গভীর সমুদ্রে সক্ষমতা দেখালো বাংলাদেশ

প্রকাশ:| সোমবার, ৪ ডিসেম্বর , ২০১৭ সময় ০৩:১৬ অপরাহ্ণ

যুদ্ধ জাহাজ বিএনএস বিজয় থেকে আগুন লাগা বাণিজ্যিক জাহাজের দূরত্ব মাত্র কয়েক হাত। সেখান থেকে ওয়াটার গান ব্যবহার করে ২০ মিনিটের মধ্যেই নিভিয়ে ফেলা হলো ভয়াবহ আগুন। এরপর বিকল হয়ে পড়া জাহাজকে টেনে উদ্ধার তৎপরতা চালায় বিজয়। এদিকে বিজয় থেকে কয়েক জন নৌ সেনা ছোট বোট নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে গভীর সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে। উদ্দেশ্য আগুন লাগা জাহাজ থেকে যারা প্রাণ বাঁচাতে লাফিয়ে পড়েছেন তাদের উদ্ধার করা। বেশকিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে গভীর সমুদ্রে একটি দুর্ঘটনায় পড়া জাহাজকে উদ্ধারের কাজ অত্যন্ত দক্ষতা ও সফলতার সঙ্গে করতে পেরেছে বাংলাদেশের যুদ্ধ জাহাজ বিএনএস বিজয়।
একইভাবে একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়ে তার অংশবিশেষ সাগরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ভাসতে থাকে। একটি সামুদ্রিক জাহাজের নাবিকরা ভাঙা অংশ ভেসে থাকতে দেখেন। পরে যুদ্ধজাহাজ থেকে সাগরে বোট নামিয়ে উড়োজাহাজের ভাঙা অংশ উদ্ধার করা হয়। সম্প্রতি কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের মাঝে গভীর সমুদ্রে যুদ্ধজাহাজে অবস্থান করে সরজমিন এসব দৃশ্য দেখা যায়। উত্তাল গভীর সমুদ্রে এসব উদ্ধার অভিযানকে দুরূহ বলে জানায় নৌবাহিনী। বাংলাদেশের যুদ্ধজাহাজগুলো যখন এ ধরনের তৎপরতায় ব্যস্ত তখন তাদের চারদিকে রয়েছে কড়া দৃষ্টি। ৮টি বিদেশি জাহাজ ও হেলিকপ্টার থেকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয় বাংলাদেশের এ তৎপরতা। সবকিছু শেষে প্রশংসার বাক্যবাণে ভাসায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে। সুযোগ পেয়ে বাংলাদেশও দেখিয়ে দেয় গভীর সাগরে তাদের সক্ষমতা। এ প্রসঙ্গে মহড়ার অভিযানে অংশ নেয়া যুদ্ধজাহাজ বিএনএস বিজয়ের কমান্ডিং অফিসার (সিও) কমান্ডার এম ফজলার রহমান মানবজমিনকে বলেন, যুদ্ধ জাহাজে নানা ধরনের বিস্ফোরক থাকে। অস্ত্র থাকে। এর মধ্যে অন্য একটি জাহাজের আগুন নেভানো সত্যিই দুরূহ। কারণ দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজ থেকে যে কোনো সময় উদ্ধার কাজে নিয়োজিত জাহাজ ক্ষতির মুখোমুখি হতে পারে। এমনকি বিস্ফোরণ ঘটে পুরো জাহাজ ধ্বংসও হয়ে যেতে পারে। এছাড়া দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজের কাছাকাছি থেকে অপারেশন চালানো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। দেখা গেল কাছাকাছি যেতে গিয়ে দুই জাহাজের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটতে পারে। তিনি বলেন, আমরা খুশি এগুলোর কোনোটিই হয়নি। পুরো অপারেশনটি খুব ভালোভাবে শেষ করতে পেরেছি। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ নৌবাহিনী গভীর সমুদ্রে তাদের সক্ষমতা দেখাতে পেরেছে। এর আগে এ ধরনের মহড়া কখনো বাংলাদেশে হয়নি। তাই বিদেশিদের সামনে আমরা আমাদের কার্যক্রম তুলে ধরতে পেরেছি। ভারত ও চীনের জাহাজগুলো মহড়ায় অংশ নেয়ায় তারা আমাদের সক্ষমতা সম্পর্কে জানতে পেরেছে। এটা এক ধরনের সফলতা বলে আমরা মনে করি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের যুদ্ধজাহাজের সক্ষমতার প্রশংসা করেছে মহড়ায় অংশ নেয়া বিদেশিরা। এ ধরনের মহড়ার আয়োজন দেশের জন্য অত্যন্ত সম্মানের। যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে বাংলাদেশও তা সার্থকভাবে মোকাবিলা করতে পারে সেটা অন্য রাষ্ট্রগুলো দেখলো। সংশ্লিষ্টরা জানান, ফ্রিগেট বিজয়ের দৈর্ঘ্য ৮১ মিটার। ঘণ্টায় সর্বোচ্চ গতিসীমা ১৯.