা আমাদের দেশে আসে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসল উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. ছোলায়মান আলী ফকির ২০০০ সালের দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে কাসাভা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তিনি এবং তাঁর পিএইচডি গবেষণা ফেলো মো. গোলাম মোস্তফা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা কাসাভার জাত সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন এক একর আয়তনের এক বাগানে। এখানে প্রায় ১১ জাতের কাসাভা সংরক্ষণ করা হয়েছে।

কাসাভা হচ্ছে গাছের শিকড়জাত একধরনের আলু, জন্মে মাটির নিচে। নানাভাবে এ আলু খাওয়া যায়।

কাসাভা বহুবর্ষজীবী গুল্ম শ্রেণীর গাছ। কান্ড গিঁটযুক্ত, আগা ছড়ান, পাতা যৌগিক, গড়ন শিমুল পাতার মতো, করতলাকৃতি, লাল রঙের দীর্ঘ বৃন্তের মাথায় লম্বাটে ছয় থেকে সাতটি পত্রিকা থাকে। আমাদের দেশে গাছ রোপণ এবং ফসল তোলার উপযুক্ত সময় ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ এবং অক্টোবর থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত। চারা রোপনের ছয় থেকে সাত মাস পর কাসাভা সংগ্রহ করা যায়। প্রতি গাছ থেকে সাত থেকে আট কেটি আলু পাওয়া যায়। প্রতি বিঘা জমিতে আটশ থেকে এক হাজার কেজি আলু পাওয়া যায়। এই কাসাভা বহুবিদ ব্যবহার বহুবিদ। কাসাভা কন্দ সিদ্ধ করে মিষ্টি আলুর মতই খাওয়া যায়। কাসাভা থেকে উন্নত মানের আটা, আটা থেকে রুটি, সাগু, পাপর, কেক, জুস, আচার, জেলি ইত্যাদি তৈরি হয়। কাসাভা চাষের সবচেয়ে বড় সুবিধা এ গাছ পতিত জমি, খেতের আল এবং অনুর্বর মাটিতেও ভালো জন্মে। তা ছাড়া মাটির উর্বরতাও নষ্ট করে না।

কাসাভা আলু থেকে তৈরি আটা ১০ থেকে ৩০ ভাগ গম-আটার সঙ্গে মিশিয়ে রুটি, কেক, বিস্কুট, স্যুপ, রসগোল্লা ইত্যাদি তৈরি করা সম্ভব। এছাড়াও কাগজ ও ওষুধের কাঁচামাল হিসেবেও কাসাভা ব্যবহৃত হয়। গবেষণাগারে পরীক্ষা করে দেখা গেছে কাসাভা আটার পুষ্টিমান গমের আটার চেয়ে অনেক বেশি এবং এই আটা থেকে রুটি ছাড়াও অনেক প্রকার সুস্বাদু খাবার তৈরি করা যায়। কাসাভার খাদ্যমানের মধ্যে প্রেটিন আছে ১০ শতাংশেরও বেশি। অ্যামাইনো আসিড ও কার্বোহাইড্রোট আছে যথাক্রমে ১০ ও ৩০ শতাংশ। আরো আছে ফ্রুকটোজ ও গ্লুকোজ। এগুলো মিলে সেলুলোজের সঙ্গে পাওয়া যাবে মিনারেল ও ফাইবার গ্লুটামিন বা এর আঠালো অংশ ডায়াবেটিস ও হৃদ রোগীদের অসুখ উপশমের ক্ষেত্রে বন্ধুর মতো কাজ করে। এমনকি এটি ক্যান্সার প্রতিরোধেও ভুমিকা রাখে।

সব জাতের কাসাভা খাওয়ার উপযোগী না হলেও দেশের পতিত স্থানগুলোতে কাসাভা চাষ করলে আমাদের খাদ্যের বাড়তি চাহিদা কিছুটা হলেও মেটানো সম্ভব বলে মনে করেন দেশের কৃষি বিজ্ঞানীরা।

তাঁরা বলেন, কাসাভা আটার পুষ্টিমান গমের আটার চেয়ে অনেক বেশি এবং এই আটা থেকে রুটি ছাড়াও অনেক প্রকার সুস্বাদু খাবার তৈরি করা যায় । কাসাভা ভিটামিনের দিক দিয়েও শীর্ষে। কাসাভার খাদ্যমানের মধ্যে প্রেটিন আছে ১০ শতাংশেরও বেশি। অ্যামাইনো আসিড ও কার্বোহাইড্রোট আছে যথাক্রমে ১০ ও ৩০ শতাংশ। আরো আছে ফ্রুকটোজ ও গ্লুকোজ। এগুলো মিলে সেলুলোজের সঙ্গে পাওয়া যাবে মিনারেল ও ফাইবার গ্লুটামিন বা এর আঠালো অংশ ডায়াবেটিস ও হৃদরোগীদের অসুখ উপশমের ক্ষেত্রে বন্ধুর মতো কাজ করে। কাসাভা ফাইবার বাড়তি কোলেস্টরলের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করে। এমনকি এটি ক্যান্সার প্রতিরোধেও ভূমিকা রাখে।