৫ নটিক্যাল মাইল ও গড় গতিসীমা ১৮ নটিক্যাল মাইল। ফ্রিগেট বিজয়ে হেলিকপ্টার নামা-ওঠার ব্যবস্থা আছে। জাহাজে রয়েছে সারফেস-টু-সারফেস গান, মিসাইল, এন্টিএয়ার গানসহ প্রভৃতি যুদ্ধ সরঞ্জাম। মহড়ায় অংশ নেয়ার সময় জাহাজটিতে অন্তত ১৬০ জন সদস্য ছিলেন। যুক্তরাজ্য থেকে কেনা ফ্রিগেট বিজয় ২০১১ সালে কমিশনপ্রাপ্ত হয়। এদিকে বাংলাদেশ জলসীমায় প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হওয়া আন্তর্জাতিক সমুদ্র মহড়ায় বড় ধরনের নৌ-কূটনৈতিক সাফল্য দেখছে বাংলাদেশ। দুটি কারণে এ সফলতা বলে মনে করা হচ্ছে। প্রথমত, বঙ্গোপসাগরের এ মহড়ায় প্রথমবারের মতো একসঙ্গে অংশ নিচ্ছে দুই ক্ষমতাধর দেশ ভারত ও চীন। মহড়ায় অংশ নেয়া ৪১টি যুদ্ধ জাহাজের মধ্যে ওই দুটি দেশের জাহাজের অবস্থান ছিল পাশাপাশি। একযোগে তারা সমুদ্রে তিনটি পর্যায়ের মহড়ায় অংশ নিয়েছে। অন্যদিকে সমুদ্র নিরাপত্তায় মিয়ানমারকে অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছে বাংলাদেশ। মিয়ানমারের একটি জাহাজ মহড়ায় অংশ নেয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা আসতে পারেনি। তবে মিয়ানমার নৌবাহিনী প্রধান মহড়ায় অংশ নিয়েছেন। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশসমূহের নৌবাহিনীর অংশগ্রহণে বঙ্গোপসাগরে প্রথমবারের মতো সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়েছে আন্তর্জাতিক সমুদ্র মহড়া। ইয়নস মাল্টিলেচারাল মেরিটাইম সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ এক্সারসাইজ (আইএমএমএসএআরইএক্স-২০১৭) নামে এ মহড়ায় ৩২টি দেশের মধ্যে ২৩টি সদস্য ও ৯টি পর্যবেক্ষক দেশসমূহের নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ এবং নৌপ্রধান, ঊর্ধ্বতন নৌ কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন দেশের মেরিটাইম বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। আন্তর্জাতিক এ সমুদ্র মহড়ায় বাংলাদেশের ৩৩টি, ভারতের ৪টি যুদ্ধজাহাজ ও ১টি মেরিটাইম পেট্রোল এয়ারক্রাফট ও ২টি হেলিকপ্টার এবং চীনের অত্যাধুনিক একটি যুদ্ধজাহাজ অংশ নেয়। নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যকার নৌ-নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পারস্পরিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক উন্নয়ন, সন্ত্রাস ও চোরাচালান দমনসহ বিভিন্ন পেশাগত সহযোগিতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২০০৮ সালে আইওএনএস প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে এবার প্রথম আইওএনএস দেশগুলোর সমুদ্রের বন্ধুত্বের সমপ্রীতি সম্মেলনের আয়োজন করলো বাংলাদেশ নৌবাহিনী। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে আইওএনএসের সদস্য রাষ্ট্রগুলো কীভাবে পরস্পরকে সহায়তা করতে পারবে তার মহড়া এটা। এতে যেমন সবার মধ্যে বন্ধুত্বের বন্ধন দৃঢ় হবে তেমনি বাড়বে আত্মবিশ্বাস।>www.mzamin.com


আরোও সংবাদ